Published On: রবিবার ১২ আগস্ট, ২০১৮

যে কারণে কমছে না সড়কের বিশৃঙ্খলা

নিজস্ব প্রতিবেদক : একটি দুর্ঘটনা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। বাসচাপায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমন্টে স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই শিক্ষার্থী আবদুল করিম ও দিয়া খানম মিম নিহতের পর শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়ক দাবিতে আন্দোলনে নামে। দেশ-বিদেশ থেকেও এই আন্দোলনে সমর্থন এসেছিল।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সড়কে যানবাহনের লাইসেন্স পরীক্ষা, রিকশা, প্রাইভেটকার-মাইক্রোবাসের চলাচলের জন্য পৃথক লেন তৈরির মতো বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। শুধু তাই নয় অ্যাম্বুলেন্স-ফায়ার সার্ভিসের মতো জরুরি সেবার গাড়িগুলোর নির্বিঘেœ যাতায়াতের ইমার্জেন্সি লেনও করেছিলেন তারা।
সাধারণ মানুষকে ট্রাফিক আইন মানতে, পথচারীদের ফুটপাত, ফুটওভার ব্রিজ ও জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করতেও বাধ্য করেছিলেন কোমলমতি এসব শিক্ষার্থীরা। সে সময় সড়কে নিয়ম মানার চিত্র দেখা গেলেও, আন্দোলন শেষে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
গত দু’দিন সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক পরিদর্শন করে এক প্রতিবেদনে বার্তাসংস্থা পরিবর্তন ডটকম জানিয়েছে, যানবাহনচালক এবং পথচারীদের নিয়ম অমান্য আগের মতোই চলছে। বাসগুলো বেপরোয়া গতিতে চলাচল করছে, যেখানে সেখানে থামিয়ে যাত্রী উঠানামা করাচ্ছে, একই রুটের একাধিক বাস প্রতিযোগিতা করে চলাচল করছে।
অন্যদিকে, পথচারীরা জেব্রা ক্রসিং-ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপার করছেন। পুলিশ বিশেষ ট্রাফিক সপ্তাহ এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) বিশেষ অভিযান চালালেও সড়কে নৈরাজ্য একটুও কমেনি। তবে পুলিশের দাবি, ট্রাফিক সপ্তাহে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে। তাই বিশেষ এই কর্মসূচি আরো তিন দিন বাড়ানো হয়েছে। ট্রাফিক সপ্তাহের মাধ্যমে মানুষকে আইন মানতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। সবার সহযোগিতা পেলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সফল হওয়া সম্ভব।
কেন সড়কে এই অব্যবস্থাপনা? সড়কে অব্যবস্থাপনার জন্য আইন অমান্য করার সংস্কৃতি ও দীর্ঘদিনের চলে আসা অনিয়মকেই দায়ী করছেন সাধারণ মানুষ। তাদের মতে, অনুন্নত ট্রাফিক ব্যবস্থা, যানবাহন চালক ও পথচারীদের নিয়ম না মানার প্রবণতা, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও রুট পারমিট দেয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতিসহ বিভিন্ন কারণে সড়কের এই বেহালদশা।
বুয়েটের ছাত্র শোভন রায় বলেন, কয়েকদিন অভিযান চালিয়ে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব না। আমার মতে, সবার আগে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে, নিয়ম মানতে শিখতে হবে। তাছাড়া ট্রাফিক ব্যবস্থাকে উন্নত করতে হবে। প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। তিনি বলেন, ছাত্ররা সড়কের চিত্র বদলে দিয়েছিল এটা সত্যি। কিন্তু, এটাও ভাবতে হবে সে সময় সড়কে যানবাহন ছিল অনেক কম। আর অঘোষিত ধর্মঘটের কারণে বাস-ট্রাক রাস্তায় নামেনি। সাধারণত সড়কে যে পরিমাণ যানবাহন চলাচল করে, সে সময় তা থাকলে হয়তো সড়ককে এতটা সুশৃঙ্খল মনে হতো না।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জুয়েল বলেন, স্বদিচ্ছা ও সকলের সহযোগিতা থাকলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। তবে আমাদের দেশের পরিবহন খাতে আগে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। চালকদের ভাল করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ড্রাইভিং লাইসেন্স দিতে হবে। হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো বন্ধ করতে হবে। লাইসেন্স-রুট পারমিট ছাড়া গাড়ি চলাচল বন্ধ করতে হবে। সকলকে ট্রাফিক আইন মেনে চলতে হবে। তাহলে যদি সড়কে শৃঙ্খলা ফেরে। বুয়েটের প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, পুরনো ব্যবস্থা রেখে আইন প্রণয়ন করলে হবে না। সড়ক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে বাংলাদেশেও সিগন্যাল-ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। সড়কের ওপর দিয়ে পথচারীরা পারাপার হবেন সেটাই নিয়ম, সেটা তো বন্ধ করা যাবে না। তবে সিগন্যাল ব্যবস্থা থাকলে সড়কের মোড় দিয়ে পথচারীরা পারাপার হলেও কোনো সমস্যা হবে না।
রুট পারমিট ৫০ বাসের, চলে ২০০ : রাজধানীর সড়কগুলোতে ৫০টি বাসের রুট পারমিট থাকলেও, সে জায়গায় ২০০টি বাস চলাচল করছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, রাজধানীতে ৫০টি বাসের রুট পারমিট রয়েছে। কিন্তু, বাস চলছে ২০০টি। এগুলো চলতে দেয়া যায় না, আমরা চেকপোস্ট বসিয়ে এগুলো তল্লাশির নির্দেশ দিয়েছি। বাইপাস করে যেসব গাড়ি ঢাকার ভেতর দিয়ে যাতায়াত করে, সেগুলোর নতুন করে পারমিশন দেয়া হচ্ছে না। বরং পুরনোগুলোর পারমিশন বাতিল করতে সুপারিশ করা হয়েছে। তিনি বলেন, সড়কে গাড়ি থাকবে কি থাকবে না, এটি আমার সাবজেক্ট না। ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামতে দেয়া হবে না, লাইসেন্স ছাড়া কোনো চালক গাড়ি চালাতে পারবেন না। অতীতে এসব বিষয়ে ছাড় দিতে গিয়ে চরম অব্যবস্থাপনা তৈরি হয়েছে। অনিয়মকে প্রশ্রয় দিয়ে বিশৃঙ্খলতা বাড়াতে চাই না।
যে কারণে বেহাল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা : ট্রাফিক সপ্তাহ নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ডিএমপি কমিশনার বলেন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় চারটি বিষয় সংশ্লিষ্ট রয়েছে। সেগুলো হলো- ট্রাফিক এনফোর্সমেন্ট, ইঞ্জিনিয়ারিং, এনভায়ারনমেন্ট এবং এডুকেশন। এর মধ্যে এনফোর্সমেন্টের বিষয়টা পুলিশের দেখার কথা। বাকিগুলো দেখার জন্য সরকারের অন্যান্য বিভাগ রয়েছে। কিন্তু, দিনশেষে যেকোনোটার ব্যত্যয় ঘটলেই সব দায় ট্রাফিক পুলিশের ওপরই বর্তায়। তারপরেও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখার। তিনি বলেন, বাস কিংবা টার্মিনালের বিষয়টা সিটি করপোরেশন বা সড়ক বিভাগ দেখবে। ট্রাফিক সিগন্যালের বিষয়টাও সিটি করপোরেশন দেখে। তাই আমরা মনে করি, সংস্থাগুলোর সমন্বয় আরো জোরদার করতে হবে।
সাত দিনে ২ লাখ মামলা, জরিমানা সাড়ে ৪ কোটি : সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চলমান ট্রাফিক সপ্তাহের গত সাত দিনে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৫৯৪টি মামলা দিয়েছে পুলিশ। পাশাপাশি জরিমানা করেছে ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৯ হাজার ২২৩ টাকা। এ সময় ৪৬ হাজার ৭২৩ চালকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা ও তিন হাজার ৭৭৭ যানবাহন আটক করা হয়েছে। পুলিশ সদর দফতর জানায়, গত ৫ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া ট্রাফিক সপ্তাহের গত সাত দিনের অভিযানে যানবাহনের ফিটনেস, রেজিস্ট্রেশন এবং ট্রাফিক আইন অমান্যের ঘটনায় সারাদেশে এসব মামলা ও জরিমানা করা হয়। চলমান ট্রাফিক সপ্তাহের কারণে ব্যাপক হারে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়ায় ট্রাফিক সপ্তাহ ঢাকায় আরো তিন দিন বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া।
রাজধানীতে ‘ইন্টেলিজেন্ট ট্রাফিক সিস্টেম’ চালু হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন।
গতকাল রোববার দুপুরে হোটেল সোনারগাঁওয়ে ডিএসসিসির নির্মল বায়ু ও টেকসই উন্নয়ন প্রকল্প (কেইস) আয়োজিত ‘ক্লিন অ্যান্ড সেইফ মোবিলিটি’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে তিনি এ তথ্য জানান।
মেয়র বলেন, প্রকল্পের আওতায় মহানগরীর ফুলবাড়িয়া, পল্টন, মহাখালী ও গুলশান-১ এ চারটি ইন্টারসেকশন নির্মিত হবে। এতে ভিডিও ক্যামেরা স্থাপনের মাধ্যমে চলমান গাড়ির সংখ্যা কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং হবে। এছাড়া ডিএসসিসির ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ৭৫ জন নিয়ে একটি কারিগরি ইউনিট সৃষ্টির প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে যত দ্রুত সম্ভব বাসরুট ফ্রাঞ্জাইজি-ভিত্তিক হবে। অর্থাৎ ছয় কোম্পানির অধীনে বাস চালানোর ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, বাসরুট ফ্রাঞ্জাইজি করলে সেটি হতে পারে নিরাপদ সড়কের জন্য একটি কার্যকর উদ্যোগ। তিনি আরও বলেন, ডিএসসিসি এলাকায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে জরুরি কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- নিরাপদ সড়ক সৃষ্টি করা, বেপরোয়া গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকা, রাস্তা পারাপারে ফুটওভার ব্রিজ ও জেব্রাক্রসিং ব্যবহারে উৎসাহিত করা, বিনা প্রয়োজনে হর্ণ বাজানো নিরুৎসাহিত করা, পথচারী চলাচলে ফুটপাত ব্যবহার করা, লেন মেনে গাড়ি চলানো, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা না করে নির্ধারিত স্টপেজে গাড়ি থামানো। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ ৯২টি সড়ক ইন্টারসেকশনে জেব্রাক্রসিং, লেন সেপারেটর ডট ও ২৯৪টি পথচারী পারাপার নির্মাণসহ ৬০০টি ট্রাফিক সাইন লাগানো হবে। আমাদের স্লোগান হবে- ‘আমাদের পথ, আমাদের হাতেই নিরাপদ’- যোগ করেন মেয়র। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিল্লাল, কলামিস্ট আবুল মকসুদ, নগর পরিকল্পনাবিদ মোবাশ্বর হোসেন, ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক রকিবুল রহমান প্রমুখ। গত ২৯ জুলাই ঢাকার বিমানবন্দর সড়কের এমইএস এলাকায় জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাসের চাপায় নিহত হন রমিজ উদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষার্থী দিয়া খানম মিম ও আবদুল করিম রাজীব। ওই ঘটনার পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। পরবর্তীতে সেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। শিক্ষার্থীদের অন্যতম দাবি ছিল, সড়কে মৃত্যুর জন্য দায়ী বেপরোয়া চালকদের মৃত্যুদ-ের আইন করা। আন্দোলনের মুখে সরকার দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা সড়ক নিরাপত্তা আইনের যে খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করে সেখানে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর জন্য সর্বোচ্চ সাজা তিন বছর থেকে বাড়িয়ে পাঁচ বছর করা হয়। তবে তদন্তে ‘ইচ্ছাকৃত হত্যা’ প্রমাণিত হলে গাড়ির চালকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা করার কথা উল্লেখ করা হয়। ওই সময় শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের দাবিতে নয় দফা দাবি পেশ করেন। দাবিগুলো মেনে নিয়ে সরকার নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেয়।

Videos