বুধ. ফেব্রু ২০, ২০১৯

মৈত্রী এক্সপ্রেসে যাত্রী সংখ্যার রেকর্ড

মৈত্রী এক্সপ্রেসে যাত্রী সংখ্যার রেকর্ড

Last Updated on

প্রত্যাশা ডেস্ক : ঢাকা-কলকাতা মৈত্রী ট্রেন চলাচল শুরু হয় প্রায় ১১ বছর আগে। প্রথম দিকে এ রুটে যাতায়াতকারী যাত্রীর সংখ্যা আশানুরূপ না হলেও বিগত কয়েক বছর ধরে যাত্রী পরিবহনে রেকর্ড গড়েছে। বেড়েছে যাত্রীসেবার মানও। তবে কমেনি চোরাচালান ও চিহ্নিত লাগেজ কারবারিদের তৎপরতা। সপ্তাহের বৃহস্পতিবার বাদে প্রতিদিনই যাতায়াত করে দুই দেশের মধ্যে নতুন ঐক্য ও সেতুবন্ধনের দিগন্ত মৈত্রী এক্সপ্রেস।
দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্তির পর ভারত-বাংলাদেশ যাত্রীবাহী চলাচল বন্ধ হলেও ১৯৬২ সালে পুনরায় চালু হয়। একই সালে দর্শনা আন্তর্জাতিক স্টেশনটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। পুনরায় শুরু হয় চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনা দিয়ে ভারতের গেঁদে রেলরুটে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল। পরে ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হলে আবার বন্ধ হয়ে যায় ভারত-বাংলাদেশ ট্রেন চলাচল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর বিভিন্ন সময়ে দুই দেশের স্বপ্নের ট্রেনটি চালুর উদ্যোগে গ্রহণ করা হলেও তা ছিল শুধু চিঠি চালাচালির মধ্যেই সীমাবন্ধ। এরপর দীর্ঘ ৩৬ বছর পর ২০০৮ সালের ১৪ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত-বাংলাদেশ স্বপ্নের ট্রেন চলাচল শুরু হয়। যার নাম দেওয়া হয় মৈত্রী এক্সপ্রেস। শুরু থেকে মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনটি সপ্তাহের দুই দিন চলাচল করলেও যাত্রীর চাপ বিবেচনা করে দুই দেশের সরকার তা ছয় দিনে উন্নীত করে। শুধুমাত্র বৃহস্পতিবার বন্ধ থাকে ট্রেন চলাচল।
চুয়াডাঙ্গার দর্শনা আর্ন্তজাতিক রেল স্টেশনের ম্যানেজার মীর লিয়াকত আলী জানান, শুরুতে দুই দেশের যাত্রীর সংখ্যা খুব একটা আশানুরূপ ছিল না। এর মূল কারণ চিহ্নিত করা হয় সময় বিলম্ব। তিনি জানান, ২০০৮ সালে ট্রেনটি চালু হওয়ার পর এয়ারপোর্ট স্টেশনে সময় বিলম্ব, দর্শনা স্টেশনে কাস্টমস ইমিগ্রেশনের জন্য এক ঘন্টা বিলম্ব ও ভারতের গেঁদে স্টেশনে কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনের জন্য দেড় ঘণ্টা সময় বিলম্ব হতো যাত্রীদের। সব মিলিয়ে সময় লাগত সাড়ে তিন ঘণ্টা। এ কারণে মৈত্রী এক্সপ্রেস যাত্রীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। এটি অনুধাবন করে দুই দেশের সরকারের সিদ্ধান্তমতে বাংলাদেশ রেলওয়ের রাজশাহী পশ্চিমাঞ্চলের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট স্বাক্ষরিত পত্রে ২০১৭ সালে ১০ নভেম্বর থেকে দর্শনা ও গেদে স্টেশনে কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে বাংলাদেশের এয়ারপোর্ট স্টেশন ও ভারতের চিতপুর স্টেশনে কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। সেক্ষেত্রে যাত্রীদের সময়ও অনেক কম লাগছে। দর্শনা স্টেশনে এখন শুধু ইঞ্জিন ও ক্রু পরিবর্তনের জন্য ২০ মিনিট যাত্রা বিলম্ব হয়ে থাকে।
কমলাপুর স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী জানান, বর্তমানে মৈত্রী এক্সপ্রেসে আটটি যাত্রীবাহী কোচ ও দুটি পাওয়ারকার ও গার্ড ব্রেকবিশিষ্ট মৈত্রী ট্রেনের যাত্রী বহন ব্যবস্থা রয়েছে ৪৫৬ জন। এর মধ্যে এসি ক্যাবিন ১৩৬টি ও এসি চেয়ার ৩২২টি। তিনি আরও জানান, ২০০৮ সালের ১৪ এপ্রিল ঢাকা-কলকাতাগামী যাত্রীবাহি মৈত্রী এক্সপ্রেস যাত্রা শুরু করলে সে বছর দুই দেশে যাতায়াতকারী যাত্রীর সংখ্যা ছিল ১৮ হাজার ৬৮৩ জন। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে, ততই এ মৈত্রী এক্সপ্রেসে যাত্রীসংখ্যা বাড়ছে। কারণ হিসেবে তিনি জানান, যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে যাত্রী সেবার মান বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিদিনই বাড়ছে যাত্রীদের চাপ। বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্যমতে, মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেন চালু থেকে শুরু করে ২০১৮ সালে যাত্রী পরিবহনে রেকর্ড গড়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর এ ট্রেনে দুদেশের যাত্রী চলাচল করেছে এক লাখ ৭৬ হাজার ২৬৯ জন। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ভারতে গেছে ৮৮ হাজার ৬০৬ জন যাত্রী। আর ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছে ৮৭ হাজার ৬৬৩ জন। যা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে রের্ক্ড। ভালো যাত্রীসেবা ও কোনো ধরনেরর ঝক্কি-ঝামেলা না থাকায় মৈত্রী এক্সপ্রেসে যাত্রী পরিবহনে এমন রেকর্ড দাবি রেলওয়ে কর্মকর্তাদের। তবে যাত্রীদের দাবি—মৈত্রী এক্সপ্রেসে যাত্রীর চাপ বাড়লেও তেমন বাড়েনি যাত্রীসেবা। এ ছাড়া চোরাচালান ও লাগেজ কারবারিদের উৎপাত তো রয়েছেই। চিহ্নিত একটি চক্র প্রতিনিয়ত কৌশল বদল করে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের রমরমা ব্যবসা। এ ক্ষেত্রে তাদের পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করছেন মৈত্রী এক্সপ্রেসের যাত্রীদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সদস্যরাই। চুয়াডাঙ্গার দর্শনা আর্ন্তজাতিক রেল স্টেশনে গত রোববার কথা হয় ভারতগামী মৈত্রী এক্সপ্রেসের যাত্রী তৌহিদুর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, বেশ কিছুদিন ধরে তিনি ঢাকা কলকাতা যাতায়াত করেন মৈত্রী এক্সপ্রেসে। অভিযোগ করে তিনি জানান, ট্রেনের ভেতরে খাবারের মান খুব একটা ভালো নয়, দামও তুলনামূলক বেশি। এ ছাড়া ট্রেনটির সব কক্ষও অপরিচ্ছন্ন। বিভিন্ন সময়ে ট্রেনের দায়িত্বরত অ্যাটেনডেন্টের কাছে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার মেলেনি।
মৈত্রী এক্সপ্রেসে ভারত থেকে বাংলাদেশে আসা যাত্রী সুস্মিতা ঠাকুরের অভিযোগ ও ক্ষোভ দুটোই আছে। গণমাধ্যমকর্মীর পরিচয় পেয়ে তিনি অনেকটা ক্ষোভ নিয়ে জানান, দাদা, যাচ্ছেতাই অবস্থা ট্রেনের ভেতর। এই যাত্রীর অভিযোগ—ভারতের গেঁদে স্টেশনের আগে ও পরে ট্রেনের স্বাভাবিক গতি কমিয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে বস্তা বস্তা চোরাচালানের মালামাল ট্রেনে ওঠানো হচ্ছে। এরপর গেঁদে স্টেশন পেরিয়ে দর্শনা স্টেশনের আগে পরে সেগুলো ফেলে দেওয়া হচ্ছে। অনেকটা প্রকাশ্যে চোরাচালানোর এমন দৃশ্য চোখে পড়লেও দেখেন না ট্রেনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এসব চোরাচালানের সঙ্গে রেলওয়ের শুল্ক আদায়ের দায়িত্বে থাকা একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জড়িত বলে অভিযোগ ভারতীয় এ যাত্রীর। এ ব্যাপারে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের যুগ্ম মহাপরিচালক সফিউর রহমান জানান, প্রতিনিয়ত মৈত্রী এক্সপ্রেসে তল্লাশি অভিযান চালানো হয়। এরপরও বিভিন্ন কৌশলে কিছু লাগেজ আসছে। এ বিষয়ে আমরাও তৎপর আছি। চোরাচালানের মালামাল ট্রেনে ওঠানো হচ্ছে—এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এসবের সঙ্গে আমাদের কেউ জড়িত নেই। তিনি আরও জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে একাধিকবার ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে অভিযান চালিয়ে এই চক্রের বিভিন্ন পণ্যের চালান জব্দ করা হয়েছে। বেশ কয়েকজনকে আটক করেও মামলা দেওয়া হয়েছে।
মৈত্রী এক্সপ্রেসে যাত্রী সেবা নিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক কাজী মো. রফিকুল আলম বলেন, মৈত্রী এক্সপেসে যাত্রীসেবার মান বাড়াতে সব সময়ই সচেষ্ট রয়েছে বাংলাদেশ রেল বিভাগ। কিছু কিছু সমস্যা এখনো বিদ্যমান রয়েছে, সেগুলো নিরসনে আমাদের কমিটি কাজ করছে। ট্রেনে চোরাচালান ও লাগেজ ব্যবসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি তেমন কিছুই জানেন না। বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর নেওয়া হবে। এতে রেলের কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Please follow and like us:
0