সোম. ডিসে ৯, ২০১৯

ব্যর্থ হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষমা করবে না : মাদ্রিদে কপ-২৫ জলবায়ু সম্মেলনে হাসিনা

ব্যর্থ হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষমা করবে না : মাদ্রিদে কপ-২৫ জলবায়ু সম্মেলনে হাসিনা

Last Updated on

প্রত্যাশা ডেস্ক : জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় এখন থেকেই কাজ শুরু করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল সোমবার স্পেনের ফেরিয়া দা মাদ্রিদে (আইএফইএমএ) ‘অ্যাকশন ফর সারফাইভাল: ভালনারেবল নেশনস কপ-২৫ লিডার্স সামিট’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এই আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘সিভিএফ এবং ভি -২০ দক্ষিণ-দক্ষিণ এবং ত্রিমুখী সহযোগিতার অসাধারণ উদাহরণ এবং আমরা বর্তমান সাফল্যকে আরও এগিয়ে নিতে চাই।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যদি আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হই, তাহলে তারা ক্ষমা করবে না। প্রতি মুহূর্তে আমাদের নিষ্ক্রিয়তা পৃথিবীর প্রতিটি জীবিত মানুষকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এখনই সময় কাজ করার।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বের জন্য একটি কঠিন বাস্তবতা। এটি এখন মানুষের জীবন ও পরিবেশ, বাস্তুশাস্ত্র এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। ১৯৯২ সালে আর্থ সামিটের পর থেকে আমরা গ্রিনহাউস গ্যাস হ্রাসে খুব বেশি অগ্রগতি অর্জন করতে পারিনি, এর নির্গমণ এখনও বেড়ে চলেছে। এই প্রবণতা পৃথিবীকে অস্থিতিশীল করে তুলছে।
‘ঝুঁকিতে থাকা আমাদের মতো দেশগুলো, এই পরিস্থিতি মোকাবেলা সীমিত ক্ষমতা এবং নির্দিষ্ট ভৌগলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হই। ক্ষয়ক্ষতির জন্য তুচ্ছ বা কোনো অবদান না রাখলেও ক্ষতির ধাক্কাটা আমাদেরকেই সামলাতে হচ্ছে। এটি একটি অবিচার এবং অবশ্যই বিশ্ব সম্প্রদায়কে বিষয়টি স্বীকার করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘২০০৯ সালের নভেম্বরে মালেতে ফোরামের প্রথম সভার পর বৈশ্বিক জলবায়ু দৃশ্যপটের যথেষ্ট পরিবর্তন হয়েছে। দুর্ভাগ্যক্রমে এক্ষেত্রে ইউএনএফসিসিসির প্রক্রিয়ার অগ্রগতি খুব ধীর এবং অপর্যাপ্ত। বিশেষত আমাদের মতো দুর্বল দেশগুলোতে জাতীয়ভাবে গ্রহণ করা অভিযোজনমূলক উদ্যোগে সহায়তা করার জন্য খুব কমই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
‘বিভিন্ন উদ্দেশ্যে গঠন করা তহবিলগুলোতে পর্যাপ্ত মূলধনের অভাব রয়েছে। সরাসরি এবং সহজে তহবিল পাওয়ার জন্য যেসব শর্ত এবং মানদ- রয়েছে, বেশিরভাগই সেসব সক্ষম দেশগুলোর পক্ষেই যায়।’
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা আমাদের মতো দেশগুলোর সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা থাকলেও ধারণার চেয়েও কম সহায়তা পাচ্ছি। এক্ষেত্রে একটি নতুন সিভিএফ এবং ভি-২০ ট্রাস্ট তহবিল গঠন এবং জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বিশেষ দূত নিয়োগ সম্ভব হলে সেটি হবে বড় সাফল্য।’
মিয়ানমার থেকে নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের কারণে পরিবেশের ক্ষতির বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। ‘মিয়ানমার থেকে আসা ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা নানাভাবে পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরই মধ্যে পরিবেশ বিপর‌্যয়ের সবচেয়ে খারাপ অভিজ্ঞতাও আমাদের হয়েছে। সুতরাং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, এর প্রভাব এবং মোকাবেলার সক্ষমতা অভাবের ওপর ভিত্তি করে দুর্বল দেশগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি মানদ- নির্ধারণ করতে হবে। আমরা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় নিয়মিত সমর্থন এবং আলাদাভাবে উন্নয়ন তহবিল রাখতে চাই। ‘জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বেশি দায়ী দেশগুলোর ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে চরম উদাসীনতা দেখি আমরা। এতে বৈশ্বিক জলবায়ু ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং আমাদেরকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সুতরাং এই উদাসীনতার জবাব চাইতে আমাদের দ্বিধা করা উচিত নয়।’ ‘ব্যাপক হারে অভিবাসনেও জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে, এটা এখন সর্বজনস্বীকৃত। সংঘাতের চেয়ে আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের কারণে এরই মধ্যে অনেক মানুষ স্থানচ্যুত হয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং মরুকরণের মতো ধীরগতির প্রভাবের দিকেও বিশ্বের নজর কম। এই ভারসাম্যহীনতা ঠিক করতে আমাদের কাজ করা উচিত। তিনি বলেন, ‘অভিবাসনের ক্ষেত্রে আমরা একটি কার্যকর অভিযোজন কৌশলের প্রতি আমারা গুরুত্ব দেই, পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিতে চাই। স্থান হারানো মানুষের পুনর্বাসন এবং সুরক্ষার প্রতিও বিশ্বের নজর দেওয়া উচিত। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যেসব মানুষ স্থান হারিয়েছে, তাদেরকে সহায়তা দিতে একটি কার্যকর কর্মকৌশল তৈরিতে আমাদের এখনই আলোচনা শুরু করা দরকার।’ জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত জাতিসংঘ ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের ২৫তম বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিতে তিন দিনের সফরে রোববার স্পেন পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রকৃতির বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই বন্ধ করতে হবে- গুতেরেস : গতকাল সোমবার স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ-২৫-এ শুরু হওয়া দু’সপ্তাহব্যাপী এ সম্মেলন চলবে আগামী ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টেনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘বহু দশক ধরে মনুষ্যপ্রজাতি এই গ্রহের সঙ্গে লড়াই করছে, আর এখন গ্রহ পাল্টা লড়াই করছে। আমাদের অবশ্যই প্রকৃতি বিরুদ্ধে লড়াই বন্ধ করতে হবে এবং বিজ্ঞান আমাদের বলছে আমরা এটা করতে পারব’। স্পেনের মাদ্রিদে জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত জাতিসংঘ ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের ২৫ তম সম্মেলন কপ-২৫-এ দেওয়া ভাষণে তিনি এ কথা বলেছেন। চিলিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও দেশটিতে চলমান বিক্ষোভের কারণে এটি স্পেনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে, সভাপতিত্ব করছেন চিলির পরিবেশমন্ত্রী ক্যারোলিনা স্মিথ সালদিভার। এ সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন বিশ্বের দুইশ’টি দেশের প্রতিনিধিরা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এতে যোগ দিচ্ছেন। জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান বিশ্বের প্রধান একটি সঙ্কট। তাই সম্মেলনটি বেশ গুরুত্ববহ। ধারণা করা হচ্ছে, কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য আগে যেসব লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছিল, এ সম্মেলনে সেসব লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়ানোর প্রশ্নটি আলোচিত হবে। এ সম্মেলনকে সামনে রেখে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, বিশ্ব এমন এক অবস্থায় পৌঁছে যাচ্ছে যেখান থেকে ফিরে আসার আর কোনো সুযোগ থাকবে না। জলবায়ু সঙ্কট অনিবার্য। তাই এটি মোকাবিলায় রাজনৈতিক নেতাদের এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। আগামী ১২ মাস সামনে রেখে, এ সঙ্কটময় সময়ে, বিশেষ করে অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণকারী প্রধান দেশগুলো থেকে কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি আদায় করতে হবে। ২০৫০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নিরপেক্ষতা অর্জন করতে হবে। তিনি বলেন, খননের মাধ্যমে জ্বালানি আহরণ বাদ দিয়ে জ্বালানির চাহিদা পূরণে নবায়নযোগ্য শক্তি ও প্রাকৃতিক সমাধানের দিকে আগাতে হবে। এদিকে, বিশ্বের অধিকাংশ দেশই প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। ২০২০ সালের আগেই জলবায়ু সঙ্কট মোকাবিলায় নতুন পদক্ষেপ নিতে হবে চুক্তিবদ্ধ দেশগুলোকে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে ঘোষণা দিয়েছেন, প্যারিস চুক্তি থেকে বের হয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে, এর জন্য এক বছর সময় লাগবে।
কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলোর ভূমিকা ‘অত্যন্ত অপর্যাপ্ত’ বলেও সমালোচনা করেন গুতেরেস। তিনি বলেন, ‘জলবায়ু সংক্রান্ত বিপর্যয় ঘন ঘন হচ্ছে, আরো ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক হচ্ছে’। জাতিসংঘ মহাসচিব জানান, প্রতিবছর বায়ুদূষণের কারণে ৭০ লাখ লোক মারা যায়। এর কারণে মানবস্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। গুতেরেস তার বক্তব্যে বৈশ্বিক গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণের জন্য দায়ী গুটিকয়েক দেশকে দায়ী করেছেন। অবশ্য তিনি এসব দেশের নাম উল্লেখ করেন নি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্র চলতি বছরের শেষ নাগাদ প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। শীর্ষ কার্বন নিঃসরণকারী দেশ চীন, ভারত, রাশিয়া ও ব্রাজিল অবশ্য চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার না করলেও কার্বনমাত্রা কমিয়ে আনার ব্যাপারে তাদের প্রতিশ্রুতি অপ্রতুল।

Please follow and like us:
3