রবি. নভে ১৭, ২০১৯

বৈষম্য বৃদ্ধিতে ঝুঁকিতে প্রবৃদ্ধি

বৈষম্য বৃদ্ধিতে ঝুঁকিতে প্রবৃদ্ধি

Last Updated on

বিশেষ সংবাদদাতা : এসডিজি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্র নিয়ে বর্তমান সরকারের যে হাঁকডাক দেখা গেছে এতদিন প্রস্তাবিত বাজেটে তার কার্যকর মূল্যায়ন দেখা যাচ্ছেনা। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি বলেছে, বাংলাদেশে যে হারে বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৭-৮ শতাংশ ধরে রাখা সম্ভব হবে না। ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত হোটেল লেকশোরে এক সংবাদ সম্মেলনে এমন অভিমত তুলে ধরেন সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। দেবপ্রিয় বলেন, যেই সমাজে বৈষম্য বৃদ্ধি পায়, সেই সমাজ আজ হোক কাল হোক টেকে না, এগোতে পারে না। সেই সমাজগুলোতে প্রবৃদ্ধির হারে পতন ঘটে। যেভাবে বাংলাদেশে বৈষ্যম বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে ৭, ৮, ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি টেকানো কষ্টকর হবে। এটা ঐতিহাসিকভাবে অর্থনৈতিক তত্ত্বে সত্য। ‘বাংলাদেশ তো সৃষ্টি হলো বৈষম্যের কারণে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাই হয়েছে বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। তো ওই বৈষম্য যদি দেশের ভেতরে বাড়তে থাকে তাহলে আগামী দিনে আমি কেমন করে ওই জায়গাতে (সমৃদ্ধ বাংলাদেশ) পৌঁছাবো’ বলেন দেবপ্রিয়। শুধু সিপিডির বক্তব্যেই নয় সাধারণ বিশ্লেষণেও বিষয়টি উঠে এসেছে। নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের কারণে সাধারণের নিত্যব্যবহার্য পণ্য যেমন- এলপি গ্যাস, গুঁড়া দুধ, গুঁড়া মসলা, টমেটো কেচাপের দাম বাড়তে পারে। শখ পূরণ করতে স্মার্টফোন কিনতেও বেশি খরচ করতে হবে। গাড়ি রেজিস্ট্রেশন, মোবাইল ফোনে কথা বলারও খরচ বাড়বে। এত খরচের পর অর্থ থাকলে সঞ্চয়ের প্রশ্ন। কিন্তু সেখানেও করের বোঝা চাপানো হয়েছে। সঞ্চয়পত্রের উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ মধ্যবিত্তের আয়ে করের বোঝা বেড়েছে। পুরনো ভ্যাট আইনে এলপি গ্যাস, গুঁড়া দুধ, গুঁড়া মসলা, টমেটো কেচাপ, চাটনি, ফলের জুস, টয়লেট টিসু, টিউবলাইট, চশমার ফ্রেমসহ নিত্যব্যবহার্য ৮৬টি আইটেমের ওপর ট্যারিফ মূল্য ছিল। নতুন আইনে উৎপাদন পর্যায়ে এসব পণ্যে ট্যারিফ মূল্যের পরিবর্তে ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হচ্ছে। এ কারণে গুঁড়া দুধের দাম কেজিপ্রতি ২০-৫০ টাকা, গুঁড়া মসলার দাম কেজিপ্রতি ২-১০ টাকা, ফলের জুসের দাম ২-৫ টাকা বাড়তে পারে। একই কারণে বাসাবাড়িতে ব্যবহার্য এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের দাম বাড়বে। ১ জুলাইয়ের পর থেকে জামাকাপড় কিনতে গেলে বেশি অর্থ খরচ করতে হবে। কারণ আগে পোশাক মূল্যের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হতো, এখন সেখানে সাড়ে ৭ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে। অন্যদিকে যারা পোশাক বানিয়ে পরেন, তাদেরও ছাড় নেই। জামাকাপড় তৈরির ওপর ১০ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে। ধূমপানে অভ্যস্তদের ওপর প্রস্তাবিত বাজেটে ভ্যাটের বোঝা বাড়ানো হয়েছে। নিম্ন থেকে উচ্চমানের প্রতিটি সিগারেটের মূল্যস্তর বাড়ানো হয়েছে। এ কারণে সব ধরনের সিগারেটের দাম বাড়বে। গরিবের বিড়ির দাম ও সম্পূরক শুল্ক দুটোই বাড়ানো হয়েছে। ফিল্টারবিহীন হাতে তৈরি ৮, ১২ ও ২৫ শলাকার প্রতি প্যাকেট বিড়ির দাম যথাক্রমে বাড়ানো হয়েছে ৪৮ পয়সা, ৭২ পয়সা ও দেড় টাকা। সম্পূরক শুল্ক ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করা হয়েছে। অন্যদিকে ফিল্টারযুক্ত ১০ ও ২০ শলাকার বিড়ির দাম যথাক্রমে ১ ও দুই টাকা বাড়ানোর পাশাপাশি ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। ধোঁয়াবিহীন তামাক যেমন জর্দা ও গুলের দামও বাড়বে। মোবাইল ফোনে কথা বলারও খরচ বাড়বে। বর্তমানে কথা বলার ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আদায় করা হয়। বাজেটে সম্পূরক শুল্ক হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হচ্ছে। বাজেট ঘোষণার দিন থেকে তা কার্যকর হবে। যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, লরি, অ্যাম্বুলেন্স ও স্কুলবাস ছাড়া সব ধরনের পরিবহন রেজিস্ট্রেশন, রুট পারমিট নবায়ন, ফিটনেস সনদ, মালিকানা সনদ নিতে এবং নবায়ন করতে বিআরটিএ নির্ধারিত সেবামূল্যের ওপর ভ্যাটের পাশাপাশি ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক দিতে হবে। যারা বাড়িঘর করার কথা ভাবছেন, তাদের জন্যও দুঃসংবাদ আছে। নতুন ভ্যাট আইনের কারণে রডের দাম বাড়বে। বর্তমানে রড উৎপাদন ও বিপণনে টনপ্রতি ৯০০ টাকা ভ্যাট দিতে হয়। আগামী দিনে টনপ্রতি রডের ক্ষেত্রে সেটি ২ হাজার টাকা করা হচ্ছে। অর্থাৎ টনপ্রতি রডের দাম ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা বাড়তে পারে।
বেতন আর সুদেই ব্যয় দেড় লাখ কোটি টাকা
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট রাজস্ব বাজেটের এক লাখ ৪৪ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা খরচ হবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পেনশন এবং সুদ মেটাতে। বাজেটের সবচেয়ে বেশি অর্থ ৬০ হাজার ১০৯ কোটি টাকা চলে যাবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বেতন ভাতায়। যা মোট রাজস্ব বাজেটের ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ। সুদ পরিশোধে খরচ হবে ৫৭ হাজার ৬৮ কোটি টাকা বা ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ। আর অবসরে যাওয়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের পেনশন বাবদ ব্যয় ব্যয় হবে ২৭ হাজার ১১৮ কোটি টাকা। এই অংক ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। বিদায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের মূল বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বেতন ভাতায় বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ৫৮ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা অবশ্য কিছুটা কমিয়ে ৫৭ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকায় নামিয়ে এনেছেন অর্থমন্ত্রী। সুদ পরিশোধে বরাদ্দ ছিল ৫১ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে কমে ৪৮ হাজার ৭৪২ কোটি টাকা হয়েছে। পেনশনে মূল বাজেটের ২৬ হাজার ৪৭ কোটি টাকা থেকে কিছুটা বেড়ে ২৬ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা হয়েছে। মুস্তফা কামাল তার প্রথম বাজেটে বেতন ও ভাতা বাবদ যে বরাদ্দ রেখেছেন তারমধ্যে ৮ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা কর্মকর্তাদের বেতনে খরচ করবেন। ২৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা খরচ করবেন কর্মচারিদের বেতনের জন্য। আর কর্মকর্তা-কর্মচারিদের ভাতার জন্য রেখেছেন ২৮ হাজার ১০০ কোটি টাকা। সুদ পরিশোধের মধ্যে অভ্যন্তরীন ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য রাখা হয়েছে ৫২ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা। আর বিদেশী ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য ৪ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা। নতুন বাজেটে বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি বাবদ করাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা। প্রণোদনায় বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১০ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকা।গত ২০১৭-১৮ এবং বিদায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রণেঅদনার জন্য কোন অর্থ বরাদ্দ ছিল না।
ঋণের চিত্র
নতুন বাজেটে সরকারের ব্যয় নির্বাহের জন্য যে বাজেট প্রস্তাব অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেছেন, সেখানে সামগ্রিক ঘাটতি দেখানো হয়েছে এক লাখ ৪১ হাজার ২১২ কোটি টাকা। ঘাটতির এই পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। অবশ্য বাজেটে চার হাজার ১৬৮ কোটি টাকা বৈদেশিক অনুদান পাওয়ার আশার কথা বলেছেন মুহিত। ওই অনুদান পাওয়া গেলে ঘাটতি থাকবে এক লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৫ শতাংশ। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে সরকারকে দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে ১ লাখ ৪১ হাজার ২১২ কোটি টাকা ঋণ নিতে হবে। ঋণের অর্থের এই পরিমাণ বিদয়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের ঋণের চেয়ে প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি। অর্থমন্ত্রী পরিকল্পনা করেছেন, এবার বৈদেশিক উৎস থেকে ৭৫ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হবে। সেখান থেকে ১১ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা আগের ঋণের কিস্তি পরিশোধে খরচ হবে। ফলে সরকারের নিট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৬৩ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা। ঘাটতির বাকি ৭৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা নেওয়া হবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে। এর মধ্যে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হবে ৪৮ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে নেয়া হবে ২৭ হাজার কোটি টাকা। বাকি তিন হাজার কোটি টাকা অন্যান্য উৎস থেকে। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছিল এক লাখ ২১ হাজার ২৪২ কোটি টাকা, সংশোধিত বাজেটে তা বেড়ে এক লাখ ২২ হাজার ১৪২ কোটি টাকা হয়েছে। তবুও বাজেটকে সময়োপযোগী বলেছে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সংগঠন।
বাজেট সময়োপযোগী ও গণমুখী: আইডিইবি
সুখী-সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেটকে সাহসী, সময়োপযোগী ও গণমুখী বলে আখ্যা দিয়েছে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)। গতকাল শনিবার (১৫ জুন) আইডিইবি’র কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাপতি এ কে এম এ হামিদ ও সাধারণ সম্পাদক মো. শামসুর রহমানের যৌথ স্বাক্ষরিত এক বাজেট প্রতিক্রিয়ায় এ কথা বলা হয়। মআইডিইবি আশাবাদ ব্যক্ত করে যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টি, মানবসম্পদ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন, জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশের ওপর অর্জন, মূল্যস্ফীতি ৫.৫ হারের মধ্যে রাখাসহ গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা রাখার প্রত্যয়ে বাজেটে আয়-ব্যয় যেভাবে প্রতিফলিত হয়েছে সেই অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জিত হবে। বাজেট প্রতিক্রিয়ায় সামগ্রিক শিক্ষাখাতে বাজেটের অর্থ বরাদ্দকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও মানবসম্পদ উন্নয়নে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষাখাতে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বরাদ্দকে অপ্রতুল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাজেট প্রতিক্রিয়ায় আরও জানানো হয়, এবারের সামগ্রিক শিক্ষা বাজেটে ৬১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষাখাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১.৫ শতাংশ এবং শিক্ষা বাজেটের ১২ শতাংশ। সরকার মানবসম্পদ উন্নয়নে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে যে মহাপরিকল্পনা নিয়েছে বাজেটে তার প্রতিফলন ঘটে নাই। মানবসম্পদ উন্নয়নে সরকারের গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রস্তাবিত বাজেটে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষাখাতে বরাদ্দ শিক্ষা বাজেটের ২০শতাংশ এবং পরের অর্থবছরে ৩০ শতাংশে উন্নীত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আইডিইবি।
সরকার এত টাকা নিলে বিনিয়োগ কমে যাবে: এফবিসিসিআই
বাজেট ঘাটতি মোকাবেলায় ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার বড় অংকের ঋণ নেয়ার যে পরিকল্পনা করেছে, তা পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছে এফবিসিসিআই। ব্যবসায়ীদের সংগঠনটি বলছে, ৪৭ হাজার কোটি টাকা সরকার নিয়ে গেলে বেসরকারি বিনিয়োগে ঘাটতি দেখা দেবে। আগামী অর্থবছরের জন্য বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত বাজেটের ওপর শুক্রবার প্রতিক্রিয়া জানায় এফবিসিসিআই। পাঁচ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকার বাজেটে এবার ঘাটতি ধরা হয়েছে এক লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। এই ঘাটতি পূরণে সরকার ২৭ হাজার কোটি টাকা নেবে সঞ্চয়পত্র থেকে, ৪৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেবে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে। বাকি ৭১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে বিদেশি ঋণ ও অনুদান থেকে। এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, ‘সরকার ব্যাংক থেকে ৪৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিলে ব্যাংকগুলোর বেসরকরি খাতে বিনিয়োগ কমে যাবে।’ বাজেটে ঘাটতি পূরণে ব্যাংক খাতের উপর নির্ভলশীলতা কমিয়ে বৈদেশিক উৎস, ইনফ্রাকচার ফান্ডস, ইনফ্রাকচার বন্ডস ও অন্যান্য ফিন্যান্সিয়াল টুলস এর উপর জোর দেয়ার অনুরোধও করেন ফাহিম। সার্বিকভাবে প্রস্তাবিত বাজেটকে যুগোপযোগী, জনকল্যাণমুখী ও ব্যবসা সহায়ক বলে অভিহিত করে এফবিসিসিআই। ব্যবসা বান্ধব বলার কারণ হিসেবে এফবিসিসিআইর এর সহ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘অতীতের বাজেটগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে এই বাজেটে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যবসার সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা থাকলেও তা আলোচনার মাধ্যমে সংশোধনের সুযোগ এখনও আছে।’ সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, এই বাজেট দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার বাস্তবায়নকে ত্বরান্বিত করবে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে অপ্রদর্শিত আয় বা কালোটাকার বিনিয়োগের সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাবকেও তিনি সমর্থন করেন। তবে অবৈধ পথে উপার্জিত আয় যেন বিনিয়োগ না হয়, সে দিকে নজর রাখার পরামর্শ দেন তিনি। এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘কালো টাকা মানে যারা বৈধপথে আয় করেছে; কিন্তু কোনো কারণে কর পরিশোধ করেননি। ওইসব অর্থ বিনিয়োগের পক্ষে আমরা। এটি সুযোগ থাকলে বিনিয়োগ বাড়বে। তবে অবৈধ পথে আয় করা অর্থের বিনিয়োগের পক্ষে আমরা নেই।’ তিন লক্ষ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার কথা উল্লেখ করে হয়রানিমুক্ত রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করারও তাগিদ দেওয়া হয় সংবাদ সম্মেলনে।
কোম্পানি করহার না কমায় হতাশ এমসিসিআই
আসছে বছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে মোটা দাগে সাধুবাদ জানালেও করপোরেট করের হার না কমায় হতাশা প্রকাশ করেছে মেট্রোপলিটন চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)। এক বিবৃতিতে শুক্রবার এমসিসিআই বলেছে, ‘উচ্চ করপোরেট করহার এবং সেই সাথে লভ্যাংশের ওপর কর বাংলাদেশকে ব্যবসায়ী গন্তব্য হিসাবে আকর্ষণহীন করে তুলবে।’ এখন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির বিদ্যমান করহার ২৫ শতাংশ এবং অতালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য এই হার ৩৫ শতাংশ। এই হারকে উচ্চ দাবি করে কমানোর দাবি জানিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘শেয়ারবাজারে স্টক ডিভিডেন্ডের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপ করায় এমসিসিআই উদ্বিগ্ন। এটি তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে মূলধন তৈরি ও পুনঃবিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করতে পারে।’ গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেট উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বাজেটে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী শিক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও গ্রামে প্রয়োজনীয় সব সুবিধা নিশ্চিত করতে পরিকল্পিত নগরায়নে গুরুত্ব দেওয়ায় অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানায় এমসিসিআই। এমসিসিআই মনে করে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বর্ধিত রাজস্ব লক্ষ্য ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬শ কোটি টাকা অর্জনই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এই রাজস্ব লক্ষ্য বর্তমান করদাতাদের ওপর চাপ বাড়াবে।
শিক্ষাখাতে ভালো কিছু আশা করা যাবে না
শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বাজেটের সর্বোচ্চ বরাদ্দ এবার এই খাতেই। মোট বাজেটের অংশ হিসেবে ও টাকার অংশে– শিক্ষা খাতে দুইভাবেই এবার বরাদ্দ বেড়েছে বলে বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে। তবে এ বরাদ্দ অপর্যাপ্ত ও গতানুগতিক বলে মনে করছেন অনেক শিক্ষাবিদ। শিক্ষা খাতে যে পরিমাণ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তা দিয়ে মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না বলে মনে করেন তারা। গতকাল জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য বাজেট উত্থাপন করা হয়। প্রস্তাবিত বাজেটে দেখা গেছে, শিক্ষা ও প্রযুক্তিখাতে গতবারের চেয়ে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ বরাদ্দ বেড়েছে। টাকার অংকে তা ৭৯ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা। গতবারের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় তা বেড়েছে ১৩ হাজার ২৩১ কোটি টাকা। মোট বাজেটের ১৫ দশমিক ২ ভাগ অর্থ এবার এই খাতে ব্যয়ের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। শিক্ষা ও প্রযুক্তিখাতের সংশ্লিষ্ট চার মন্ত্রণালয়েরই বরাদ্দ বেড়েছে এবার। বেসরকারি শিক্ষকদের বহুল প্রত্যাশিত এমপিওভুক্তি খাতে ৯ বছর পর নতুন বরাদ্দ এবছর দেয়া হয়েছে। শিগগিরই নতুন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হতে পারে বলে জানা গেছে। প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ২০১৯-২০ সালের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। গত ৭-৮ বছর ধরে আমরা ১১ থেকে সাড়ে ১১ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছি। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শিক্ষা খাতে এটি নিম্নতম বাজেট। উন্নত শিক্ষার আমরা যে স্বপ্ন দেখছি এ বাজেট দিয়ে তা বাস্তবায়ন কিভাবে সম্ভব?
চার বিশ্লেষকের অভিমত
বাজেটের কোন অংশটি সবচেয়ে বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করেছে? বার্তা সংস্থা ডয়চে ভেলের পক্ষ থেকে এই প্রশ্ন ছিল চার বিশেষজ্ঞের কাছে। উত্তরে অধ্যাপক ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘বিগত কয়েক বছরে ঘোষিত বাজেটের চেয়ে কীভাবে বাস্তবায়ন হয় সেই দিকেই আমার মনোযোগ বেশি। গত বছরের বাজেটে কী ছিল, রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা কেন অর্জিত হয়নি সেটা যদি বুঝতে পারি তাহলে এবারের বাজেট হয়ত আরও ভালো বুঝতে পারব। আর কর কীভাবে পরিবর্তন হলো সেটা তো বোঝা গেল না। একটা জিনিস আমার ভালো লেগেছে, করের হার না বাড়িয়ে কীভাবে আওতা বাড়ানো যায় সেই চেষ্টা করা হয়েছে। এটা নীতিগতভাবে ভালো দিক।’
অধ্যাপক কাজী খলিকুজ্জমান আহমেদ বলেন, ‘আমার ভালো লেগেছে তারুণ্যের ব্যবহার। আওয়ামী লীগের ২০১৮ সালের ইশতেহারে এটাকে খুবই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তারুণ্যের শক্তি বাংলাদেশের সমৃদ্ধি।’ ‘আমাদের এখানে পাঁচ কোটি ২৮ লাখের মতো তরুণ প্রজন্ম আছে, এদেরকে ব্যবহার করার ওপর খুবই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বারবার বলা হয়েছে, এটা আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে। আরেকটা জিনিস ভালো লেগেছে, ইশতেহারেও ছিল, আমার গ্রাম আমার শহর, মানে গ্রামগুলোকে শহরের সুযোগ সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা। এটাও একটা উল্লেখযোগ্য দিক। এবারও অন্য বছরের মতো শিক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সেটাও ভালো দিক। কিন্তু বাস্তবায়ন করতে করতে সময় লেগে যায়, খুবই ধীরে শুরু হয় বাস্তবায়ন। এবার আগে থেকে বাস্তবায়ন শুরু হবে বলে আশা করব।’ ‘আরেকটা জিনিস ব্যাংকিং খাতে যে বিশৃঙ্খলা আছে, সেটা দূর করার জন্য কিছু প্রস্তাবনা আছে, সেই প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। দ্রুত কমিশন গঠন করে যে সমস্যাগুলো আছে সেগুলো চিহ্নিত হরে সমাধান করতে হবে। কিছু সমস্যা তো আগে থেকেই চিহ্নিত আছে, সেগুলো সমাধানে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। আর বাজেটে প্রতি বছরই রাজস্ব আদায় ঘাটতি থাকে। এবার আগে থেকে চেষ্টা করলে সেটা হয়ত পূরণ করা সম্ভব।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গর্ভনর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘বাজেট আসলে গতানুগতিক হয়েছে। এর মধ্যে এমন কোনো বিশেষ বিষয় নেই। তবে ভ্যাট বাস্তবায়ন করতে পেরেছে এটাই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক। যদিও ভ্যাটের নিয়ম অনুযায়ী একটি হার হওয়া উচিত ছিল সেটা হয়নি। তবুও অনেক ঝামেলার পর এটি বাস্তবায়ন হয়েছে।’ ‘আরেকটি জিনিস হলো তরুণ-যুবকদের জন্য একটা মূলধনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যদিও এটা খুবই কম তারপরও যে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে সেটি বড় দিক। এই দুটি জিনিস আমার মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।’ গবেষণা সংস্থা সেন্টার পর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘এবারের বাজেটে সরকার ধারাবাহিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে। সেটার ব্যাপারে নিরাপত্তাবলয় বাড়ছে। কোন কোন ক্ষেত্রে ভাতাও বেড়েছে এবং অন্যান্য যে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী আছে তাদের জন্যও বরাদ্দ বেড়েছে। বিশেষ করে এর আগে নারী বাজেটের সাথে এখন শিশু বাজেট যুক্ত হচ্ছে। প্রবীণদের ব্যাপারেও কথা আছে, এই মানবিকতার দিকটি আমার কাছে পছন্দ হয়েছে।’

Please follow and like us:
3