বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো থেকে তৈরি হচ্ছে নিম্নমানের চিকিৎসক

বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো থেকে তৈরি

জস্ব প্রতিবেদক : বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো থেকে দেশের চিকিৎসকদের বড় একটি অংশ বের হচ্ছে। কিন্তু ওসব কলেজে নানা অনিয়ম ও ঘাটতিতে মানসম্পন্ন চিকিৎসক তৈরির উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অধিকাংশ বেসরকারি মেডিকেল কলেজই নীতিমালা মানছে না। ফলে ওসব প্রতিষ্ঠানকে নি¤œমানের চিকিৎসক তৈরি হচ্ছে। ফলে দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে হুমকির আশঙ্কা বাড়ছে। বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি। অধিকাংশ বেসরকারি মেডিকেল কলেজই অনুমোদনের বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের তথ্যানুযায়ী বিগত ২০১৬ সালে দেশে ৬৩ হাজার ৩৯৫ জন চিকিৎসকের চাহিদার বিপরীতে জোগান ছিল ৭৪ হাজার ৯২৪ জন। চিকিৎসকের সংখ্যা বৃদ্ধির বিদ্যমান হার অব্যাহত থাকলে ২০২১ সালে ৬৭ হাজার ২৬৫ জনের চাহিদার বিপরীতে অতিরিক্ত চিকিৎসকের সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৩ হাজার ৪০২। তার ৫ বছর পর উদ্বৃত্ত চিকিৎসকের সংখ্যা বেড়ে হবে ১ লাখ ২২ হাজার ৯৬৫। ৭১ হাজার ৩৭০ জনের চাহিদার বিপরীতে ২০২৬ সালে দেশে চিকিৎসকের সংখ্যা পৌঁছবে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৩৩৫ জনে।স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চিকিৎসা শিক্ষার মান যাচাইয়ে নিয়মিত বেসরকারি মেডিকেল কলেজ পরিদর্শন করে। কিন্তু চলতি বছর পরিদর্শন করা বেশিরভাগ বেসরকারি মেডিকেল কলেজের বিরুদ্ধেই নিয়ম না মানার প্রমাণ পাওয়া গেছে। আর ওসব প্রতিষ্ঠানের সার্বিক পরিস্থিতিকে হতাশাজনক বলছেন অধিদপ্তরের পরিদর্শন দল।
সূত্র জানায়, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপন ও পরিচালনাসংক্রান্ত নীতিমালায় বলা হয়েছে, ৫০ আসনের একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ২৫০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল থাকতে হবে। আসনসংখ্যা ১০০ হলে হাসপাতালের শয্যা থাকতে হবে ৫০০টি। ৭০ শতাংশ শয্যায় আবার সার্বক্ষণিক রোগী ভর্তি থাকতে হবে। আর প্রতি ১০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক থাকতে হবে একজন। কিন্তু বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা মেডিকেল কলেজগুলোতে ওসবের কোনোটিই মানা হচ্ছে না। গুলশানের বেসরকারি সাহাবউদ্দিন মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের দাবি তাদের হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা ৫০০। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিদর্শক দল সরেজমিন গিয়ে শয্যা দেখেছে অর্ধেকেরও কম। কলেজটির জন্য সাড়ে ৬ কাঠা ও হাসপাতালের ১১ কাঠা জমির কথা বলা হলেও তা ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটিতে স্বল্পসংখ্যক রোগী থাকলেও কাগজে-কলমে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়। ৯০ আসনের কলেজটির শ্রেণীকক্ষও অপরিসর ও অপরিচ্ছন্ন। মিউজিয়ামে পর্যাপ্ত সরঞ্জামাদি নেই। পাশাপাশি সব বিভাগেই শিক্ষক সঙ্কট প্রকট। নিয়ম না মানা বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর আরেকটি হচ্ছে আশুলিয়ার নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজ। ওই প্রতিষ্ঠানে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি এবং বিষয়ভিত্তিক ল্যাবরেটরি ও মিউজিয়াম শিক্ষা উপকরণের ঘাটতি পেয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বেসরকারি মেডিকেল কলেজটি শিক্ষার্থী অনুপাতে প্রয়োজনীয় শিক্ষকও দেখাতে পারেনি। বেসরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপন ও পরিচালনা নীতিমালার অনেক শর্তই পূরণ করা হয়নি। আর মোটেই সন্তোষজনক নয় শিক্ষার মান ও পরিবেশ। একইভাবে বেসরকারি আশিয়ান মেডিকেল কলেজেও নানা অনিয়ম বিদ্যমান। কলেজটির বিষয়ে পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নীতিমালা অনুযায়ী হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা অপ্রতুল। রোগী ভর্তির হারও অনেক কম। বেসিক ও ক্লিনিক্যাল সায়েন্সের শিক্ষকস্বল্পতা রয়েছে। মেডিকেল কলেজটির একাডেমিক ও হাসপাতালের কার্যক্রমও মানসম্মত নয়। দেশের অধিকাংশ বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর চিত্র প্রায় একই রকম।
সূত্র আরো জানায়, অধিকাংশ বেসরকারি মেডিকেল কলেজে বিরুদ্ধেই বিদ্যমান নীতিমালার বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ ও অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে না। ফলে দেশের মেডিকেল শিক্ষার মান নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। তৈরি হচ্ছে না দক্ষ চিকিৎসক, যার প্রভাব পড়ছে সার্বিক চিকিৎসা সেবায়। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না নিয়ে নীতিমালা লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করানো মেডিকেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে- সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ, ডাক্তার সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ, নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজ, ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ, সাহাবউদ্দিন মেডিকেল কলেজ, মার্কস মেডিকেল কলেজ, এনাম মেডিকেল কলেজ, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ, ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন মেডিকেল কলেজ, কুমুদিনী মেডিকেল কলেজ, রংপুর নর্দান মেডিকেল কলেজ ও হলি ফ্যামিলি মেডিকেল কলেজ। অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করায় ওসব মেডিকেল কলেজকে জরিমানাও করা হয়েছে।
এদিকে মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি, শিক্ষক নিয়োগসহ সার্বিক একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারকিতে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট রয়েছে। সেগুলোর একটি হচ্ছে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি)। কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লাহ জানান, বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো মন্ত্রণালয়, বিএমডিসি ও সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম করছে। তবে সম্প্রতি তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ের জন্য একটি গাইডলাইন প্রণয়নের কাজ চলছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমসিএ) অর্থ সম্পাদক ইকরাম হোসেন বিজু বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবি বলেন, মানের দিক থেকে মেডিকেল কলেজগুলোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কোনোটির মান অনেক ভালো, আবার কোনোটির কম। তবে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করার মাধ্যমেই সরকার মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দেয় এবং সেগুলো পরিচালিতও হচ্ছে সে অনুযায়ী।
এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (চিকিৎসা, শিক্ষা ও জনশক্তি উন্নয়ন) অধ্যাপক আবদুর রশীদ জানান, বেসরকারি কলেজগুলো পরিদর্শনে যে চিত্র পাওয়া গেছে তা হতাশাজনক। শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে বিভিন্ন ধরনের অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছে ওসব প্রতিষ্ঠান। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ নিলেও তাদের জন্য ন্যূনতম সুবিধাও নিশ্চিত করছে না। অনেক বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই রোগীর সংখ্যা খুবই কম পাওয়া গেছে। অথচ চিকিৎসা শিক্ষার ক্ষেত্রে হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সংখ্যক রোগী থাকা জরুরি।

Please follow and like us:
0