বুধ. ফেব্রু ২০, ২০১৯

বিষে নীল হাজারীবাগের ভবিষ্যত কী?

বিষে নীল হাজারীবাগের ভবিষ্যত কী?

Last Updated on

মহানগর প্রতিবেদন : আবর্জনা আর বিষই ছিল হাজারীবাগের নিয়তি। ট্যানারিগুলোর বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্যে সেখানকার পরিবেশ হয়ে উঠেছিল দূষিত। ১৯৮৬ সালে প্রথম উদ্যোগ নেয়ার দীর্ঘদিন পর ২০১৭ সালে সরকারের দীর্ঘদিনের চেষ্টায় হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সাভারে স্থানান্তর করা হয়। তবে যুদ্ধ এখানেই শেষ হয়ে যায়নি।
হাজারীবাগ ট্যানারি এলাকার ভূমি পুনঃউন্নয়নের মাধ্যমে বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। রাজউকের পরিকল্পনায় সম্মতিও জানিয়েছে ট্যানারি মালিক অ্যাসোসিয়েশন।
ট্যানারিগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে পুরো এলাকাটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। রয়েছে পুরনো ও জরাজীর্ণ ভবন। ট্যানারিগুলোতে রয়ে গেছে পরিত্যক্ত আবর্জনা ও ভারী যন্ত্রাংশ।
গবেষণা থেকে পাওয়া যায়, হাজারীবাগের মাটি ক্রোমিয়াম ধাতু দ্বারা দূষিত; যা মানুষের জন্য ক্ষতিকর। বায়ু দূষণের মাত্রা কম থাকলেও তা পুরোপরি বিশুদ্ধ হতে সময় লাগবে।
এলাকাটির আয়তন ৬৫.৫৯ একর। সীমানার উত্তর পাশে রায়ের বাজার, পূর্বে জিগাতলা ও পিলখানা, পশ্চিমে হাজারীবাগ ও বেড়িবাঁধ, দক্ষিণে বোরহানপুর। বর্তমানে ৫৮৭টি শিল্পকারখানা, ৯৮টি বাণিজ্যিক ও ৯৪টি আবাসিকসহ ওই এলাকায় মোট স্থাপনার সংখ্যা ৮৭৪টি।
জন্মের পর থেকে দূষণ আর বিষের সঙ্গে যে হাজারীবাগের বেড়ে ওঠা, রাজউক কীভাবে তা বদলে দেবে- এমন প্রশ্নের জবাবে রাজউকের ডিটেল এরিয়া প¬্যান (ড্যাপ) পরিচালক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘একটি উন্নত আবাসিক এলাকার মতো এখানে থাকবে পার্ক, খেলার মাঠ, কমিউনিটি সেন্টার, মার্কেট, ইনডোর গেমস, সুইমিংপুল, ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়সহ নানা ব্যবস্থা। হাজারীবাগ ট্যানারি এলাকার ভূমি উন্নয়নের মাধ্যমে বসবাসের উপযোগী হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে ট্যানারি মালিক অ্যাসোসিয়েশন, স্থানীয় বাসিন্দা ও নগর পরিকল্পনাবিদদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তারা বিষয়টি স্বাগত জানিয়েছেন।’
ট্যানারি এলাকার দূষণ প্রতিকারের বিষয়ে রাজউক বলছে, মাটি দূষণ, ভারী ধাতু ক্রোমিয়াম দ্বারা মাটি দূষিত হওয়ায় নির্দিষ্ট গভীরতা পর্যন্ত মাটি অপসারণ করে উপযুক্ত মাটি দিয়ে ভরাট করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে বৃক্ষরোপণ ও বনায়ন করতে হবে। এ ছাড়া ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার পরিহার করা এবং প্রকল্প এলাকায় সংরক্ষিত জলধারা নির্মাণের কথাও ভাবা হচ্ছে। দূষিত বায়ু পরিশোধনে দেবদারু জাতীয় গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
অতীতের গবেষণা থেকে জানা যায়, হাজারীবাগের মাটির ১০ থেকে ১২ ফুট গভীর পর্যন্ত দূষণের মাত্রা রয়েছে। এ কারণে আট ফুট গভীর পর্যন্ত মাটি অপসারণ করে তা বিশুদ্ধ মাটি দিয়ে ভরাট করতে হবে। দূষিত মাটির প্রত্যক্ষ সংস্পর্শ এড়াতে এটা করতে হবে। হাজারীবাগ ঘিরে রাজউকের আরও যেসব স্বপ্ন রয়েছে তার মধ্যে আছে- প্রধান সড়ক মাটির তলদেশে (আন্ডারগ্রাউন্ড) রেখে এলাকা গাড়িমুক্ত রাখা। বিভিন্ন স্থাপনার মাধ্যমে এলাকা ঘিঞ্জি না করে খোলা জায়গার মাধ্যমে বসবাস উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা।
এ ছাড়া দখল হয়ে যাওয়া ও মৃত খাল উদ্ধার, মানুষের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে পর্যাপ্ত সংখ্যক স্কুল-কলেজ, কমিউনিটি ক্লিনিক, ট্যানারি ক্লিনিক, লাইব্রেরি নির্মাণের চিন্তাও রয়েছে রাজউকের। পুরো প্রকল্পে পায়ে হাঁটার পথ ও অযান্ত্রিক পরিবহনের বিষয়টিকে আলাদা গুরুত্ব দেয়া হবে।
হাজারীবাগকে বদলে দেয়া প্রকল্পের বিষয়ে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, ‘ট্যানারি শিল্প এলাকায় আমাদের ৬৫ একর জমি আছে। এ জমি নিয়ে আমরা খুবই ভাবনায় ছিলাম। আমরাও চাই এলাকাটি আধুনিক নগরী হোক। তবে আমাদের যেসব সমস্যা আছে তাও রাজউককে দেখতে হবে। আমাদের এলাকার বেশিরভাগ প¬ট ব্যাংক লেনদেনের সঙ্গে সংশি¬ষ্ট।’
রাজউকের পুনঃউন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যে ভূমি মালিকদের বর্তমান সম্পত্তির সমমূল্যের আবাসিক/বাণিজ্যিক স্পেস, সমন্বিত মালিকানায় কমিউনিটি স্পেস, ফ্ল্যাট মালিকদের মধ্যে অ্যাসোসিয়েশন দ্বারা ব্যবস্থাপনা হস্তান্তর প্রভৃতি।
সম্পত্তি মূল্যায়ন পদ্ধতি : বর্তমান বাজার মূল্যে বিদ্যমান জমির মূল্যায়ন করা হবে। ঘর/কাঠামোর প্রতিস্থাপন খরচ একই বিল্ডিং উপকরণের বর্তমান মূল্যে মূল্যায়ন করা হবে। বর্তমান কাঠোমোর মূল্য নির্ধারণ (বিল্ডিং বয়স, উপকরণ খরচ এবং বাসস্থান ইউনিট) করা হবে। বর্তমান বাজার মূল্যে বিদ্যমান বাণিজ্যিক স্পেসের মূল্য নির্ধারণ করা হবে। মালিকানাধীন বেসরকারি জমির মালিকরা এবং যাদের মালিকানার কোনো আইনি নথি নেই, কিন্ত জমিটি দীর্ঘমেয়াদে ভোগ করছেন তারা কর্তৃপক্ষের অধীনে গঠিত সম্পত্তি মূল্যায়ন কমিটি দ্বারা নির্ধারিত সম্পত্তি পাবেন। মালটিপল লিনিয়ার রিগ্রেশন মডেল ব্যবহার করে সম্পত্তির মূল্য নির্ধারণে সমীকরণ করা হবে।

Please follow and like us:
0