রবি. জুলা ২১, ২০১৯

বিপদসীমার ওপরে সুরমা নদীর পানি, নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত

বিপদসীমার ওপরে সুরমা নদীর পানি, নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত

Last Updated on

নিজস্ব প্রতিবেদক : মৌসুমী বায়ু সক্রিয় থাকায় পাঁচ বিভাগে আবারও অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। একই সঙ্গে ভারী বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রামে পাহাড় ধসের আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন সংস্থাটি।
আবহাওয়া অধিদফতরের ‘ভারী বর্ষণের সতর্কবার্তা’ অনুযায়ী, গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে মৌসুমী বায়ু সক্রিয় থাকার কারণে সকাল ১০টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট, বরিশাল এবং চট্রগ্রাম বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী (৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার) থেকে অতি ভারী (৮৯ মিলিমিটারের বেশি) বৃষ্টি হয়েছে। অতি ভারী বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ী এলাকায় কোথাও কোথাও ভূমি ধসের আশঙ্কা করা হচ্ছে। গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে সীতাকু-ে, ১৬৫ মিলিমিটার। এ সময়ে ঢাকায় ১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ। আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, আগামী দুই দিন বৃষ্টির এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকতে পারে। এরপর বৃষ্টির প্রবণতা কমে যেতে পারে। নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
এদিকে, টানা বৃষ্টিতে সুনামগঞ্জের সুরমা নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত সোমবার থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সুরমা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হতে শুরু করেছে। গতকাল দুপুর ২টা পর্যন্ত সুনামগঞ্জের সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৮৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। তা ছাড়া সুনামগঞ্জের সঙ্গে বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুর এলাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত টানা বৃষ্টিপাতে সুনামগঞ্জ শহর, সদর উপজেলা, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, দিরাই, বিশ্বম্ভরপুর ও দোয়ারাবাজর উপজেলার শতাধিক ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে। এ অবস্থায় হাওর তথা নিম্নাঞ্চলের মানুষজন বাড়িঘর ছেড়ে বিভিন্ন উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। নিম্নাঞ্চল এলাকায় পানি প্রবেশ করায় খাবার সংকটে দিন কাটছে মানুষের। এদিকে তাহিরপুর উপজেলা সঙ্গে সুনামগঞ্জের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ বড়দল, উত্তর শ্রীপুর, বাদাঘাট উপজেলার অধিকাংশ গ্রামই প্লাবিত হয়েছে। এতে করে ওই এলাকাগুলোর অধিকাংশ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, জেলায় গেল ২৪ ঘণ্টায় ১৬৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। যেখানে সুরমা নদীর সমতল ৮.০৪ মিটার। যা সুরমা নদীর বিপদসীমার ৮৪ সেন্টিমিটার ওপরে। তাছাড়া আবহওয়া অফিসের তথ্যমতে সুনামগঞ্জে আরো তিনদিন বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানায় কর্তৃপক্ষ। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক ভূঁইয়া বলেন, বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সুনামগঞ্জে আরও তিনদিন বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য প্রতি উপজেলায় কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। তাছাড়া বন্যা মোকাবেলায় প্রশাসনের সকল প্রস্তুতি রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় জেলায় তিন লাখ টাকা, ২০০ মেট্রিক টন চাল এবং ৩ হাজার ৮০০ প্যাকেট শুকনা খাবার মজুত আছে বলেও জানান তিনি। অন্যদিকে এ-জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় জেলার ১৬৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠাদান বন্ধ রাখা হয়েছে। গতকাল বিকেলে এমন তথ্য জানিয়েছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো.জিল্লুর রহমান। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পানি প্রবেশ করায় পাঠদান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ২২টি, দোয়ারাবাজার উপজেলার ১৮টি, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ২৭টি, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার ৩টি, ছাতক উপজেলার ১০টি, জামালগঞ্জ উপজেলার ৩০টি, তাহিরপুর উপজেলার ১৯টি ও ধর্মপাশা উপজেলার ৫৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রয়েছে।
ভারি বৃষ্টিতে বান্দরবানে কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দি : টানা পাঁচ দিনের ভারি বৃষ্টিতে বান্দরবান শহরের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এছাড়া জেলা শহরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। লামা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল বলেন, ভারী বৃষ্টিতে মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে পৌর এলাকার আট হাজার ঘর ও দোকানপাট এবং আশপাশে কয়েকটি ইউনিয়নের প্রায় দুই হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। মাইকিং করে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বলা হচ্ছে বলে তিনি জানান। সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা রেড ক্রিসেন্টের সাধরাণ সম্পাদক একেএম জাহাঙ্গীর বলেন, পৌর এলাকার ইসলামপুর, কাসেমপাড়া, আর্মিপাড়া, বনানী স মিল, বাসস্টেশন, হাফেজঘোনা ও বালাঘাটা এলাকায় বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি ডুবে গেছে। দুর্গত মানুষদের খিচুরি ও শুকনা খাবার দেওয়া হচ্ছে। এদিকে বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কে বাজালিয়া এলাকায় সড়ক ডুবে যাওয়ায় বান্দরবানের সঙ্গে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের যানচলাচল তিন দিন ধরে বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ঝন্টু দাশ। পরিবহন শ্রমিকরা জানান, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে রুমা-থানচি-রোয়াংছড়ি সড়কেও যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সড়কে পানি ওঠায় এবং কিছু জায়গায় ধসের কারণে কোনো গাড়ি চলাচল করতে পারছে না। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নোমান হোসেন প্রিন্স বলেন, শহরে আটটি আশ্রয়কেন্দ্রে পানিবন্দী ও পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা ২০০ পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। এর বাইরে আরও ৩০০ পরিবার আছে; যাদেরকে মাইকিং করে আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যেতে বলা হচ্ছে।
জামালপুরের বকশীগঞ্জে পাঁচ গ্রাম প্লাবিত : জামালপুরের বকশীগঞ্জে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ধানুয়া কামালপুর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকায় একটি বাঁধ ভেঙে ৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বুধবার দুপুরে মুষলধারে বৃষ্টির সময় হঠাৎ বাঁধটি ভেঙে গেলে এসব এলাকা প্লাবিত হতে থাকে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ধানুয়া কামালপুর ইউনিয়নের বাক্কার মোড় নামক স্থানে বন্যা রক্ষা বাঁধের প্রায় ২০ মিটার ভেঙে যায়। এতে পাহাড়ি ঢলের পানি প্রবেশ করে কামালপুর ইউনিয়নের সাতানীপাড়া, বালুঝুড়ি, কনেকান্দা, সোমনাথ পাড়াসহ ৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়। হঠাৎ বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হওয়ায় এসব এলাকার প্রায় ২০টি পুকুর, ২টি মাছের বাণিজ্যিক খামার ও অসংখ্য বীজতলা ডুবে গেছে। ফলে এলাকাবাসীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, বাঁধটি দ্রুত সংস্কার করা না হলে আরও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হতে পারে। এ বিষয়ে বকশীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) দেওয়ান মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাঁধটি সংস্কারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Please follow and like us:
2