শনি. আগ ১৭, ২০১৯

বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও চোখের জলে ঈদ

বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও চোখের জলে ঈদ

Last Updated on

সোহরাব হাসান : মাগুরার সুরাইয়ার কথা কি আপনাদের মনে আছে? ২০১৫ সালের ২৩ জুলাই শহরে ছাত্রলীগের সাবেক দুই নেতার সশস্ত্র ক্যাডারদের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে মাতৃগর্ভে গুলিবিদ্ধ হয়ে যে শিশুটি জন্ম নেয়, তার নাম সুরাইয়া। ওই সংঘর্ষে নিহত হন সুরাইয়ার বাবা বাচ্চু ভূঁইয়ার চাচা মোমিন ভূঁইয়া। সে সময় ঘটনাটি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ছাত্রলীগের দুই পক্ষের গোলাগুলির কারণে নয়, এ রকম গোলাগুলি অনেক জায়গাতেই হয়। মানুষও মারা যায়। কিন্তু মাতৃগর্ভে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা এই প্রথম। স্থানীয় আধিপত্য ও চাঁদাবাজির বিরোধ নিয়ে শহরের দোয়ারপাড়ের বাসিন্দা জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল ভূঁইয়ার সঙ্গে পৌর ছাত্রলীগের সাবেক নেতা মেহেদি হাসান আজিবরের সমর্থকদের সংঘর্ষ হয়। এ সময় বাচ্চু ভূঁইয়া আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী নাজমা বেগম ও চাচা আবদুল মোমিন গুলিবিদ্ধ হন।ওই দিন রাতেই মাগুরা সদর হাসপাতালে সংকটাপন্ন নাজমা বেগমের সিজারের মাধ্যমে গর্ভে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ কন্যাশিশুটির জন্ম হয়। এ কারণে শিশুটি স্বাভাবিক অবস্থায় বেড়ে উঠতে পারেনি। সে হাঁটতে পারে না। মায়ের কোলেই থাকে সারাক্ষণ। শিশুটির চিকিৎসা করানোর সামর্থ্যও মা-বাবার নেই।
তিন বছর পরও আলোচিত সেই মামলার বিচারে অগ্রগতি নেই। ২০১৫ সালের ৩০ নভেম্বর পুলিশ ১৭ জনের নামে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। তার আগে অন্যতম আসামি পৌর ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য মেহেদি হাসান ওরফে আজিবর ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যান। গত বছরের ২৮ মার্চ মাগুরার অতিরিক্ত দায়রা আদালতে অভিযোগপত্র পেশ করা হলেও বিচারকাজ শুরু হতে পারেনি। কেননা, ওই আদালতে ১৫ মাস ধরে বিচারক নেই। আসামিরা জামিন নিয়ে বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বিচারকের অভাবে এ রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচারকাজ বন্ধ থাকতে পারে?
শিশু সুরাইয়ার ঘটনায় অন্তত অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর আগে ও পরের অনেক হত্যা মামলার তদন্তকাজই শেষ হয়নি। যেমন ঢাকায় সাংবাদিক সাগর-রুনি, কুমিল্লায় কলেজছাত্রী সোহাগী আখতার ওরফে তনু, চট্টগ্রামে পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী মাহমুদা খানম ওরফে মিতু, নারায়ণগঞ্জে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যা মামলার ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। সরকারের মন্ত্রীরা বলেন, আইন নিজের গতিতে চলবে। কিন্তু এখানে আইন নিজের গতিতে চলছে না।
মিতু হত্যার তদন্ত ঝুলে আছে
সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম ওরফে মিতু হত্যা মামলার তদন্ত চার বছরেও শেষ হয়নি। কবে নাগাদ তদন্ত শেষ হবে, তা-ও কেউ বলতে পারছেন না। তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলেছেন, তদন্তকাজ শেষ পর্যায়ে, সদর দপ্তরের নির্দেশ পেলেই অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হবে। গত মার্চে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের এক অনুষ্ঠানে আইজিপি মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেছিলেন, ‘প্রতিবেদনটি দ্রুত জমা দেওয়ার জন্য তদন্ত কর্মকর্তাকে আমি নির্দেশ দিয়েছি।’ কিন্তু তাঁর নির্দেশের চার মাস পরও রহস্যজনক কারণে অভিযোগপত্র দাখিল হয়নি। ২০১৬ সালের ৫ জুন চট্টগ্রাম নগরীর জিইসি মোড়ে প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও গুলি করে মিতুকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নগরীর পাঁচলাইশ থানায় বাবুল আক্তার মামলা করেন। এ মামলায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু মূল আসামি মুসা ও কালু পলাতক। সন্দেহভাজন আসামিদের মধ্যে রাশেদ ও নবী নামের দুজন বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন। দুই আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে বলেছেন, মুসার পরিকল্পনায় মিতুকে খুন করা হয়। নিহত মিতুর বাবার অভিযোগ, বাবুল আক্তার এই হত্যার সঙ্গে জড়িত।
শনাক্ত হয়নি তনু হত্যার আসামি
২০১৬ সালের ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকার পাওয়ার হাউসের কাছের ঝোপ থেকে কলেজছাত্রী ও সংস্কৃতিকর্মী তনুর লাশ উদ্ধার করা হয়। তনু হত্যার বিচারের দাবিতে কুমিল্লাসহ সারা দেশে আন্দোলন হয়েছে। ইতিমধ্যে তিন বছর চার মাস চলে গেছে। তিনবার তদন্ত কর্মকর্তা বদল করা হয়েছে। কিন্তু তদন্তে অগ্রগতি নেই। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেছেন, তনুর পোশাকে পাওয়া তিনটি ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে সন্দেহভাজন কয়েকজন ব্যক্তির ডিএনএ মেলানো হয়। তবে কোনো ফল আসেনি। তনুর মায়ের অভিযোগ, তদন্তকারী কর্মকর্তারা তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন না। তাঁরা গরিব বলে কি বিচার পাবেন না?আলামত দেখে মনে হয়, তনুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

Please follow and like us:
2