বাংলা সাহিত্যে গোয়ালন্দ ও কবি কালীকৃষ্ণ গুহ

বাংলা সাহিত্যে গোয়ালন্দ ও কবি কালীকৃষ্ণ গুহ

আউয়াল আনোয়ার : ‘জন্মেছিলাম; এখনো বেঁচে আছি,
এ ছাড়া সবই রৌদ্র সবই তুষার’।
কবি কালীকৃষ্ণ গুহ। আমাদের অহংকার, আমাদের রাজবাড়ীর ভূমিসন্তান। বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের অন্যতম প্রধান বাঙালি কবি। জন্মেছিলেন ফরিদপুর জেলার (বর্তমানে রাজবাড়ী জেলা) তৎকালীন গোয়ালন্দ মহকুমার রাজবাড়ী থানার ছাইবাড়িয়া গ্রামে। পাশেই মূলঘর ও কুঠিরহাট বাজার। ছায়া সুনিবিড় একটি ছবির মতো গ্রাম। সারি সারি সবুজে ঢাকা, পাখির গানে মুখরিত একটি গ্রাম। কবির কথায়, ‘ছাইবাড়িয়া গ্রাম যে গ্রামটির তিনদিক ঘিরে অকল্পনীয় বিস্তৃত একটা মাঠ, যার একমাত্র সম্পদ দিনের সূর্য, রাতের আকাশ আর নক্ষত্রলোক। আমার জন্ম ‘আকালের সনে’ অর্থাৎ ১৩৫০ সাল, ১৭ ভাদ্র, বিকেল আড়াইটা নাগাদ। ‘ইংরেজি ১৯৪৩ সনের ৩ সেপ্টেম্বর।
পরবর্তী সময়ে কবি কলকাতায় স্থায়ী হন, পড়াশুনা শেষে কর্মজীবন শুরু করেন। তো কবির আত্মজীবনীমূলক রচনা ‘গত জন্মের কথা’য় (গত জন্মের কথা, কুবোপাখি, কলকাতা এবং অণুমাত্রিক, সংখা ৮, সম্পাদনা দীপকরঞ্জন ভট্টাচার্য) কবি তার শৈশব, তার বেড়ে ওঠা নিয়ে অনেক কথাই বলেছেন। তার মধ্যে গোয়ালন্দ এলাকাটি বারবার উঠে এসেছে। যেমন-
‘রাজবাড়ী- জীবনের আরও কয়েকটা বিস্ময়ের ব্যাপার ঘটেছে। তার মধ্যে একটা পদ্মানদী। আমরা পায়ে হেঁটে রাজবাড়ীর কাছে চলে আসা গোয়ালন্দ ঘাটে গিয়ে স্টিমার দেখেছি দিনের পর দিন, দেখেছি পদ্মার উত্তাল রূপ-তার কলরোল, তার ভাঙন। গোয়ালন্দ হাই স্কুল ছিল ওই শহরের সব থেকে বড়ো গৌরব আর আমি ছিলাম তার অধমতম ছাত্র। গোয়ালন্দ হাই ইশকুলে দ্বিতীয় বছরটিও কেটে গেল, প্রায় একইভাবে। এখন আমার ছোটোভাই কমলকৃষ্ণ প্রাইমারি ছাড়াবে, তাকেও রাখতে হবে ওই মাসি বাড়িতেই। ভর্তি হতে হবে গোয়ালন্দ হাই ইশকুলে। মাসি বাড়িতে দুজনের থাকার জায়গা নেই। তাহলে আমি কোথায় যাব! এদিকে আমি তো নষ্ট হয়ে গেছি! আমাকে শেষ পর্যন্ত ছাইবাড়িয়া গ্রামেই ফিরতে হবে। ঠাকুরদা তাই চান। কিন্তু মা তা চান না। মা ছেলেকে চিরদিনের জন্য বিসর্জন দিতেও রাজি, কিন্তু মুর্খ দেখতে রাজি নন। তার পাশে আছেন নওয়াঠাকুমা। দু’জনের পরামর্শ চলে। ঠিক হয় আমাকে কলকাতায় আসতে হবে। আমার কোনো মতামত নেই। এই জীবনের ফেল করা ছাত্র হিসাবে অনেক গ্লানি বেড়ে গেছে আমার। আমি চাই শুধুই দূরে চলে যেতে। মার কাছ থেকে, ভাইবোন-ঠাকুরদা-বড়োমার কাছ থেকে, বাবার স্মৃতির কাছ থেকে, ছাইবাড়িয়া গ্রামের নক্ষত্র খচিত অন্ধকার রাত্রিগুলির কাছ থেকে দূরে চলে যেতে। যে শহরের কিছু গল্প শুনে বিস্ময়াবিষ্ট হয়েছি, যেখানে কেউ আমাকে চেনে না, সেখানে চলে যাব। আমার পালানো দরকার। সেই বাঁশিঅলা জাদুকরের সঙ্গে পালাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে ফিরেও তাকায়নি আমার দিকে। তাহলে পালানোর সুযোগ এলো এবার। ১৯৫৭ সালের ৭ এপ্রিল নওয়াঠাকুমার সঙ্গে খালি পায়ে লজ্জায় মাথা নিচু করে কলকাতা চলে এলাম। যা কিছু বিদায় দিয়ে এলাম তার মধ্যে পড়ে রইল আমার শতচ্ছিন্ন বাল্যকাল।’
কী চমৎকার অনুভূতি কবির! কবিকে কবি করে দেবার মতো মধুর শৈশবস্মৃতি, নস্টালজিক মন। তার ভাবুক মন বারবার হুহু করে কেঁদে উঠেছে প্রিয় ছাইবাড়িয়া গ্রাম, গোয়ালন্দ হাই ইশকুল, আরো কত কী! তার প্রিয় বট নিম বাবলা ঝাউ ইউক্যালিপ্টাস আম জাম সজনে কৃষ্ণচূড়া জারুল পলাশ আর কনকচাঁপা ফুল। মালেক মাঝির ঘাট তাকে এখনও ডাকে, কেনো ডাকে? ‘মালেক মাঝির ঘাট’ শিরোনামে তার চমৎকার একটি কাব্যগ্রন্থ রয়েছে।
কর্মসূত্রে একজন ডাকসাইটে আমলা হয়েও অন্তরে একজন চিরবাউল, ভাবুক, সাদা মনের মানুষ কবি কালীকৃষ্ণ গুহ। কবি বলেন, ‘গোয়ালন্দ শহরের সব গল্প, স্টিমারের গল্প, বন্যায় ভেসে-যাওয়া মানুষের গল্প, চর জেগে-ওঠার গল্প। সেই সব গল্প ওই গ-গ্রামের মানুষের সবাই অবাক হয়ে শুনত। অন্দর মহলেও তার ছিল অবাধ গতিবিধি ও আদর আপ্যায়ন। বলাবাহুল্য, তার গল্পগুলি ছিল অতিকথনে ভরা, রূপকথার সমান্তরাল। পদ্মায় হাঙর কুমির সবই দেখেছিল সে। পদ্মার জলে দাউ দাউ আগুন জ্বলতে দেখেছিল। বহুবার বহু ভূত ও ডাকাত দেখেছিল। তার নাকি সাত মাইল পথ হাঁটতে এক ঘণ্টা মাত্র সময় লাগত!
গোয়ালন্দের সেই প্রমত্তা পদ্মা নদী, চর, স্টিমারের গল্প তার স্মৃতিকথায় অপরূপ রূপ। তাই কবি জীবনের এই শেষ প্রহরে এসেও শৈশবমথিত পদ্মাকে ভুলতে পারেন না। ‘নদীর সঙ্গে দেখা’ কবিতাটি এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য-

Please follow and like us: