শুক্র. জানু ১৮, ২০১৯

বহুজাতিক কোম্পানিতে জিম্মি পোল্ট্রি খামারিরা

বহুজাতিক কোম্পানিতে জিম্মি পোল্ট্রি খামারিরা

Last Updated on

কৃষি ও কৃষক প্রতিবেদন : ‘বর্তমানে আমাদের পোল্ট্রি ব্যবসার অবস্থা খুবই খারাপ। একটা পোল্ট্রির বাচ্চা কেনা থেকে শুরু করে খাবার, ওষুধ ও কর্মচারী খরচ সবকিছু মিলিয়ে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা করে খরচ পড়ে। কিন্তু মুরগি যখন বাজারে নিয়ে আসছি, প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১১৫ থেকে ১২০ টাকা করে। প্রতিটা মুরগিতে লস হচ্ছে ৪০ টাকা।’
রাজধানীতে ব্রয়লার মুরগির পাইকারী কাপ্তান বাজারে মুরগি বিক্রি করতে এসে এভাবেই হতাশার কথা জানাচ্ছিলেন নরসিংদী শিবপুরের খামারি নাজমুল ইসলাম। তিনি বলেন, ১০ বছর ধরে খামার করছি, এখন ইচ্ছা করলেই তো বন্ধ করতে পারি না। যার কারণে চালিয়ে যাচ্ছি। মাঝে মাঝে মৌসুম ভেদে কিছু লাভ থাকে। বাজারে ন্যায্য দাম পেতে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
গত বুধবার রাতে ব্রয়লারের পাইকারী কাপ্তান বাজারে একাধিক খামারির সাথে কথা হয়, সবাই তাদের দুর্দশা বা খারাপ অবস্থার কথা জানান।

বাংলাদেশে পোল্ট্রি শিল্পের সাথে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। তবে প্রতিনিয়ত লোকসানের কারণে এ ব্যবসার সাথে জড়িত খামারিদের অবস্থা ক্রমশই খারাপের দিকে যাচ্ছে।
হুমকিতে ছোট ও মাঝারি খামারিরা : অনুসন্ধানে জানা গেছে, লোকসান গুণতে গুণতে ছোট ও মাঝারি খামারিদের অবস্থা এখন খুবই খারাপ। অনেকে আবার ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেছেন, কেউবা লোকসানে দেউলিয়া হয়ে গেছেন। শুধু ব্রয়লার মুরগির খামারিদের খারাপই অবস্থা না, একই রকম করুণ অবস্থা পোল্ট্রির লেয়ার ডিমের খামারিদেরও।
বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ছোট ছোট খামার : ছোট-মাঝারি আকারের খামারিদের সংগঠন জাতীয় পোল্ট্রি রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। প্রতিষ্ঠানটি ২০১০ সালের জুনে একটা সার্ভে করেছিল। সে সময় পোল্ট্রি খামারির সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১৪ হাজার ৭৬৬। তবে বর্তমানে খামারির সংখ্যা ৮২ থেকে ৮৩ হাজার। আর বাংলাদেশ পোল্ট্রি শিল্প সমন্বয় কমিটির (বিপিআইসিসি) তথ্য মতে, সারা দেশে বর্তমানে প্রায় ৬৫-৭০ হাজার ছোট-বড় খামার আছে। অর্থাৎ বিগত ৮ বছরে একাধিক খামার বন্ধ হয়েছে। সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলার ব্রয়লার মুরগির খামারি রমজান আলীর সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের।
রমজান আলী বলেন, আমি আমার নিজ বাড়িতে একটি খামার চালাই। কিন্তু খামারে লাভ কম আসার কারণে সংসার চালানো খুব কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। ছেলে মেয়ের লেখাপড়ার খরচ চালানোই এখন দায়। আমার পরিচিত অনেকেই খামার করেছিল, সব বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমার খামারও হয়তো বন্ধ করে দিতে হবে। ব্রয়লার মুরগির খামারি টাঙ্গাইলের মো. দুলাল মিয়া বলেন, আমার পোল্ট্রি খামার রয়েছে। এখন কোনো লাভ নেই, খালি লোকসান। খাবারের দাম ও ওষুধের দাম বেশি। তিনি বলেন, খামার করেছি অনেক টাকা খরচ করে, এখন লোকসান হলেও কোনো রকম ব্যবসা ধরে রেখেছি।
লেয়ার ডিম উৎপাদনকারী খামারিরাও ভাল নেই : ব্রয়লারের মতো একই রকম খারাপ অবস্থা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে লেয়ার ডিম উৎপাদনকারী খামারিদের। এমনই একজন হচ্ছেন লেয়ার ডিম উৎপাদনকারী খামারি টাঙ্গাইলের কবির হোসেন। তিনি ভালুকা ঘাটাইল সখিপুর ডিম ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদকও। এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, ১০০০ হাজার মুরগির পেছনে খরচ হয় প্রায় ১২ লক্ষ টাকা। সেই ১২ লক্ষ টাকা খরচ করে ২০ হাজার টাকা লাভ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

কারণ জানতে চাইলে কবির হোসেন বলেন, মুরগির ওষুধ ও খাবারের দাম বেশি হয়ে গেছে। বেড়েছে কর্মচারী খরচ, সেই তুলনায় বছরের পর বছর ডিমের দাম একই রকম আছে।

একই সাথে তিনি অভিযোগ করেন, ডিমের সরকারিভাবে নির্দিষ্টভাবে কোনো রেট নেই। যার কারণে ব্যবসায়ীরা যখন যেমন পারে আমাদেরকে সেইভাবে দাম দেয়। ব্যবসায়ীরা আমাদেরকে এক প্রকার জিম্মি করে রাখে।

তিনি নিজেও ক্ষতির মুখে রয়েছেন জানিয়ে বলেন, আমার গত বছর প্রায় এক কোটি টাকা লস হয়েছে। টাঙ্গাইলে হাজার হাজার ডিমের খামারি লোকসানের কারণে তাদের ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেছেন। এমনকি ব্যবসায় ধরা খেয়ে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে।

একই জেলার ডিমের খামারি শামসুল আহাদ বলেন, ডিমের ব্যবসা খুব একটা ভালো না। উৎপাদন কমে গেছে, প্রতিনিয়ত ভাইরাস হচ্ছে। আবার খাবারের দামও বেশি। কিন্তু সেই তুলনায় বাজারে ডিমের দাম নেই।

তিনি বলেন, আমার খামারে ৮শর মতো মুরগি আছে। ডিম বিক্রি করে ওষুধ ও খাবারের দাম ম্যানেজ করতেই হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি।
বহুজাতিক কোম্পানিতে জিম্মি খামারিরা?
খাদ্যের দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, ব্রয়লার মুরগির খাদ্য উপাদানের অর্ধেক স্থানীয় উৎস এবং বাকি অর্ধেক আমদানি করে চাহিদা পূরণ করা হয়। স্থানীয়ভাবে যেসব পণ্য পাওয়া যায় সেগুলোর দাম খুব একটা উঠানামা করে না। আমদানি করে আনা পণ্যগুলোর দরদাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে উঠানামা করে। তবে সেখানেও রয়েছে সিন্ডিকেট। আন্তর্জাতিক বাজারে যদি কোনো পণ্যের দাম ২ শতাংশ বাড়ে, তবে দেশীয় বাজারে সেটার দাম বাড়ানো হয় ২০ শতাংশ। এর প্রধান কারণ আমদানিকারকের সংখ্যা হাতে গোনা। তারা যেভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে সেভাবেই চলে। জাতীয় পোল্ট্রি রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার মহসিন বলেন, ছোট ও মাঝারি আকারের খামারিদের অবস্থা খুবই খারাপ। আমাদের দেশে ৭টি বহুজাতিক কোম্পানি এবং দেশীয় বড় বড় কোম্পানির হাতে বন্দি। বর্তমানে ৭টি বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশে পোল্ট্রি ব্যবসায়ে জড়িত। এগুলো হলো- ভিএইচ গ্রুপ, গোদরেজ, সেগুনা, টাটা, অমৃত গ্রুপ, সিপি এবং নিউ হোপ। এসব কোম্পানি এরই মধ্যে পোল্ট্রি শিল্পের ৪০ শতাংশের বেশি বাজার দখল করে নিয়েছে। খন্দকার মহসিন বলেন, বিভিন্ন দেশে দেখবেন, একটা শ্রেণি খাবার উৎপাদন করে এবং অন্য শ্রেণি ব্রয়লার ও লেয়ার উৎপাদন করে। কিন্তু আমাদের দেশে ৭টি বহুজাতিক কোম্পানি বা বড় বড় কোম্পানিগুলো তারা নিজেরা খাদ্য উৎপাদন করে এবং বাচ্চা উৎপাদনসহ সবকিছু করে থাকে। ফলে তারা কম খরচে উৎপাদন করতে পারছে। অন্যদিকে যারা শুধু ডিম উৎপাদন বা ব্রয়লারের বাচ্চা মুরগি পালছে, তাদের অন্য জায়গা থেকে মুরগি বা খাদ্য কেনা লাগছে। খরচ বাড়ছে এবং ট্যাক্সের আওতায় আসা লাগছে। ফলে খরচের পরিমাণ দ্বিগুণ হারে বাড়ছে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের কাজ হচ্ছে অনগ্রসরদেরকে সাপোর্ট দিয়ে উপরে তুলে নেওয়া। কিন্তু আমাদের দেশে তার উল্টোটা হয়, বড়দেরকে রাষ্ট্র পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে। রাষ্ট্র ছোট উদ্যোক্তার পক্ষে না। এভাবে চললে ছোট বা মাঝারি সাইজের খামারগুলো বন্ধ হয়ে যাবে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, বহুজাতিক কোম্পানি ৩৪ শতাংশ বাজার দখল করে আছে। এভাবে যদি তাদের অবস্থান ৫০ শতাংশের দখলে যায়, তখন সরকার ইচ্ছা করলে তাদের আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে না।
তিনি বলেন, বিশ্বে বড় বড় ব্যবসায়ী যাদের টার্নওভার ১০ কোটি বা তারও বেশি বা যারা পোল্ট্রির উৎপাদন থেকে শুরু করে খাবার-ডিম সবকিছু অর্থ্যৎ এ-টু-জেড সবকিছু করে। তারা বিশ্বে ইন্টিগ্রেশন ট্যাক্সের আওতায় থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে এই নিয়মটা নেই। এটা নির্ধারণ করা খুবই জরুরি। অন্যথায় একটা সময় পুরো মার্কেট তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।
তিনি বলেন, আজকে বাজারে ব্রয়লার মুরগির যে রেট, তার দাম উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম। খামারিদের এখন একটা ডিম উৎপাদনে খরচ পড়ছে ৫ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ৬ টাকা ১০ পয়সা পর্যন্ত। আর ব্রয়লার বিক্রি করছে ৮৫ থেকে ৯৫ টাকা করে। অথচ উৎপাদন খরচ ১০০ টাকার উপরে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটনারি এন্ড অ্যানিমল সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কেএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমরা সাধারণত এই সেক্টর নিয়ে গবেষণা করে থাকি। যার কারণে আমার কাছে মনে হয়েছে, লোকসানের পেছনে একটা অন্যতম কারণ হচ্ছে- মার্কেটে ছোট খামারিদের ধরাশায়ী করতে ইচ্ছাকৃতভাবে মুরগির বাচ্চার দাম বা মুরগির দাম কমিয়ে দিচ্ছে। যখন ছোট খামারিরা মার্কেট থেকে ছিটকে পড়ছে, তখন নিজেদের মতো করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে বড় বড় খামারিগুলো।

ওয়ার্ল্ড পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন (ওয়াপসা) নির্বাহী সদস্য ও শ্রেষ্ঠ ফিড লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার (টেকনিক্যাল সার্ভিস) ডা. আবুল খায়ের বলেন, খামারিদের লোকসানের জন্য স্পেসিফিক একটা কারণ নয়। নানা কারণে এই লোকসানের শিকার হয়।
তিনি বলেন, ছোট খামারিরা অনেক ক্ষেত্রে খাবারের দাম বাড়ার কারণে নিম্নমানের খাবার কেনেন। যার কারণে তাদের উৎপাদনও কমে যায়। এছাড়া বাজার নিয়ন্ত্রণ না থাকাসহ বিভিন্ন কারণ রয়েছে।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, প্রায় প্রতি বছরেই ২-৩ মাস উৎপাদন খরচের চেয়েও কমমূল্যে ডিম ও মুরগির মাংস বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন খামারিরা। খামারিরা যেন নায্য মূল্যে তার পণ্য বিক্রি করতে পারে সেজন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, পোল্ট্রির পাইকারি বাজারে খামারি কিংবা উদ্যোক্তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এ সেক্টরে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এত বেশি যে খামারিরা রীতিমত অসহায়।

Please follow and like us:
2