বঙ্গবন্ধুর চার মূলনীতির একটি হারালো কোথায়?

বঙ্গবন্ধুর চার মূলনীতির একটি হারালো কোথায়?

মমতাজুল ফেরদৌস জোয়ার্দার : এতদিন জেনেছি বঙ্গবন্ধুর মূলনীতি ছিল চারটি- ১. গণতন্ত্র, ২. সমাজতন্ত্র, ৩. ধর্ম নিরপেক্ষতা এবং ৪. জাতীয়তাবাদ। যা আমাদের সংবিধানেরও মূল নীতি। আর বঙ্গবন্ধুর চার মূলনীতিকে তিন মূলনীতি হিসেবে প্রচার জনগণকে বিভ্রান্ত করবে। বঙ্গবন্ধুকে খ-িতভাবে উপস্থাপনের কোনও সুযোগ নেই।
বঙ্গবন্ধু একাধারে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের কথা বলেছিলেন এমনি এমনি নয়। এর পেছনে অন্তর্নিহিত কারণ ছিল। গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের সম্মিলন হল সামাজিক গণতন্ত্র, যা মেহনতি মানুষের জন্য গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করে। গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের সম্মিলন ছাড়া শোষিত মানুষের জন্য গণতন্ত্র নিশ্চিত করা অসম্ভব। বঙ্গবন্ধু তার সারা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে সেটা অনুধাবন করেছিলেন।
চীন সফরের সময় বঙ্গবন্ধু সমাজতন্ত্রের ব্যাপারে যথে’ আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু তিনি সেখানকার দমন-পীড়ণ পছন্দ করেননি। চীন যেভাবে বাক-স্বাধীনতা রহিত করেছে সেদিকে তার নজর ছিল। তবে তিনি এটাও অনুধাবন করেছিলেন সমাজতন্ত্র ছাড়া সুষম বণ্টন অসম্ভব। বিশ্বের পুঁজিবাদী দেশগুলো তার প্রমাণ। সবথেকে বড় উদাহরণ যুক্তরা”্র। দেশটা বিশ্বের সবথেকে শক্তিশালী এবং ধনশালী। কিন্তু সে দেশে যেমন অত্যন্ত ধনশালী ব্যক্তি আছে, তেমন আধা-পেট খাওয়া রাস্তায় ঘুমায় এমন মানুষও আছে প্রচুর। কিন্তু যুক্তরা”্ররে প্রতিবেশী দেশ কানাডার চিত্র পুরো ভিন্ন। সেখানে সামাজিক গণতন্ত্র বিদ্যমান। সেখানে প্রত্যেকটা মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদা অন্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা বিধান করেছে সরকার। ইউরোপের অনেক দেশেও সামাজিক গণতন্ত্র বিদ্যমান। এসব দেশের শীর্ষস্থানে আছে সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, ইংল্যান্ডসহ অন্যান্য দেশগুলো।
বঙ্গবন্ধু সুইজারল্যান্ডের ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। ইংল্যান্ডে অস্ত্রোপচারের পর কয়েকদিন সুইজারল্যান্ডে অবস্থানকালে তিনি ঘোষণা করেন, ‘বেঁচে থাকলে বাংলাদেশকে আমি তৃতীয় বিশ্বের সুইজারল্যান্ড বানিয়ে ছাড়বো।’ তার এই ঘোষণায় সুইসরা খুব খুশি হয়েছিল।
সম্প্রতি বঙ্গবন্ধুর নাতি সজীব ওয়াজেদ জয় ইয়াং বাংলা আয়োজিত ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ডের’ চতুর্থ আসরের বিজয়ীদের নাম ঘোষণার পর বক্তব্যের বলেন,
যে কয়েকটি মূলনীতি নিয়ে বাংলাদেশ গঠন হয়েছিল- গণতন্ত্র, যে দেশ চলবে মানুষের অধিকারের উপর, মানুষের ভোটের উপর। দেশের মানুষ নিশ্চিৎ করবে- বাংলাদেশের নেতৃত্বে কে, বাংলাদেশ কোন দিকে যাবে। সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার, মানুষের সেবা করতে হবে। শুধু এক শ্রেণিকে ভালো রাখলে হবে না। দেশের ১৬ কোটি মানুষ যাতে ভালো থাকে, সেটা নিশ্চিৎ করতে হবে। এটা ছিল বঙ্গবন্ধুর একটি মূলনীতি। আর ধর্মনিরপেক্ষতা, যে আমরা সবাই বাঙালি। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলমান, নাস্তিক আমরা সবাই বাঙালি, আমরা সবাই সমান। এ তিনটি মূলনীতি নিয়েই কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন করা হয়েছিল। এ তিনটি ছিল বঙ্গবন্ধুর মূলনীতি।
বঙ্গবন্ধুর প্রশ্নে আমরা কাউকে কোন ছাড় দিতে পারিনা। ৯ নভেম্বর, ২০২০ শিশির ভট্টাচার্য্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে তার ‘শতবর্ষে বঙ্গবন্ধু: ওষ্ঠসেবা নয়, প্রয়োজন নিবিড় জীবনপাঠ ও সচেতন অনুসরণ’ নিবন্ধে লিখেছেন, ‘কোনো বাঙালি কখনও বঙ্গবন্ধুর মতো হতে পারবে-এমনটা আমারও মনে হয় না। কেউ কারও মতো হয় না-এটা ঠিক, তবু বাঙালির ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে, গোপন, নোংরা খানাখন্দের ভেতর থেকে, একেকজন খন্দকার মোশতাক, তাহের উদ্দীন ঠাকুরের চোরা চাউনি চোখে পড়ে বৈকি। ফারুক, ডালিম গং ইদানীং ঘাপটি মেরে আছেন বটে, কিন্তু তারা আছেন, সুযোগ পাওয়া মাত্র কিলবিল করে বিষধর সাপেরা বেরিয়ে আসবে। তাজউদ্দিনরা বিরল, কিন্তু দুর্লভ নন। নাম নাই বা নিলাম, আজ এ দলে, কাল ও দলে, পরশু কোন্দলে যোগ দেন-এমন শত শত বামপন্থী নেতা গিজগিজ করছে বাংলাদেশে। কিন্তু শেখ মুজিব- সেই একজনই ছিলেন, আছেন, থাকবেন। বর্তমানের কোনো নেতা তার ধারে কাছেও নেই এবং ভবিষ্যতেও কেউ থাকবেন- এমন আলামত আপাতত দেখা যাচ্ছে না। বঙ্গবন্ধু এতটাই মহান এবং এতটাই অনন্য যে তার রক্তের উত্তরাধিকারীরাও পুরোপুরি তাকে ধারণ করতে পারে না।’
বঙ্গবন্ধুকে পুরোপুরি ধারণ করা শুধু কঠিন নয়, অসম্ভবও। আমিও শিশির ভট্টাচার্য্যের সাথে একমত, ‘বঙ্গবন্ধু এতটাই মহান এবং এতটাই অনন্য যে তার রক্তের উত্তরাধিকারীরাও পুরোপুরি তাকে ধারণ করতে পারে না।’ এই কথাতে বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকারীরা নিঃসন্দেহে গর্বিত হবেন। আমার ধারণা বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয় বঙ্গবন্ধুর মূলনীতিগুলো সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে ভুল করেছেন। সেটি তাৎক্ষণিকভাবে হতেই পারে। তবে বঙ্গবন্ধুর চার মূলনীতি থেকে একটি বাদ গেলে জাতির এ মহান নেতাকে খ-িতভাবে উপস্থাপন করা হয়। আশা করি জয় তার ত্রুটি সংশোধন করে নেবেন। অন্যথায় নিন্দুকেরা অপপ্রচার করতে পারে পুঁজিবাদীদের চাপে তিনি একটি মূলনীতি সমাজতন্ত্রকে এড়িয়ে গেছেন।
লেখক : তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, অল ইউরোপিয়ান বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন এবং জার্মান বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন।

Please follow and like us: