প্রতিবেশীর দৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধু

Last Updated on

নেছার আহমদ : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধ বা বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা বলতে গেলেই ইতিহাসের পাতায় জ্বল জ্বল করে ভেসে আসে ৩২ নম্বর বাড়িটির কথা। ৩২ নম্বরের বাড়িটি বাংলার স্বাধীনতার ইতিহাসের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে মিশে আছে। ৩২ নম্বরের ৬৭৭ নম্বরের বাড়িটির মালিক বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাভাবিকভাবে বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন, ৬ দফা আন্দোলন, ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থান সহ সকল আন্দোলন ও সংগ্রামী কর্মকা-ের সাক্ষী ৩২ নম্বরের এ বাড়িটি। শুধু স্বাধীনতা সংগ্রাম নয় পরবর্তীতে জাতির অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা প্রবাহ এবং রাজনৈতিক পালাবদল সহ অনেক কর্মকা-ের স্বাক্ষী এ বাড়িটি। ১৫ আগষ্ট ১৯৭৫ এর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ এ বাড়িতেই সংঘঠিত হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবে ৩২ নম্বরের ৬৭৭ নম্বরের এবাড়িটি ঘিরেই উৎস্যুক মানুষের জানার আগ্রহ কম নয়। ইতিহাসের নীরব সাক্ষী ৩২ নম্বরে ৬৭৭ নম্বর বাড়িটি আজ বঙ্গবন্ধু স্মৃতি যাদুঘর হিসেবে বিদ্যমান। আমি প্রজন্মকে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি যাদুঘর দেখে নিজেদের শিকড় খুঁজে নেয়ার অনুরোধ করছি। এ বাড়িটি বাঙালি জাতির ইতিহাসের শেকড়ে।
বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামে ২৫ মার্চ ১৯৭১ রাতে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার, অপারেশন চার্চ লাইট নাম দিয়ে গণহত্যা শুরু এবং অন্যটি জাতির ইতিহাসে শোকাবহ ১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্ট এ দিন জাতির পথভ্রষ্ট কিছু সেনা কর্মকর্তা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং শিশুপুত্র রাসেল সহ পরিবারের সকলকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এটি বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক রাত। ইতিহাসের নীরব স্বাক্ষী ৩২ নম্বরের এ বাড়িটি ঘিরে ২৫ মার্চ ৭১ এর ১৫ আগষ্ট ৭৫ এ দু’টি দিন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সাথে পাশের ৬৭৬ নম্বর “সারায়ে খাম” বাড়িটির সাথে এক আত্মিক বন্ধন ছিল। ইতিহাসের প্রয়োজনে ২৫ মার্চ ১৯৭১ এবং ১৫ আগষ্ট ১৯৭৫ এ দু’টি দিনের স্মৃতিকথা এবং সেদিনের ঐতিহাসিক ঘটনা পাশের বাড়ির অধিবাসিদের বক্তব্য ইতিহাসের এক অনন্য দলীল হিসেবে বিবেচিত। বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষে উৎসুক্যের কারণে পাশের বাড়িটি যেহেতু বঙ্গবন্ধু পরিবারের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা এবং পারিবারিক আত্মিক বন্ধনে ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কযুক্ত সে বিষয়টিকে নিয়ে প্রতিবেশীর দৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধু এখানে তুলে ধরছি।
ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বঙ্গবন্ধুর পাশের ৬৭৬ নম্বর বাড়িটির মালিক ডা. আবদুস সামাদ খান চৌধুরী। নাটোরের বিখ্যাত জমিদার দোস্ত মোহাম্মদ খান ১৭৯৭ সাল হতে চৌধুরী উপাধিপ্রাপ্ত হন।
ইশ্বরদির মূলতানী এবং জাসোয়ারী এলাকায় বিশাল ভূ-সম্পত্তির মালিক ছিলেন তাঁরা, নাটোরের বিখ্যাত জমিদার দোস্ত মোহাম্মদ খান চৌধুরীর ৮ম পুরুষ ডা. আবদুস সামাদ খান চৌধুরী। তিনি ঢাকা হতে নারায়নগঞ্জে আসা যাওয়া করে ডাক্তারি প্র্যাকটিস করতেন। জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলাম তাঁর বইতে ডা. আবদুস সামাদ খান চৌধুরীর বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। সামাদ খান চৌধুরীর সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সাথে গভীর সম্পর্ক ছিল। যা রক্তের সম্পর্কের চাইতে কোন অংশে কম নয়। এ দুই পরিবারে একে অপরের সুখে দুঃখে সব সময় পাশে থেকেছেন। বঙ্গবন্ধু অনেক রাজনৈতিক জটিল সমস্যার বিষয়ে ডা. সামাদ খানের সাথে পরামর্শ করতেন। যদিও সামাদ খান কোন রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তিনি আহমদীয়া মুসিলম জামাতের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁকে খুবই শ্রদ্ধা করতেন। তিনি ডাক্তার সাহেবের কাজ হতে চিকিৎসাও নিতেন। ডাক্তার সাহেবের ডাক্তারি জ্ঞান এবং চিকিৎসার বিষয়ে তাঁর পা-িত্য তা বঙ্গবন্ধু অকপঠে স্বীকার করতেন। ১৯৭২ এর দিকে বঙ্গবন্ধু যখন রাষ্ট্রপতি তখনকার একটি ঘটনা প্রফেসর নুরুল ইসলাম সাহেব বঙ্গবন্ধুর বরাত দিয়ে তাঁর স্মৃতি কথা বইতে উল্লেখ করেছেন। ডা. সামাদ খান সাহেবের চার ছেলে। তাঁর মধ্যে আবদুল আওয়াল খান চৌধুরী (ইমরান) ছিলেন বঙ্গবন্ধুর কণিষ্ঠ সন্তান শেখ রাসেলের খেলার সাথী। আওয়াল খান চৌধুরী ইমরান আবেগ ঘন অশ্রুসজল চোখে বঙ্গবন্ধুর ছোট ছেলে রাসেলের স্মৃতিচারণ করেছেন। শেখ রাসেলের বিষয়ে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “বঙ্গবন্ধুর ছোট ছেলে রাসেল আমার ছোট বেলার খেলার সাথী ছিল। আমাদের বাড়ির লনে জংলি ঘাসে ভরা ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর বাড়ির লনে ছিল দুর্বা ঘাস। সাধারণত দুর্বা ঘাসে আমরা রাসেল সহ ফুটবল খেলতাম নিয়মিত। আমাদের সাথে সে সময়ে তখন আরো খেলতে আসতেন (১) রেলওয়ের চেয়ারম্যান মকবুল আহমদের ছেলে বুলবুল, (২) টিসিবির পরিচালক আইনুল হকের ছেলে শুভ্র, সোহেল ও সুমন। এখানে উল্লেখ্য যে হাসু আপা (শেখ হাসিনা) ১৯৭১ এ আইনুল হক সাহেবের বাসার দোতলায় ভাড়া থাকতেন।
(৩) গ্রীণ ভিউ পেট্রোল পাম্পের মালিক আহমদ ফজলুর রহমানের ছেলে রেজা, (৪) ৭৫ এর দিকে আমাদের সাথে যোগ দেয় মূহিতের অফিসের কিশোর, (৫) বঙ্গবন্ধুর বাড়ি হতে শেখ রাসেল। এছাড়া স্থায়ীভাবে গোল কিপারের দায়িত্বে থাকতো বঙ্গবন্ধুর বাড়ির আব্দুল এবং রমা। যারা ১৯৭৫ এর১৫ আগস্টের ঘটনা প্রবাহের রাজসাক্ষী হয়েছিলেন। (৬) আমাদের বাড়ি হতে আমরা তিন ভাই আদিল, ইমরান, সালমান।
বঙ্গবন্ধু এতো বিশাল হৃদয়ের মানুষ ছিলেন আমাদের দূরন্তপনা, দুষ্টমি, লাফালাফিকে ¯েœহের দৃষ্টিতে দেখেছেন। কোন দিন ধমক দিয়ে কথা বলেননি। একদিনের কথা আমার বিশেষভাবে মনে পড়ে। সেটি হলো ১৯৭৩ এর দিকে বঙ্গবন্ধুর জন্য একটি মার্সিডিজ কার ৩০০ এস.সি.এল মডেলের হাইড্রলিক সাসপেন্সর যুক্ত গাড়ি। এ গাড়িটি ষ্ট্যার্ট দেয়ার পর কিছু উপরে উঠে যেতো। একদিন আমাদের খেলার বলটি গাড়ির নিচে আটকে যায়। আমি উপোর হয়ে অনেক চেষ্টা করে বলটি আনতে পারছিলাম না। পরে ড্রাইভার এসে গাড়ি ষ্ট্যার্ট দিয়ে বলটি বের করতে সাহায্য করে। হঠাৎ পিছনে ঘাড়ের উপর ¯েœহের হাতের স্পর্শ পেলাম। পিছন ফিরে দেখি বঙ্গবন্ধু দাঁড়িয়ে, তিনি বললেন, “কিরে দুষ্ট ছেলেরা কেমন আছিস? তোর বাবা আসেনা কেন? আমার সাথে দেখা করতে বলিস।” সে যে ¯েœহ জড়ানো ভালোবাসা আমি সব সময় পেয়েছি। বঙ্গবন্ধু বাড়িতে যতক্ষণ থাকতেন লুঙ্গী-গেঞ্জী হাতে পাইপ ছাড়া অন্য কোন কাপড়ে আমি দেখিনি।
বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গরিব বা ধনী কোন আত্মীয় স্বজনকে অবহেলা করতে দেখিনি। তাঁদের জন্য বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দরজা ছিল সব সময় খোলা। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সোফাসেটে সস্তাদামের মার্কিন কাপড়ের কভার লাগানো থাকতো। যা নিয়মিত ধুতে হতো। আমি খালাম্মা, হাসু আপা কাউকে কখনো টাওয়াল ব্যবহার করতে দেখিনি। বাঙালির ঐতিহ্য সেই গামছা নিয়মিত ব্যবহার হতো এ ঘরে। এখনো আমার জানামতে হাসু আপা গামছা ব্যবহার করেন।
বঙ্গবন্ধু প্রকৃত পক্ষেই আচার আচরনে, চলনে বলনে খাটি বাঙালি হিসেবে বেঁচে ছিলেন যা এখনো আমি হাসু আপার মাঝে দেখতে পাই। বঙ্গবন্ধুর ঘরে কোন দিন এয়ার কন্ডিশন ছিলোনা। অথচ আমাদের দোতলার ভাড়াটিয়া তৎকালিন কেমিক্যাল কর্পোরেশনের কর্মকর্তা মোশারফ হোসেন এবং জিন্নাত মোশারফের ঘরে প্রতিটি রুমে এয়ার কন্ডিশন ছিল।
বঙ্গবন্ধুর বাড়ির পিছনের কোণে দু’টি লাকড়ির চুলা ছিল। ব্ঙ্গবন্ধু পরিবার এ লাকড়ির চুলায় রান্না করা খাদ্য খেতেন। কোন বিলাসিতা বঙ্গবন্ধু বাড়িতে ছিল না। বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে নয়টি গাভী গরু ছিল, যেগুলো দেখাশুনা করতো আজিজ মিয়া। বঙ্গবন্ধু নিয়মিত নিজ গরুর দুধ খেতেন।
একদিন রেহেনা আপা বঙ্গবন্ধুকে বললেন, “আব্বু তোমার অফিসটা খুব ভালো। ওখানে ঠা-া লাগে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আম্মু এটি আমাদের নয় সরকারী।
এখনো হাসু আপা (শেখ হাসিনা) গণভবনে ফ্যান চালিয়েই জানালা খুলে ঘুুমান। তিনি এয়ার কন্ডিশনে ঘুমাতে পারেননা। বাবার মতোই এবং হাজারো গ্রাম বাংলার মেয়ের মতো নিজ হাতে রান্না করে অন্যকে খাওয়াতে ভালোবাসেন। আমি হাসু আপার মাঝে বঙ্গবন্ধুকে খুজে পাই। বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি যেন আজকের শেখ হাসিনা।
আরেক দিনের কথা “তখন দুপুর ২.৩০ টার মতো বঙ্গবন্ধু শোবার ঘরে রাসেল শুয়ে আছে। আমি চুপি চুপি দোতলায় উঠে ঈশারায় রাসেলকে ডাকছি। কারণ রাসেলের জন্য বঙ্গবন্ধু ফ্রান্স হতে একটি খেলনার ট্রেন এনেছিল। যা জোড়া লাগিয়ে চালানো যেতো এবং ইঞ্জিনের উপরে ধূয়া উঠতো। সেটির প্রতি আমার খুব আগ্রহ। সেটি রাখা থাকতো রেকের নীচে। যেখানে বঙ্গবন্ধুর লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনীর পা-ুলিপিটি পাওয়া গিয়েছিল সে রেকের নীচে ট্রেনের খেলনাটি ছিল। এটি রাসেল জোড়া লাগিয়ে বাইরে নিয়ে আসতো। প্রতিদিন রাসেল ছিল আমাদের খেলার সাথি। আমার চোখের উপরে একটি কাটা দাগ রয়েছে যা রাসেলের সাথে খেলতে গিয়ে কেটে গিয়েছিল।
আমি আরেকটি কথা বলতে চাই বঙ্গবন্ধু কিভাবে দেশকে এবং দেশের মানুষকে গভীরভাবে ভালোবেসেছেন তা বঙ্গবন্ধুর তিন ছেলের নামের মাঝেই বুঝা যায়। যেমন বড় ছেলে শেখ কামালের নাম ছিল বিপ্লবী কামাল পাশার নামে যিনি মৌলবাদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করেছিলেন। আরেক ছেলের নাম শেখ জামাল যিনি আধুনিক গণতন্ত্রের প্রতিক জামাল আবু নাসের। ছোট ছেলে শেখ রাসেল। ইংল্যান্ডের আধুনিক লেখক হিসেবে স্বীকৃত ব্র্যাট্রান্ড রাসেল এর নামে নামকরণ। আদিকাল হতেই তাঁর মনের মাঝে দেশকে মুক্ত করার এবং রাজনীতিতে যাদেরকে আদর্শ হিসেবে মাথায় রেখে পথ দেখেছেন তাঁদের নামকে আদর্শ হিসেবে নিয়ে ছেলেদের নাম রেখেছেন। বাঙালি জাতির উদ্ধারকর্তা বাংলাদেশকে বিশ্বের সামনে উপস্থাপনকারী আধুনিক গণতন্ত্রের মানসপুত্র ছিলেন ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’। যিনি এদেশ হতে মোল্লাতন্ত্র এবং মৌলবাদকে শিকড় সহ উপড়ে ফেলার প্রেরণা নিয়ে কাজ করেছিলেন। আজ যখন দেশে মোল্লা এবং মৌলবাদিদের আস্ফালন দেখি তখনি বঙ্গবন্ধুর কথা মনে পড়ে। কামনা করি এদেশে যেন কোন দিন মোল্লাদের আধিপত্য বিস্তার না করে। যদি এদেশে তাদের আধিপত্য বেড়ে যায় তবে এদেশ হবে পাকিস্তান। যা বঙ্গবন্ধু কোন দিনই চাননি। একথা নির্ধিদ্ধায় বলা যায়। (আব্দুল আউয়াল ইমরানের স্মৃতি কথা)।
২৫ মার্চ ১৯৭১ রাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী বাঙালি জাতিকে দমনের জন্য নারকীয় হত্যাকান্ড শুরু করে এবং সেদিন রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়।
ইতিহাসের অনন্য এক কালো দিন ২৫ মার্চ। এদিন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী সকল নিয়ম কানুন ভঙ্গ করে অতকির্তে নীরিহ নিরস্ত্র ঘুমন্ত বাঙালিদের উপর আক্রমন করে। হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে। রাজারবাগ, পিলখানা, বিশ্ববিদ্যালয় সকল স্থানে নির্মম হত্যাকান্ড চালানো হয়। রাতে পাক সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি হন শেখ মুজিবুর রহমান। যে কমান্ডো দলটি শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করতে এসেছিল তার দায়িত্বে ছিলেন লেঃ কর্ণেল জেড এ খান। ২৩ মার্চ সন্ধ্যায় মার্শাল ‘ল’ হেড কোয়ার্টার হতে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতারের নির্দেষ পান তিনি। ২৪ মার্চ বেলা এগারোটায় মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের জন্য আনুষ্ঠানিক নির্দেশ দেন। সে আলোকে ২৫ মার্চ ৭১ গভীর রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় এবং বেগম মুজিব সহ অন্যদের ১৮ নম্বর রোডের বাড়িতে সেনা পাহাড়ায় গৃহবন্দি করে রাখা হয়।
২৫ মার্চ ৭১ এর বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের সময়ের কিছু খন্ড চিত্র বর্ণনা করেছেন প্রতিবেশী ডা. সামাদ খান চৌধুরীর বড় ছেলে আব্দুল আহাদ খান চৌধুরী বাবু যিনি বর্তমানে আমেরিকার ক্যালোফেনিয়াতে বসবাস করেন।
“অ্যাপ্রক্সিমেটলি রাত দুটো হবে। কেননা রাত দেড়টার সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে গেছে। দেখলাম কাজের লোকেরা দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকজন আত্মীয়স্বজনও আছেন। বঙ্গবন্ধুর সেক্রেটারী মহিউদ্দিন সহ অন্যরা দাঁড়িয়ে আছে। আমি বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গিয়ে সালাম দিয়ে বললাম, খালাম্মা, আমি এসেছি। আব্বা বলেছেন, যে কোনো বিপদে আমরা যদি কাজে লাগতে পারি। প্লিজ আমাদের জানাবেন। আব্বা এ-ও বলেছেন, বাসায় আপনারা সেইফ না। আমাদের বাসায় যদি আসতে চান, আসেন। খালাম্মা (বেগম মুজিব) বললেন, ‘বাবা, দেখতেই পাচ্ছ, সাহেবকে নিয়ে গেছে। সাহেব বলতে উনি ইনডিকেট করেছেন উনার স্বামীকে, শেখ সাহেবকে।’ আমাদের মনটা ভালো না।’ আমি জানাব। বাড়িতে দেখলাম ঘরের কিছু ফার্নিচার ভেঙ্গেছে। এছাড়া শেখ সাহেবের ছবি, আর কয়েকজন মণীষীর ছবি ছিল, ওগুলো ভেঙ্গেছে। কোনো মানুষকে আহত হতে দেখিনি। কোনো রক্তের চিহ্ন-বা এ ধরনের কিছু ছিলো না।
খালাম্মা অর্থাৎ বেগম মুজিব বললেন, ‘উনাকে তো নিয়ে গেছে। এখনও তো ঠিক আছি। তোমার বাবাকে ধন্যবাদ দিও। দরকার হলে তোমাকে জানাব। এ মুহুর্তে যাওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।’
বললাম, ঠিক আছে। এই বলে আমি চলে এলাম। তারপর ঘুমিয়ে পড়লাম। রাত তিনটার মতো হবে। আম্মা আমাকে ঘুম থেকে উঠালেন। আমার কামরাটা শেখ সাহেবের বাসার দিকে। একদম কাছে। আম্মা বললেন, পাশের বাসা থেকে কাজের মহিলা এসেছে। আমরা বলতাম বুয়া। বুয়া এসে আমাদের দরজায় নক করেছে। আম্মা উঠে গেছেন। বুয়া বলেছে, “খালাম্মা আপনি একটু যান, আম্মা আসতেছে।” বেগম মুজিবকে বুয়া হয়তো আম্মা বলত।
কারফিউ চলছে। পাশের বাড়ি থেকে কেউ যদি আমাদের বাসায় আসে, তাহলে সামনের রাস্তা দিয়ে আসতে হবে। কাউকে না জানিয়ে আসতে চাইলে আসতে হবে সীমানার দেয়াল ডিঙিয়ে। আমরা দেয়ালের এপারে মোড়া-চেয়ার এসব রাখলাম। দেয়ালের ওপাশে দিলাম চেয়ার। মোড়াগুলো এসেছে ওপাশের বাড়ি থেকে, চেয়ার গেছে এ বাড়ি থেকে। দেয়ালের দুপাশেই যখন এসব রাখা হলো, তখন দেয়াল পার হয়ে বললাম, খালাম্মা, আসেন তো। আমরা একটা ব্যবস্থা করেছি। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সকলে চেয়ারের ওপর মোড়ায় উঠে দেয়াল টপকে এপাশে চলে এলেন।
সম্ভবত রাত সাড়ে তিনটার মতো হবে। খালাম্মা আসলেন। রাসেল আসল। কামাল ও জামাল ভাই এসেছিলেন কি না মনে করতে পারছি না। মহিউদ্দিন সাহেব, যিনি শেখ সাহেবের সিকিউরিটির দায়িত্বে ছিলেন, তিনি যে এসেছিলেন এটা স্পষ্ট মনে আছে আমার। মোট এগারোজন কি বারোজন আসলেন।
পড়ে জেনেছি কামাল ভাই ও জামাল ভাই এসেছেন।
যতদূর জানি কামাল ভাই আগেই এসকেপ করে চলে গিয়েছিলেন। হতে পারে। কাজের মহিলারা বলাবলি করছিল, কামাল ভাই জামাল ভাইয়ের জন্য ব্যবস্থা হচ্ছে। আমি ওদের সঙ্গে বাসার ভেতরে চলে আসলাম। আম্মাকে সাহায্য করার জন্য বাসার ভেতরে দৌড়াদৌড়ি শুরু করলাম। বিছানা গোছাতে লেগে গেলাম। চাদর-টাদর দিলাম, বালিশ দিলাম। পুরুষরা একটি কামড়ায় শুলেন, লাইন করে শুয়ে পড়লেন। কেউ কেউ বসলেন সোফায়। মহিউদ্দিন সাহেব ছিলেন এখানে। উনি ঘুমাতে পারছেন না। গায়ে খুব ব্যথা। জানতে পারলাম, যারা এসেছিল, তারা উনাকে খুব মেরেছে। কারণ মহিউদ্দিন সাহেব উনাদের বাধা দিচ্ছিলেন-তোমরা আমাদের স্যারকে নিতে পারবা না। এতে ওরা ধাক্কা-ধুক্কা দিয়েছে। তার গায়ে রক্তের চিহ্ন দেখি নাই। তবে ব্যথা পেয়েছেন। আমরা একটা সোফায় বসা। উনার গায়ে যেন পা না লাগে, আমরা সেভাবে সাবধানে বসেছিলাম। এভাবেই রাত কাটিয়ে দিলাম।
খালাম্মাকে অর্থাৎ বেগম মুজিবকে আম্মা তাঁর বিছানায় জায়গা দিলেন। আম্মা পাশে জায়নামাজ বিছিয়ে দোয়ায় মগ্ন হলেন। অনেক অনেক দোয়া করলেন, যেন আমাদের বাসায় হামলা না হয়। ভোরবেলায় শব্দ শুনলাম, পাকিস্তানী সৈন্যরা আবার এসেছে। ওরা ওই বাসা অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর বাসার দরজায় ঠাস-ঠাস করে নক করল, চেয়ার-টেয়ার ফেলল। দেয়ালের দু’পাশে তখনও মোড়া ছিল। এপাশে না তাকালেও ওপাশে যারা ঢুকেছে, তারা দেখতে পেয়েছে দেয়ালের পাশে চেয়ার আর মোড়া। তারা বুঝতে পেরেছে, ওই বাসায় কোনো মানুষজন নেই। তারা কোথায় যেতে পারে। নিশ্চয়ই কাছাকাছি কোথাও গেছে। দেয়ালের পাশে চেয়ার-মোড়া দেখে তারা কি বুঝছে জানি না। কিন্তু তারা এপাশে ঢুঁ মারেনি, নকও করেনি। তারপর চলে গেছে।
এভাবে পেরিয়ে গেল আরও কয়েকটি ঘন্টা। খালাম্মা এবং ও বাসা হতে যারা এসেছে তাঁরা ঘুম থেকে উঠলেন। আম্মা নাস্তা তৈরী করলেন। ঠিক ওই সময় সাদা রঙের একটা গাড়ি এল। তারা খবর পেয়েছে যে বেগম মুজিব এখানে আছেন। খালাম্মা ওই গাড়িতে উঠলেন। সঙ্গে আরও কেউ কেউ উঠলেন। তারপর গাড়িটা চলে গেল।
আমি গেটের বাইরে তাকালাম। ওদিকে গার্লস হাইস্কুল ছিল। ওখানে সৈন্যরা চোখে দুরবিন লাগিয়ে এদিকে তাকিয়ে আছে। গাড়িতে কে কে যাচ্ছে তা দেখছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি। ওরা কেউ কিছু বলছে না। কাছেও আসছে না। খালাম্মাকে নিয়ে গাড়ি চলে গেল। আমি বাসার ভেতরে চলে আসলাম।
আগের রাতে পাকিস্তানী সৈন্যরা কিছু গোলাগুলি করেছিল। আমাদের কারও গায়ে গুলি লাগেনি। তবে আমাদের বাড়ির দেয়ালে গুলির কিছু চিহ্ন দেখেছি। পাশের বাড়ির কারও গায়ে গুলি লাগেনি বলে শুনেছি।এই হলো ২৫ মার্চ রাতের ঘটনা। খালাম্মা তো বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে চলে গেলেন।
২৬ মার্চ বিকেল পাঁচটার দিকে একজন মেজর এলেন। সঙ্গে অনেক সেপাই। দরজায় নক করলেন। আমি দরজা খুললাম। কথা বললাম। মেজর আমাকে বললেন, “চলেন, আপনার উঠোনটা দেখি”। উনি বাড়ির ভেতরের আঙিনাটা দেখলেন। আমি পাশেই ছিলাম। ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে উনি জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা বলুন তো, আপনি উনাদের আশ্রয় দিলেন কেন?” কোনো ভূমিকা নাই। কথা বললেন মৃদু কন্ঠে। আমি বললাম, “দেখেন, আমাদের ধর্ম এ শিক্ষাটি দেয় যে, তোমরা প্রতিবেশীর যদি কোনো বিপদ হয়, তুমি তাকে সাহায্য কর। আমি ধর্মের কাজ করেছি।”
মেজর হাসলেন। বললেন, ‘ঠিক আছে’। তিনি আর কোনোরকম জ্বালাতন করেননি আমাদের। পরে জানলাম খালাম্মাকে ধানমন্ডির একটা বাড়িতে রাখা হয়েছে। সেটি হলো ১৮ নম্বর রোডের একটা বাসা। যুদ্ধকালীন সময়ে আমরা খালাম্মাদের সাথে কোন যোগাযোগ করতে পারিনি।
১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। আমরা পেলাম একটি স্বাধীন বাংলাদেশ। ৯৩ হাজার পাকিস্তানী সেনা আত্মসমর্পন করলো। দেশ হানাদার মুক্ত হলো। ৩০ লক্ষ শহীদ এবং ২ লক্ষ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হলো। বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারী ১৯৭২ দেশে ফিরে আসলেন। সে সময়ের কিছু কথা এখানে তুলে ধরছি।
১০ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরেলন। রাতে আব্বা বললেন, ‘চলো, আমরা শেখ সাহেবকে দেখতে যাই।’ আমরা ওই বাসায় গেলাম। বসলাম বৈঠকখানায়, মহিউদ্দিন সাহেব ছিলেন। আরও অনেকে ছিলেন। অনেক মানুষ, আসছে আর যাচ্ছে। শেখ সাহেব ঘরে ঢুকলেন। আমরা উঠে দাঁড়ালাম। শেখ সাহেব আব্বার সাথে হাত মেলালেন। সালাম বিনিময় হলো। শেখ সাহেব বললেন, ‘ডাক্তার সাহেব, আপনি এসেছেন, বড় খুশি হলাম। আপনার ফ্যামিলি আর-আমার দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, আপনার ছেলের কীর্তিকলাপ সব শুনেছি। আপনাদের এই সাহায্যের কথা আমরা কখনো ভুলবোনা। চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকব।’
আব্বা বললেন, ‘এই ছিল আমাদের কর্তব্য। আর কিছু না।’
শেখ সাহেবের এক পাশে ছিলেন মহিউদ্দিন সাহেব। কামরায় এক পাশে উনারা, আমরা অন্য সাইডে। শেখ সাহেব বললেন, ‘মহিউদ্দিন, ইনাদের বাসার দিকে দেয়ালে একটা গেট বানাও, আর পাশের অন্য ব্যক্তির দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘ওই পাশের গেট বন্ধ করে দাও।”
শেখ সাহেবের মনটা অনেক বড়। বড় বলেই ওই গেটটা বন্ধ হয়নি। যেখানে ছিল সেখানেই রয়ে গেছে। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যে আমাদের বাড়ির সীমানা দেয়ালে একটা গেট তৈরি হলো। এখনও আছে গেটটা। এই গেট দিয়ে বঙ্গবন্ধু আমাদের বাসায় বহুবার আসা-যাওয়া করেছেন।
আব্বা রোববার ঢাকায় থাকতেন। নারায়ণগঞ্জে প্র্যাকটিস করতে যেতেন না। বাসায় রিল্যাক্স করতেন। শেখ সাহেব দু’তিন সপ্তাহ পর পর রোববারে আমাদের বাসায় আসতেন। সকালে আসতেন, বসতেন বারান্দায়। আব্বার সঙ্গে অমলেট-চা খেতেন। খাওয়ার চেয়ে আব্বার সাথে কথাবার্তাই বলতেন বেশি।
আব্বা রাজনীতির লোক না। উনি পুরোপুরি ইমপার্শিয়াল মানুষ ছিলেন। শেখ সাহেব দেশের রাজনৈতিক হাল-চাল সম্পর্কে আব্বার কথা বুঝতে চাইতেন। জিজ্ঞেস করতেন। আব্বা বুঝেসুঝেই জবাব দিতেন। শেখ সাহেব নিয়মিতই আসতেন। আমাদের সঙ্গে খুব হৃদ্যতা ছিল। অনেক অনেক আলাপ হতো। সম্পর্কটা অনেক মধুর ছিল। এটা আগে থেকেই ছিল। যখন আমরা ধানমন্ডিতে এ জায়গাটা নিলাম, তখন থেকেই সুন্দর প্রতিবেশী হিসেবে সম্পর্ক যেভাবে রাখা উচিত সেটা রেখেছেন। আমরাও সুন্দর সম্পর্ক রেখেছিলাম।
বঙ্গবন্ধু যখনই আমাদের বাসায় আসতেন, সরাসরি রান্নাঘরে ঢুকতেন। আম্মা দু-এক কাপ চা না বানিয়ে ১০-১২ কাপ চা বানিয়ে ফ্লাস্কে ভরে রাখতেন। কারণ পাঁচ মিনিটের কথা বললে হয়তো মিটিং চলত দু’ঘন্টা। এর মধ্যে চার-পাঁচবার চা খাওয়া হতো।
বঙ্গবন্ধুর বাসা থেকেও মাঝে মাঝে খাবার আসত। মাছ আসত, রান্না করা অনেক কিছু। ভালো রান্না হলে আমাদের বাসায় চলে আসত। আমাদের বাসা হতেও যেতো। এটা ছিল গিভ অ্যান্ড টেক। আসলে ওই বাসায় প্রচুর উপহার আসত। এত তো খাওয়া যায় না। ডিস্ট্রিবিউশন হতো। কিছু আসত আমাদের বাসায়। ফল-টল অনেক পেয়েছি।
আব্বার কোনো স্বার্থ ছিল না। উনি নিরপেক্ষভাবে কথা বলতেন। যুক্তি দিয়ে বলতেন। শুনেছি, বঙ্গবন্ধু আব্বার অনেক পরামর্শ গ্রহণ করেছেন, বাস্তবায়নও করেছেন। আব্বা ও বঙ্গবন্ধু যখন একসঙ্গে বসতেন, কথা চলতেই থাকত। কথা শুরু হলে তো তার অনেক ডালপালা থাকে। প্রতিবেশী হিসেবে বলতে পারি বঙ্গবন্ধুর ন্যায় সহজ সরল এবং একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক আমরা দেখিনি। তিনি দেশের মানুষকে নিজ জীবনের চেয়ে বেশি ভালো বাসতেন। প্রতিটি সময় প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশের উন্নতির জন্য চিন্তা করেছেন।
আব্বা সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও নিলোর্ভ মানুষ ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে যখনি দেশের বাইরে গেছেন বঙ্গবন্ধু পরিবারের সকলেই আমাদের সাথে যোগাযোগ রেখেছেন।
বঙ্গবন্ধু সহজ সরল জীবন যাপনে অভ্যস্থ ছিলেন। দোতলায় বঙ্গবন্ধুর শোবার ঘরের পাশেই রিডিং রুম। তিনি সময় পেলেই লেখাপড়া করতেন। বঙ্গবন্ধু প্রচুর বই পড়তেন। বঙ্গবন্ধু যখন রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী সে সময়েও পাশাপাশি থেকেছি। কিন্তু ক্ষমতার কোন দাম্ভিকতা আমরা দেখিনি। সহজ সরলভাবেই দিনাতিপাত করেছেন। আমরা একজন ¯েœহশীল প্রতিবেশি ও অভিভাবক হিসেবেই বঙ্গবন্ধুকে পেয়েছি। (আব্দুল আহাদ খান চৌধুরী বাবু)
বাঙালির ইতিহাসের চরম কালো অধ্যায় ১৫ আগষ্ট ১৯৭৫।
“বঙ্গবন্ধু তাঁর বিভিন্ন সময়ের আলাপচারিতায় বলতেন, আমি খান সাহেবের কোরান তেলওয়াত শুনেই সকালে ঘুম হতে জেগে উঠি। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর সকালের ঘুম ভাংতো সামাদ খান সাহেব কোরান তেলওয়াতে”।
আব্বা প্রায়ই তাহাজ্জুতের নামাজ পড়তেন। এটা ফজরের আজানের আগে পড়তে হয়। অনেক সময় দেখা যায়, তাহাজ্জুতের নামাজ পড়তে পড়তে হয়তো ফজরের আজান হয়ে গেছে। তারপর ফজরের নামাজ পড়ে কোরান তেলাওয়াত করে আব্বা শুতে যেতেন।
সেদিন আব্বা যখন তাহাজ্জুতের নামাজ পড়ছেন, তখন হয়তো আজানটা হয়েছে। তখন বিউগল বেজেছে। আব্বা তখন নামাজে ছিলেন। নামাজের শেষে সালাম ফিরিয়ে উনি আম্মাকে বললেন, আব্বা আবার আম্মাকে আপনি করে বলতেন। উনি আম্মাকে বললেন, ‘ম্যাডাম, আজকে বিউগলটা কেমন করুণ লাগছে না?’
পরে শুনেছি, যে বিউগল বাজাচ্ছিল, সে ইনফরমার ছিল। এটা বাজাতে ফুসফুসে অনেক শক্তি লাগে। আম্মা কোনো মন্তব্য করার আগেই প্রচুর গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়।
বঙ্গবন্ধুর বাড়ির যে সাত-আটজন সিপাহি থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল নিয়ে সিকিউরিটির দায়িত্বে ছিল-যখন সৈন্যরা এসে গেটে নক করে তখন তারা ফাইটব্যাক করেনি। কারণ সৈন্যদের হাতে অটোমেটিক অস্ত্র ছিল। আর এদের হাতে থ্রি-নট-থ্রি। আর একটা গুলি ভরতে ভরতে ওদের হয়তো চল্লিশটা গুলি বেরিয়ে যাবে। আগে থেকে ইনস্ট্রাকশন ছিল কি না জানি না।
কামাল ভাই ওইদিন ক্লাবে ছিলেন। ওখান থেকে ভোর আনুমানিক সাড়ে চারটায় উনি ফিরে এসেছিলেন। উনি সম্ভবত একটা টয়োটা করোলা গাড়ি চালাতেন।
এটার সাথে একটা ঘটনা আছে। না বললেই নয়। আমি যতটুকু জানি, উনি হয়তো ক্লাব হয়ে এসেছেন। ভোরবেলা উনি যখন আসছেন টয়োটা চালিয়ে, বত্রিশ নম্বর রোডের ব্রিজ পার হওয়ার সময়, কর্ণারে যে রাস্তাটা আছে। তার উল্টোদিকের শেষ মাথায় আর্মির একটা জিপ। আর্মির জিপগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলোর হাইট বেশি, একটু বড়। উনি খেয়াল করলেন, জিপটা থেমে আছে। উনার তো মিলিটারি ট্রেনিং ছিল। উনি হয়তো বুঝতে পেরেছেন-একের সঙ্গে এক যোগ করলে দুই হয়্ রাত বাজে সাড়ে চারটা।এ সময় এখানে মিলিটারির একটা জিপ থাকা মানে কিছু একটা হয়েছে।
উনি গাড়ি ব্রেক করে, ব্যাক করে আবাহনী ক্লাবের দিকে যেতে চেয়েছিলেন। ওই রাস্তার মোড়ে বড় একটা ড্রেন ছিল, ও্ ড্রেনে গাড়ির একটা চাকা পড়ে যায়। গাড়ি ব্যাক করার সময় ঘটনাটা ঘটে। ফার্স্ট গিয়ার দিয়ে অনেক চেষ্টা করেছেন। উনি দেখলেন, একটা ট্রাক থেকে লাফ দিয়ে কিছু লোক নামছে। তার মানে, দে আর ইন অ্যাকশন। গাড়ির চাকা যখন উঠল না, তখন উনি প্যানিক্ড হয়ে গাড়ি থেকে নেমে দরজা বন্ধ করে দৌঁড়ে বাসায় চলে গেলেন।
কামাল ভাইয়ের ঘর হচ্ছে তিন তলায়। ছোটবেলার স্মৃতি মনে আছে আমার। আমাদের যেমন বুকশেল্ফ, উনার হলো গানশেল্ফ। উনার শেল্ফে বন্দুক এবং গুলি সাজানো থাকত। ছোটবেলা থেকেই এসব দেখে আমরা অভ্যস্ত। ছোট ছোট গুলি, বড় বড় গুলি। কিন্তু কোনটা কি জানি না। একটা পিস্তলের গুলি, একটা হয়তো-বা রাইফেলের। সাজানো থাকত। হার্ট-টাইপ ডিজাইন। বিশ-ত্রিরিশটা গুলি দিয়ে সাজানো একটা হার্ট। শেল্ফ উপরে কয়েকটা বন্দুক, নিচে গুলি।
আমি যেটা শুনেছি, উনি দৌড়ে বাসায় গেছেন। উনি দেখেছেন, কেউ তাকে ফলো করছে, দৌড়াচ্ছে। উনি তিনতলায় গিয়ে গান লোড করে শুট করে গেট পর্যন্ত এসেছিলেন। ওরা সম্ভবত তিনজন এসেছিল। একজনের গায়ে গুলি লেগেছিল। যার গায়ে গুলি লেগেছে, সে দেখিয়ে দিয়েছে, কোন জানালা দিয়ে গুলি হয়েছে। তখন তারা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে তাকে শুট করেছে শুনেছি।
শেখ রাসেল ছিল সামাদ খান সাহেবের ছেলে আবদুল আওয়াল খান চৌধুরী ইমরানের সমবয়সী যা আগেই বর্ণনা করেছি।
১৬ সেপ্টেম্বর আব্দুল আওয়ালের ইমরানের জন্ম। রাসেল ইমরানের এক মাসের বড় ছিলো।
রাসেল ছোটবেলায় খুবই হ্যাংলা-পাতলা ছিল। রাতে স্যান্ডো গেঞ্জি আর হাফপ্যান্ট পরে ঘুমাত। তাকে দেখে প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্টের ছেলে মনে হতো না। আমরা সহজ সরল রাসেলকে বন্ধু বা খেলার সাথী হিসেবে ট্রিট করতাম। রাতে সে এভাবেই ঘুমিয়ে ছিল। যখন গোলাগুলি শুরু হয়, তখন তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। সে প্যানিক্ড হয়ে যায়। একজন পুলিশ, জানি না তিনি ওখানে পুলিশ প্রধান ছিলেন কি না, রাসেলকে আড়াল করার চেষ্টা করেছিলেন। যে গার্ডরুমটা আছে, যেখানে ওরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ডিউটি করেন, রাসেলকে সেখানে ঢোকানোর চেষ্টা করছিলেন। রাসেল কাঁদছিল। বলছিল, মায়ের কাছে যাব। ওই পুলিশকে যখন গানপয়েন্টে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এ কে? তখন সে বাধ্য হয়ে বলেছিল, সাহেবের ছেলে।
মায়ের কাছে যাবা? আমার সঙ্গে আসো। এ কথা বলে সে তাকে নিয়ে যায় তিনতলায়। দোতলায় তারা অলরেডি বেগম মুজিবকে খুন করেছে। তিনতলায় তার দুইটা নতুন ভাবি। ভাবিদের পাশে দাঁড় করিয়ে ভাবিদের দিকে ব্রাশফায়ার করেছে কোমর বরাবর। রাসেলের মাথায় গুলি লেগেছে। হাইট অনুযায়ী সে ভাবিদের কোমরের কাছাকাছি উচ্চতায় দাঁড়ানো ছিল। শুনেছি, তার মাথার খুলি থেতলে দেয়ালের সঙ্গে আটকে ছিল। মগজ ছিটকে পড়েছিল। এ রকম দৃশ্য সম্ভবত আবদুল দেখেছে।
বঙ্গবন্ধুর অফিস সহকারী, বোধহয় মোহিতুল। তিনি বলেছেন রাসেল তাঁর সঙ্গে ছিল।
একেক জন একেক রকম বলেন, হতে পারে, আমি তো দেখিনি। রাসেল ওয়াজ স্পট ডেড।
শেখ নাসের ছিলেন নিচতলায়। উনার পায়ে বোধহয় কোনো একটা সমস্যা ছিল। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে কষ্ট হতো। শুনেছি খুঁড়িয়ে হাঁটতেন। নিচে একটা কামরায় ছিলেন। উনাকে টয়লেট নিয়ে গুলি করেছিল, একটা গুলি।
শেখ নাসেরের পায়ে গুলি লেগেছিল। মিনিট দশেক পরে উনি পানি পানি বলে শব্দ করছিলেন। শব্দ শুনে কয়েকজন গিয়ে তাঁকে আরও কয়েকটা গুলি করে। ওরা তো বাঁচিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে গুলি করেনি। তাই জীবিত দেখে দ্বিতীয়বার গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে।
১৫ আগষ্ট যখন বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে এসব ঘটনা ঘটল, তখন আমাদের ঘুম ভাঙিয়ে সবাইকে এক ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। সবাই আমাদের ফ্লোরে বসেছিলাম।
তখন রেডিও ছিল, ট্রানজিস্টার রেডিও। রেডিও অন করে আমরা শুনছিলাম কিছুক্ষণ কোরান তেলাওয়াত। তারপর ঘোষণা-আমি মেজর ডালিম বলছি, শেখ মজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে। আরেকটা কথা। আম্মার ঘুম খুবই পাতলা। আমরা যদি ঘুমন্ত মায়ের ঘরে পা টিপে টিপেও ঢুকি, উনি ঠিকই টের পেয়ে যান। রাত আনুমানিক সাড়ে তিনটা-চারটার দিকে আম্মার ঘুম ভেঙ্গে যায়। ১৪-১৫ আগষ্টের মধ্যবর্তী শেষরাতে। আম্মার মনে হলো, জানালা দিয়ে কেউ টর্চ মেরেছে। টর্চ মারায় মনে হলো চোর এসেছে। আম্মা আব্বাকে ডাকেন। মনে হয় চোর এসেছে। আব্বাও উঠে গেছেন। জানালা দিয়ে টর্চের আলো এসেছিল, ওখানে বাইরে একটা লাইট আছে, বাল্ব আছে। এটা হলো সিকিউরিটি লাইট। ওটার সুইচ আমাদের ঘরের পাশের ঘরে। অর্থাৎ চোর যদি বাতি জ্বালিয়ে থাকে, তাহলে সে নিশ্চয়ই পাশের ঘরে ঢুকেছে। তা না হলে সুইচ অন করবে কিভাবে?
আব্বা-আম্মা একসঙ্গে পাশের ঘরে গেলেন। তার আগে মাস্টার বেডরুমের বাতি জ্বলল। এরপর পাশের ঘরের বাতি জ্বলল। জানালা দিয়ে বাইরের সব আলো দেখা যায়। পাশের ঘরটা আন্ডার লক অ্যান্ড কি, ভেতরে কেউ নাই। সুইচও অফ।
আব্বা আমার বড় ভাইকে ডাকলেন। বড় ভাই স্টুডেন্ট। উনার কাছে নানা ধরনের যন্ত্রপাতি আর সরঞ্জাম আছে। তার মধ্যে চার-পাঁচ ব্যাটারির টর্চও আচে। আনকমন, খুব পাওয়ারফুল।
আব্বা-আম্মাসহ সবাই একাধিক টর্চ নিয়ে বের হলেন। যে জানালা দিয়ে আলো এসেছে, সেটা দেখতে গেছেন। একটা একটা করে লাইট যখন জ্বলে উঠছে, উনারা যখন বাসার বাইরে বাগানে গেলেন, তখন রাত হয়তো সাড়ে তিনটা বা চারটা। আামাদের বাসার পেছনে একটা ওয়াল আছে। প্রায় দশ ফুট উঁচু। শুনেছি, যারা আক্রমণ করতে এসেছিল, তারা দশ ফুট ওয়ালের উপরে উঠে এক সেকেন্ডের জন্য একটা সার্চলাইট জ্বালিয়েছিল। যে পথ দিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসায় যাবে, সে পথে কোনো বাধা আছে কি না তা দেখতে। এক সেকেন্ডের জন্য ওরা আলো জ্বালিয়েছিল। ওই আলো জানালা দিয়ে আম্মার চোখে পড়েছিল। এ জন্য আম্মার ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল।
আম্মা তো আর এদের পরিকল্পনার কথা জানেন না। যখন একটা একটা করে বাতি জ্বলতে আরম্ভ করল, তখন আব্বা-আম্মা আর বড় ভাই কয়েকটা টর্চ নিয়ে বেরিয়েছেন। যারা ওই সময় পেছনের ওয়ালের ওপর উঠেছিল, তারা দশ ফুট উচুঁ থেকে লাফ দিয়ে পেছনের দিকে পড়ল। আমাদের বাসায় না ঢুকে পেছনের বাসায় গেল। আব্বা-আম্মা কিছু টের পাননি। দেখলেন, চোর-টোর কিছু নেই। তারা যার যার ঘরে ফিরে এলেন। ভাইয়া ঘুমিয়ে পড়লেন। আম্মা শুয়ে পড়লেন। আব্বা তাহাজ্জুতের নামাজ আরম্ভ করলেন। এরপর বিউগল। তারপর গোলাগুলি। আমরা সবাই ওই সেফরুমে ঢুকলাম।
যারা দশফুট ওয়াল টপকে আমাদের বাসায় ঢুকতে চেয়েছিল এবং ঢুকতে না পেরে ওপাশে নেমে গেছে, তারা সম্ভবত আমাদের ওপর রাগ করেছে। হয়তো ভেবেছে, এই পরিবারের জন্য আমাদের পাঁচ মিনিট দেরি হলো। দশ ফুট উপর থেকে লাফ দিতেও তো কষ্ট আছে। চুরি বা জখম করতে এসে কেউ যদি বাধা পায় তার তো রাগ হওয়ারই কথা।
আব্বা-আম্মাকে ওরা গুলি করেনি। হয়তো ভেবেচে, আগে গুলি করলে অন্যরা সতর্ক হয়ে যাবে। গুলির তো অনেক শব্দ। তাদের উপস্থিতি টের পেতে না দিয়ে আড়ালে চলে গেছে। পরে যখন অ্যাটাক হয়, আমাদের বাসার ওপর তাদের হয়তো একটা আক্রোশ ছিল। তারা আমাদের বাড়ি লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার করেছিল। দোতলার ছাদে আমাদের যে পানির ট্যাংক, তার নিচে তার গুলি করে ছিদ্র করে দিয়েচে। আমাদের বাসার জানালার কাচে, দেয়ালের প্লাস্টারে গুলির দাগ ছিল। এটা টার্গেট ছিল না রাগ- জানিনা!
আগের দিনের একটা ঘটনা বলি। এটা আব্বা-আম্মার কাছে শুনেছি। ১৪ তারিখ দিনের বেলা বুটপরা পাঁচ-ছয়জন লোক এসেছিল। বলছিল, ‘আমরা মিউনিসিপ্যালিটির লোক। বাড়িটা মাপব।’ আম্মা বাসায় ছিলেন। উনি অনুমতি দিয়েছেন, ‘ঠিক আছে, মাপো।’ উনি দেখলেন, ওরা শুধু বাড়ির পেছনের দিকটা মাপল। নারকেল গাছের নিচে যে জায়গাটা আছে, ওটা। ফিতা দিয়ে মাপার আগে নারকেলের শলার ঝাড়ু দিয়ে তারা জায়গাটা পরিস্কার করলো।
আমাদের বাড়িতে কাঁঠাল গাছ আছে। শুকনো পাতা ঝরে নিচে পড়ে থাকে। ঝাড়– দিয়ে ওগুলো পরিষ্কার করল। আম্মা জানালা দিয়ে দেখলেন, ওরা ঝাঁট দিচ্ছে। আম্মা জানতে চাইলেন ঝাঁট দিচ্ছেন কেন? ওরা বলল, ‘ফিতার নিচে পাতা থাকলে মাপে গোলমাল হয়। এজন্য সাফ করছি।’
এটা আসল কারণ না। আসল কারণ হলো, যেহেতু তারা পরদিন ভোরে আক্রমণ করবে, শুকনো পাতার ওপর দিয়ে বুট পরে হাঁটলে মচমচ শব্দ হবে, সেজন্য এটা করা হচ্ছে। আম্মা পরে বলেছেন, যারা মাপতে এসেছিল তারা সম্ভবত মিলিটারির লোক।
আম্মাতো ওদের দেখেছেন সিভিল ড্রেসে। আম্মার যেটা খটকা লেগেছে, যেটা ওনি পরে আমাদের বলেছেন, ওদের পায়ে একই ধরনের জুতা। যখন তারা খেলতে যায়, দৌড়ের উপর থাকে, পিটি করে তখন এ ধরনের কেড্স পড়ে।
প্ল্যান হয়তো ছিল যে, তারা আমাদের বাড়ির ভেতর দিয়ে ওপাশের বাড়িতে ঢুকবে। গেটে পাহারারত লোকদের এড়িয়ে যাওয়ার জন্য হয়তো এই বাড়তি সতর্কতা। সম্ভবত এটা ছিল একটা মাস্টারপ্ল্যান।
আমরা বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সুখে দুঃখে, আনন্দে, সময়ে অসময়ে পাশেই ছিলাম। কিন্তু ১৫ আগষ্টের শোকাবহ এ সময়ে আমরা তাঁদের জন্য কিছুই করতে পারিনি। এ ক্ষোভ ও কষ্ট আমাদের সারা জীবনই থাকবে।
একজন সু-প্রতিবেশী হিসেবে যা বুঝায় আমরা সে হিসেবেই বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারকে পেয়েছিলাম। রাতে বঙ্গবন্ধুর বাসায় অনেকেই ছিলেন। যারা ছিলেন তাঁরা সকলে মারা গেছেন। শুধু মাত্র কাজের বুয়া আর কাজের ছেলে এবং মহিউদ্দিন ছাড়া।
আমরা আল্লাহকে হাজীর নাজির জেনে বলছি, “বঙ্গবন্ধু একজন বিশাল হৃদয়ের মানুষ ছিলেন।” রেনু খালাম্মাকে আমরা মায়ের মতোই পেয়েছি। আম্মার সাথে রেনু খালাম্মা (বেগম মুজিব) অসম্ভব হৃদয়তাপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো। তিনি আম্মার কাছে প্রায়শ দোয়ার জন্য বলতেন। এখনো আফসোস পাশে থেকেও বঙ্গবন্ধুর পরিবার বা আমার খেলার সাথীর চিৎকার ‘আমি আম্মার কাছে যাব’ আমাদের কানে বাজে। হাসু আপার ¯েœহ এখনো আমাকের রাসেলের কথা মনে করিয়ে দেয়।
সূত্র ঃ ১। আব্দুল আওয়াল খান চৌধুরী ইমরানের সাথে মুখোমুখি কথা আমাকে যেভাবে বলেছেন।
২। এনটিভিতে প্রচারিত ১৫ আগষ্টের রাতে “পাশের বাড়ি” আবদুল আওয়াল খান চৌধুরী ইমরানের সাক্ষাৎকার।
৩। মহিউদ্দিন আহমদ লিখিত বাতিঘর প্রকাশন হতে প্রকাশিত “৩২ নম্বর পাশের বাড়ি”।
৪। বর্তমান আমেরিকা প্রবাসি আবদুল আহাদ খান চৌধুরীর বাবুর দেয়া বক্তব্য।
৫। আব্দুল হালিম খান সালমানের স্মৃতি কথা।
৬। শেখ মুজিবুর রহমানের “অসমাপ্ত আত্মজীবনী”।
৭। মমিনুল হক খোকা লিখিত “অস্তরাগে স্মৃতি সমুজ্জ্বল : বঙ্গবন্ধু তাঁর পরিবার ও আমি” সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা।

E-mail : nesarahmed007@yahoo.com

Please follow and like us:
3
20
fb-share-icon20
Live Updates COVID-19 CASES