পাল্টে গেলেন মাহাথির?

সীমানা পেরিয়ে ডেস্ক : মালয়েশিয়ার সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহীমের কারামুক্তি স্থগিত করা হয়েছে। দেশটির সদ্যনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের কার্যালয়ের অনুরোধের পর বুধবার পর্যন্ত তার মুক্তি স্থগিত করা হয়। মালয়েশিয়ার স্থানীয় সংবাদমাধ্যম কিনি এক প্রতিবেদনে বলছে, দেশটির নির্ধারিত একটি বোর্ডের বৈঠকে বন্দিদশা থেকে মুক্তির ব্যাপারে আলোচনা না হওয়া পর্যন্ত মুক্ত হচ্ছেন না সাবেক এই উপ-প্রধানমন্ত্রী। বুধবার রাজকীয় ক্ষমার বিষয়ে ক্ষমা বোর্ডের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। মালয়েশিয়ার রাজা ইয়াং দি-পার্তুয়ান অ্যাগংয়ের কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আনোয়ারের মুক্তির জন্য নেয়া সব ধরনের ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট ছিলেন রাজা। কিন্তু বৈঠক ১৬ মে (বুধবার) পর্যন্ত স্থগিত করতে প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের কার্যালয় অনুরোধ জানিয়েছে। রাজ কার্যালয়ের কর্মকর্তা ওয়ান আহমাদ দাহলান বলেন, বুধবারের বৈঠকে আনোয়ারের মুক্তি চূড়ান্ত করার অনুরোধে সম্মতি জানিয়েছেন রাজা ইয়াং দি-পার্তুয়ান অ্যাগং। আনোয়ােরের স্ত্রী ওয়ান আজিজাহ ইসমাইল; যিনি দেশটির উপ-প্রধানমন্ত্রী পদমর্যাদা পান। প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের সঙ্গে আনোয়ারের মুক্তির ব্যাপারে তিনি আলোচনা করেছেন বলে জানিয়েছেন। আনোয়ারের রাজনৈতিক দল পার্টি কিদিলান রাকয়াত (পিকেআর) ও তার আইনজীবী আর সিভারাসা বুধবার পর্যন্ত সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর মুক্তি স্থগিতের তথ্য নিশ্চিত করেছে। আনোয়ার বর্তমানে মালয়েশিয়ার রাজধানী চেরাস রিহ্যাবিলাইটেশন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এই হাসপাতালেই তার কাঁধের সার্জারি সম্পন্ন হয়েছে। এর আগে শনিবার চ্যানেল নিউজ এশিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আনোয়ারের মেয়ে নুরুল ইজ্জাহ বলেছেন, মঙ্গলবার তার বাবা মুক্তি পাবেন।
পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার? আনোয়ারের রাজনৈতিক দল পিকেআর গত বুধবার দেশটির ১৪তম সাধারণ নির্বাচনে ৪৮ আসনে জয় পেয়েছে। মাহাথির মোহাম্মদের পাকাতান হারাপানের সঙ্গে জোট বেঁধে ১১৩ আসন পেয়ে এ দুই দল বর্তমানে দেশটির সরকার গঠন করেছে। মাহাথির ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলে আনোয়ারই দেশটির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন বলে মনে করা হয়। সমকামিতার অভিযোগে ৭০ বছর বয়সী আনোয়ারকে পাঁচ বছরের কারাদ- দেয়া হয়। তার ক্যারিয়ার শেষ করতেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক এ অভিযোগ করেছেন বলে আনোয়ারের দাবি। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মালয়েশিয়ায় সমকামিতা অবৈধ। এ ধরনের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির ২০ বছরের কারাদ-ের বিধান রয়েছে দেশটির আইনে। মুক্তির পরও রাজা যদি সাবেক এই উপ-প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমা না করেন তাহলে তিনি পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য তার কার্যালয়ের দায়িত্ব পালনে অযোগ্য বিবেচিত হবেন। এর আগে ১৯৯৮ সালে ব্যক্তিগত গাড়িচালকের সঙ্গে সমকামিতার একই ধরনের অভিযোগ এনে আনোয়ারকে ছয় বছরের কারাদ- দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। ওই সময় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও আনা হয় তার বিরুদ্ধে। পরে ২০০৪ সালে দেশটির শীর্ষ আদালত তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে মুক্তির আদেশ দেন। মাহাথিরের বেশ কিছু নীতি নিয়ে কট্টর সমালোচনা করায় আনোয়ারের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অবসান ঘটে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে দেশটির ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড মালয় ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনকে (ইউএমএনও) ক্ষমতা থেকে হটাতে আকস্মিকভাবে আনোয়ারের সঙ্গে জোট গড়েন মাহাথির মোহাম্মদ।
সম্প্রতি আনোয়ার ও তার পরিবারের ভোগান্তির কথা স্বীকার করেন মাহাথির। তিনি বলেন, ‘আনোয়ারের কষ্ট আমি অনুভব করেছি। আমার প্রশাসনের সময় তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। আমাকে মেনে নেয়াটা তার জন্য এত সহজ হবে না; এমনকি আমার সঙ্গে করমর্দন করাও।’ ‘আর এটা শুধু আনোয়ারের জন্যই নয়, বরং তার পরিবারও ভুগেছে। তারা ২০ বছর ধরে ভোগান্তির শিকার হয়েছে।’

দুই-এক বছর ক্ষমতায় থাকবেন মাহাথির : মালয়েশিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ জানিয়েছেন, তিনি দুই-এক বছর ক্ষমতায় থাকবেন। এরপর জোটের অন্যতম নেতা আনোয়ার ইব্রাহিমের জন্য তিনি পদ ছেড়ে দেবেন। গতকাল মঙ্গলবার ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেছেন। মাহাথির জানিয়েছেন, কারারুদ্ধ আনোয়ার ইব্রাহিমকে বুধবার মুক্তি দেওয়া হবে। এছাড়া পূর্বসূরি নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে শিগগিরিই মামলা করতে যাচ্ছে। গত সপ্তাহে মালয়েশিয়ার জাতীয় নির্বাচনে ৯২ বছরের মাহাথিরের নেতৃত্বে চারদলীয় জোট বিজয় পায়। এর মধ্য দিয়ে মালয়েশিয়ার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বারিসান ন্যাশনালের বিরুদ্ধে কোনো দল বিজয় পেল। বৃহস্পতিবার শপথ নেওয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বয়সের প্রধানমন্ত্রী হন মাহাথির। ভিডিও লিংকের মাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাহাথির বলেছেন, ‘প্রাথমিক পর্যায়ে সেটা হতে পারে এক কিংবা দুই বছর মেয়াদে আমি প্রধানমন্ত্রী থাকব। ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পরও পেছন থেকে আমার একটা ভূমিকা থাকবে।’
মাহাথির শনিবার তার মন্ত্রিসভায় তিনজনকে নিয়োগ দিয়েছেন। গুঞ্জন উঠেছে এ নিয়ে মাহাথির মোহাম্মদ ও আনোয়ার ইব্রাহিমের দলের সঙ্গে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। মাহাথির অবশ্য মঙ্গলবার সাফ জানিয়েছেন, তিনিই সরকার প্রধান। আর মন্ত্রিসভার সদস্য নিয়োগে তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। আনোয়ার ইব্রাহিম মুক্তি পেলেও তাকে বিশেষ কোনো ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছেন বলেও জানিয়েছেন মাহাথির। তিনি বলেছেন, ‘আমি আশা করছি, জোটের অন্য তিনটি দলের নেতারা যে ভূমিকা পালন করবে, সেও একই ভূমিকা পালন করবে। মন্ত্রী বা উপপ্রধানমন্ত্রী বা উপপ্রধানমন্ত্রীর মতো তাকে বিশেষ কোনো ক্ষমতা দেওয়া হবে না।’

Please follow and like us:
0