পানির মধ্যে বসবাস

পানির মধ্যে বসবাস

শ্রেয়া ব্যানার্জ : আমাদের দেশে বেদে-বেদেনীরা নৌকায় বাস করে। নৌকাতেই রান্নাবাড়া করে, খায় দায়, ঘুমায়। আবার গ্রামের বাড়িগুলোও বর্ষাকালে কিংবা বন্যার সময় পানিতে আটকা পড়ে।
তখন বাঁশবেড়া কিংবা টিনের তৈরি ঘরগুলো যেন ডুবে যায় পানিতে। ঘরের সঙ্গে বাঁধা থাকে নৌকা। আর এ ঘর থেকে ও ঘরে যাওয়ার জন্য তৈরি হয় ছোট ছোট বাঁশের সাঁকো। তখন আমরাও যেন বাস করি পানির মধ্যে।

পৃথিবীর অনেক দেশের অনেক মানুষই পানির মধ্যে বসবাস করে। ভিয়েতনামের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত একটি এলাকা ‘হা লং বে’। সেখানে গেলে চোখে পড়বে পানিতে বাস করার দৃশ্য৷ সেখানে প্রায় ষোলশ মানুষ কাঠের তৈরি নৌকাবাড়িতে বসবাস করছে৷ এখানকার অধিবাসীদের মূল আয়ের উৎস হচ্ছে মাছ ধরা, মুক্তা সংগ্রহ আর পর্যটন৷ নৌকাবাড়িতে বিদ্যুতের চাহিদা মেটায় ডিজেল ইঞ্জিন৷

ব্রাজিলের এক লম্বা নদীর নাম ‘রিও নিগ্রো’। নদীর তীরে আছে প্রচুর ঝোপজঙ্গল। ঝোপে পাওয়া যায় প্রচুর খড়িকাঠ। সেই খড়ি আর গাছগাছালি দিয়ে এক ধরনের ভাসমান বাড়ি বানায় রিও নিগ্রোর অধিবাসীরা। বাড়িগুলো নদীর তীরে ভাসতে থাকে। যদি কখনো বন্যা হয় তখনও কিন্তু ওদের কোনো চিন্তা নেই। নদীতে পানি বাড়তে থাকে আর ওদের বাড়িও উঁচুতে উঠতে থাকে।
কৃত্রিম দ্বীপের ধারণা বহু আগে থেকেই পৃথিবীবাসীর পরিকল্পনায় ছিল৷ তাছাড়া অনেক মানুষ আগে থেকেই পানিতে থাকছে৷ নেদারল্যান্ডসের নৌকাবাড়িতে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়৷ সেদেশে নৌকাবাড়ির সংখ্যা দশ হাজারের মতো, এগুলোর মধ্যে আড়াই হাজারের অবস্থান বিভিন্ন খালের মধ্যে৷

ইউরোপের কিছু কিছু পরিবার নৌকায় জীবনধারণ করে। তারা সারা বছর পানির মধ্যে বসবাস করে। পানির ওপর এক ধরনের বাড়ি বানায় তারা। সেখানেই তাদের পরম সুখ। এ ধরনের নৌকাকে বলে ‘বার্জেস’। লম্বা ও বড় ধরনের এইসব নৌকায় প্রচুর মালপত্র বহন করা হয়। নদী কিংবা বড় বড় খালেই মূলত এদের চলাচল। তাদের বাবা হয়তো নদীপথে মাল আনা-নেওয়ার ব্যবসা করে। নৌকায় কেটে যায় দিনের পর দিন। তাহলে পরিবারের অন্য সদস্যরা আলাদাভাবে থাকবে কেন? তারা সবাই মিলে বাস করা শুরু করে বার্জের মধ্যে। এইভাবেই গড়ে ওঠে নৌকায় বসবাস।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নদীতে কিংবা নদীবন্দরে প্রচুর পরিমাণে ‘বার্জ’ দেখা যায় যাদের সহজ করে বলা হয় ‘হাউসবোট’। বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘নৌকা বাড়ি’। ‘সাম্পান’ নামেও এদের পরিচয় আছে। প্রায় বিশ ফুট লম্বা সাম্পানে থাকা ছোট্ট একটা কেবিন। ওখানেই বসবাস করে মানুষেরা। সাম্পানেই হয়তো কারো জন্ম হয়। সে বেড়ে ওঠে। একদিন বড় হয়। শত শত বছর ধরে এ ভাবেই চলছে সাম্পাদনের জীবন।
অদ্ভুত এক ধরনের বাড়ি দেখা যায় ইরাকের নদীতীরবর্তী এলাকায়। নদীর তীরে লম্বা পাটখড়ির মতো এক ধরনের গাছ জন্মায়। প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হয় খড়িকাঠি। মানুষেরা সেখানে খড়িকাঠি দিয়ে ঘর বানায় বিচিত্র উপায়ে। প্রথমে তারা আগাছা কেনে ভাসিয়ে দেয় নদীতে। চাপ চাপ খড়ি ভাসতে থাকে পানিতে। যেন তৈরি হয় ছোট্ট একটি দ্বীপ।
তারপর সেই খড়ি গেঁথে তৈরি হয় দেয়াল। সবচেয়ে বড় খড়িগুলো গুচ্ছ গুচ্ছ বেঁধে বানানো হয় দোচালা ছাদ। ঘরগুলো দেখতে অনেকটাই আমাদের দেশের বেড়ার ঘরের মতো। ঘরের মেঝে, ঘরের উঠোন, ঘরের ছাদ সবই তৈরি হয় সেই খড়ি দিয়ে। তারা নৌকাও বানায় সেই খড়িকাঠি দিয়ে। তাদের পানির মধ্যে বসবাস, পানির মধ্যে চলাচল।

আবার পৃথিবীর দরিদ্র এলাকার অনেক মানুষ অনেকটা বাধ্য হয়ে পানিতে বাস করে, তারা বহু আগে থেকেই নৌকায় থাকে৷ ভবিষ্যতে ভারত ও বাংলাদেশে নৌকায় বসবাসের হার বেড়ে যেতে পারে বলে পরিবেশবিদদের ধারনা৷ কেননা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। যদি পানিতে বাস করা যেত মন্দ হতো না। কী বলো?

Please follow and like us:
0