মঙ্গল. জুলা ১৬, ২০১৯

পাটকল শ্রমিকদের আন্দোলন অব্যাহত

পাটকল শ্রমিকদের আন্দোলন

Last Updated on

প্রত্যাশা ডেস্ক : শ্রমিক আন্দোলনে অচল হয়ে পড়েছে খুলনার খালিশপুর শিল্পাঞ্চল। লাগাতার ধর্মঘটে শ্রমিকরা মিলগেটে বিক্ষোভ করার পাশাপাশি ৩ ঘণ্টা রাজপথ-রেলপথ অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন খুলনার ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, খালিশপুর, দৌলতপুর, স্টার, আলীম, ইস্টার্ন, যশোরের কার্পেটিং ও জেজেধাই জুট মিলের অর্ধলাখ শ্রমিক-কর্মচারী। প্রতিদিন বিকেলে কর্মসূচি চলাকালে শ্রমিকেরা নতুন রাস্তা মোড়ে টায়ারে ও কাঠের গুড়িতে আগুন জ¦ালিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। সেখানেই নামাজ আদায় এবং ইফতার করেন তারা। একই কর্মসূচি পালন করেন আটরা-গিলাতলা ও রাজঘাট শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকেরা। এর আগে গত ৫ মে হঠাৎ করে শ্রমিকেরা খুলনা অঞ্চলের পাটকলগুলোর উৎপাদন বন্ধ করে দিয়ে কর্মবিরতি পালন শুরু করেন। গতকাল মঙ্গলবার ছিলো টানা ৯ম দিনের কর্মসূচি। ক্রিসেন্ট জুট মিলের শ্রমিক নেতা আবুল হোসেন হারুন বলেন, সপ্তাহ শেষে মজুরি দিয়ে সংসার পরিচালনা করি। অথচ গত ১৩ সপ্তাহ শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া হচ্ছে না। এখন আর ব্যবসায়ীরা শ্রমিকদের বাকিতে সদাইও দিতে চায় না। এভাবে চললে না খেয়ে মরতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে বকেয়া মজুরি পরিশোধের বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবায়নের বিষয়ে কোনো স্বদিচ্ছা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সম্ভাবনাময় পাট শিল্পকে বাঁচাতে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তিনি। এদিকে শ্রমিকদের কর্মবিরতির পর খুলনা রাষ্ট্রায়ত্ত নয়টি পাটকলে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট চলায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে গোটা শিল্পাঞ্চলে। বকেয়া মজুরি, মজুরি কমিশন বাস্তবায়নসহ ৯ দফা দাবিতে ধর্মঘট চলছে। বাংলাদেশ পাটকল শ্রমিক লীগ খুলনা-যশোর অঞ্চলের আহ্বায়ক ও ক্রিসেন্ট জুট মিলের সিবিএ সভাপতি মুরাদ হোসেন জানান, আমাদের এখনও পর্যন্ত কোনো মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন করা হয়নি। আমরা দীর্ঘদিন ধরেই এসব নিয়ে কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে আসছি। বিজেএমসি, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী বরাবর চিঠিও পাঠিয়েছি। কিন্তু কর্তৃপক্ষের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ৯ দফা দাবি যতোদিন আদায় না হচ্ছে ততোদিন কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি। এদিকে মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে খুলনার খালিশপুর শিল্প এলাকার শ্রমিক কলোনিতে। কোনোভাবেই পরিবারের ভরণপোষণ মেটাতে পারছেন না সরকারি পাটকলের শ্রমিকরা। ঠিকমতো সন্তানদের মুখে আহার তুলে দিতে না পারার কষ্ট ছাপিয়ে তাদের পড়ালেখা নিয়ে চিন্তিত শ্রমিক পরিবারগুলো। শ্রমিকরা বলছেন, ১৩ সপ্তাহের মজুরি না পাওয়ায় শ্রমিক পরিবারগুলো দুর্বিষহ জীবন পার করছে। স্থানীয় মুদি দোকানিরা বাকি দিয়ে শ্রমিকদের কাছে টাকা চাইতে পারছে না। পাটকল শ্রমিকদের লাগাতার ধর্মঘট চললেও সরকারের পক্ষ থেকে সমস্যা উত্তরণে কোনো ঘোষণা নেই। বকেয়া মজুরিসহ ৯ দফা দাবি না মানলে শ্রমিকরা রাজপথে আত্মাহুতির হুমকি দিয়েছেন। রমজানে টানা আন্দোলন চালিয়ে অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়লেও দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ না ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
৯ দফা দাবি মেনে নেয়ার আহ্বান : পাটকল শ্রমিকদের বকেয়া বেতনসহ ৯ দফা দাবি মেনে নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত এক সমাবেশে এ আহ্বান জানানো হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, শুধুমাত্র খুলনা অঞ্চলের ৯টি পাটকল শ্রমিকদের ১২ সপ্তাহের মজুরি ও কর্মকর্তা কর্মচারীদের ৩-৪ মাসের বকেয়া বেতন বাবদ পাওনা ৭৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা। কিন্তু ওই ৯টি পাটকলে ৩২৫ কোটি টাকার পাটপণ্য মজুত আছে। ৯টি পাটকলের প্রতিদিনের উৎপাদন ক্ষমতা ২৭২ টন, কিন্তু সেখানে প্রতিদিন উৎপাদন করা হচ্ছে ১০০.২৯ টন। এখানে প্রতিদিন যে ১৭২ টন কম উৎপাদন হচ্ছে, রাষ্ট্রের ক্ষতি হচ্ছে তার দায় দায়িত্ব কার?
তারা বলেন, মৌসুমে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা মণ দরের পাট সময় মতো না কিনতে পরে আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা দিয়ে ব্যবসায়ী ও ফড়িয়াদের কাছ থেকে কেনার ফলে যে ক্ষতি হয়, তার দায়িত্ব কেন শ্রমিকরা নেবে? অর্থমন্ত্রণালয় কেন সময় মতো অর্থ ছাড় করে না? এসব শাসক-লুটেরাদের চক্রান্ত।
বক্তারা আরও বলেন, সারা বিশ্বে সবুজায়নের জন্য ও পরিবেশ রক্ষা জন্য আন্দোলন হচ্ছে। ফলে ব্যাপক বাজার সৃষ্টি হচ্ছে পাটপণ্যের। সারা বিশ্বে বর্তমানে মিলিয়ন পিস শপিং ব্যাগের চাহিদা রয়েছে। এর মাত্র ৫ শতাংশ যদি আমরা রফতানি করতে পারি তাহলে হাজার হাজার কোটি টাকার রফতানি আয় করা সম্ভব। কিন্তু সরকারের নীতি সেই মুখী নয়।
এই ভুলনীতি পরিহার ও দুর্নীতি বন্ধ করে পাটকল-পাট চাষীদের রক্ষা ও পাটকল শ্রমিকদের বকেয়া বেতনসহ ৯ দফা দাবি মেনে নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান বক্তারা। একই সঙ্গে পাট শিল্পের বিরুদ্ধে সকল ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় পাটকল শ্রমিক, পাট চাষী ও দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন বাসদ ঢাকা মহানগর শাখার আহ্বায়ক বজলুর রশীদ ফিরোজ, বাসদ নগর শাখার সদস্য সচিব জুলফিকার আলী, সদস্য খালেকুজ্জামান লিপন, আহসান হাবিব বুলবুল, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবদুর রাজ্জাক, সহ-সম্পাদক ইমাম হোসেন প্রমুখ।

Please follow and like us:
0