মঙ্গল. জুন ১৮, ২০১৯

নুসরাত হত্যার নেপথ্যে ওলামাদের সম্মানহানি ও প্রেম প্রত্যাখ্যান

নুসরাত হত্যার নেপথ্যে ওলামাদের সম্মানহানি ও প্রেম প্রত্যাখ্যান

Last Updated on

নিজস্ব প্রতিবেদক :ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি ও তার পরিবার মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ এনে ওলামাদের সম্মানহানি ঘটিয়েছেন এবং শাহাদাত হোসেন শামীমের প্রেম প্রত্যাখ্যান করার কারণে নুসরাতকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেফতার সাতজনকে জিজ্ঞাসাবাদে এ তথ্য উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসাকেন্দ্রের আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে (১৮) কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে হত্যার চাঞ্চল্যকর ঘটনার সর্বশেষ অবস্থা জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার।
গতকাল শনিবার বেলা ১টায় রাজধানীর ধানমন্ডির ৪ নম্বর রোডে অবস্থিত পিবিআই কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বনজ কুমার মজুমদার বলেন, নুসরাত হত্যায় মোট ১৩ জনের সংশ্লিষ্টতা মিলেছে। এর মধ্যে এজাহারভুক্ত আট আসামির মধ্যে পরিকল্পনাকারী শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), নূর উদ্দিন (২০), মাকসুদ আলম কাউন্সিলর (২০), জোবায়ের আহম্মেদ, জাবেদ হোসেন (১৯) ও আফছার উদ্দিনকে (৩৫) গ্রেফতার করা হয়েছে। একই ঘটনায় আগে শ্লীলতাহানির অভিযোগে গ্রেফতার সিরাজ উদ দৌলাকে হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এজাহারভুক্ত অপর আসামি হাফেজ আব্দুল কাদের পলাতক।
সংবাদ সম্মেলনে বনজ কুমার মজুমদার বলেন, গত ২৭ মার্চ নুসরাত জাহান রাফিকে নিজ কক্ষে নিয়ে শ্লীলতাহানির অভিযোগে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ওই ঘটনার পর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় রাফির মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় একটি মামলা করেন। গত ৪ এপ্রিল সিরাজের সঙ্গে দেখা করতে কারাগারে যান মাদরাসা শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি শাহাদাত হোসেন শামীম ও মাদরাসার সাবেক ছাত্র নূর উদ্দিনসহ চারজন। সেখানে সিরাজ তাদের ‘একটা কিছু করে’ নুসরাতকে শায়েস্তা করার নির্দেশ দেন।
নূর উদ্দিনসহ গ্রেফতারদের জিজ্ঞাসাবাদের দেয়া তথ্যের বরাতে তিনি বলেন, অধ্যক্ষ ও তার নিকটস্থরা মনে করে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে তিনি অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ আলেম-ওলামা সমাজের হেয়-সম্মানহানি করেছে। যে কারণে তার শাস্তির প্রয়োজন।
অন্যদিকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ক্ষিপ্ত ছিল শাহাদাত হোসেন শামীম। অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠার সুযোগ নেয় শামীম। এই দুই কারণে সিরাজ উদ দৌলার নির্দেশনা অনুযায়ী শাহাদাত হোসেন শামীম নুসরাতকে কেরোসিন ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার পরিকল্পনা করেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ৬ এপ্রিল (শনিবার) সকালে রাফি আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসায় গেলে সেখানেই ভবনের ছাদে নিয়ে কেরোসিন ঢেলে তাকে আগুনে পোড়ানো হয়।
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দুই ছাত্রীর মাধ্যমে তিনটি বোরকা আনা হয়। আনা হয় কেরোসিন তেল। ৬ এপ্রিল বান্ধবী নিশাতকে ছাদের ওপর কেউ মারধর করছে বলে শম্পা ওরফে চম্পা নামে এক ছাত্রীর দেয়া সংবাদে ভবনের চারতলায় যান নুসরাত। সেখানে আগে থেকে লুকিয়ে ছিল শাহাদাতসহ চারজন। তারা নুসরাতকে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগ তুলে নিতে চাপ দেয়। কিন্তু নুসরাত অস্বীকৃতি জানালে ওড়না দিয়ে বেঁধে গায়ে আগুন দিয়ে তারা নির্বিঘেœ বেরিয়ে যায়।
গ্রেফতারদের মধ্যে নূর উদ্দিন হত্যাকা-ে জড়িত থাকার বিষয়ে স্বীকার করে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে বলে জানান বনজ কুমার।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন পিবিআইর বিশেষ সুপার (ঢাকা মেট্রো) আবুল কালাম আজাদ, এসপি বশির আহমেদ, মিনা মাহমুদা, পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা ও জনসংযোগ কর্মকর্তা কামরুল আহছান।
বনজ কুমার মজুমদার জানান, নুসরাত হত্যা মামলায় এজাহারভুক্ত নয় আসামির মধ্যে আটজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনার দিন আনুমানিক সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টায় ঘটনাস্থলে ছিলেন নূর উদ্দিন, শাহাদাত, জাবেদ হোসেন, হাফেজ আবদুল কাদের এবং আরো একজন। আমরা নাম পেয়েছি। আমরা কিছু নাম আপনাদের বলতে পারব না। বনজ কুমার আরো বলেন, রাফিকে পুড়িয়ে মারা হবে এই সিদ্ধান্ত তারা নেয়। সে মাদ্রাসার প্রিন্সিপালসহ আলেম সমাজকে হেয় করেছে, দ্বিতীয় কারণ হলো- এই শাহাদাত হোসেন শামীম প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছে, রাফি এটা কোনোভাবেই অ্যাকসেপ্ট করে নাই। এই তার রাগ। এদিকে, নুর উদ্দিন নামে একজনকে ময়মনসিংহ থেকে গ্রেফতারের পর গতকাল শনিবার সকালে সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই জানায়, নুসরাতের গ্রামেরই যুবক নুর উদ্দিন (২০) সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার সাবেক ছাত্র। ওই মাদ্রাসায়ই পড়তেন নুসরাত। এই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এনেছিলেন নুসরাত। গত ২৬ মার্চ নুসরাতের মা শিরীনা আক্তার মামলা করার পরদিন সিরাজকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। অধ্যক্ষ সিরাজকে গ্রেফতারের পরদিন তার মুক্তির দাবিতে সোনাগাজীতে যে মিছিল-সমাবেশ হয়েছিল, তাতে সংগঠকের ভূমিকায় ছিলেন রাফি হত্যাকা-ের মূল সন্দেহভাজন সোনাগাজীর উত্তর চর চান্দিয়া গ্রামের যুবক নুর উদ্দিন। ওই সমাবেশে তিনি হুমকি দিয়েছিলেন, অধ্যক্ষ সিরাজকে মুক্তি না দিলে মাদ্রাসা বন্ধ করে দেওয়া হবে। অধ্যক্ষ সিরাজকে নিয়ে ‘খারাপ রিপোর্ট’ করা হলে সাংবাদিকদেরও দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন এই যুবক। অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নিতে চাপ দেওয়া হচ্ছিল নুসরাতকে। তা না করায় গত ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষার দিন মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। বোরকা পরা কয়েকজন এই কাজটি করেছিল বলে নুসরাত নিজে বলে গেছেন। বোরকা পরা ওই হামলাকারীদের মধ্যে নুর উদ্দিনও ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ধানম-িতে পিবিআই কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, নুর ও শামীম দুজনই অধ্যক্ষ সিরাজের ‘অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ’ বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার পর তার ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান যে মামলা করেন, তার প্রধান তিন আসামি হলেন অধ্যক্ষ সিরাজ, নুর ও শামীম। ময়নসিংহেরই মুক্তাগাছা থেকে গত শুক্রবার শামীমকে গ্রেফতার করে পিবিআই। নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার পর দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠলে সোনাগাজী থানার ওসিকে সরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পিবিআইকে। পিবিআই দায়িত্ব নেওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে নুসরাতের ভাইয়ের ভাইয়ের করা মামলার আট আসামির মধ্যে সাতজনকে গ্রেফতার করা হল। আট আসামিদের মধ্যে হাফেজ আবদুল কাদের নামে একজন এখনও পলাতক। তাকে গ্রেফতারে অভিযান চালানো হচ্ছে বলে পিবিআই কর্মকর্তারা জানান। গ্রেফতার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা মাকসুদ আলম, মাদ্রাসাটির শিক্ষক আফছার আহমেদ, মাদ্রাসাটির সাবেক ছাত্র জাবেদ হোসেন ও জোবায়ের আহমেদ। এজাহারের আসামিদের বাইরে অধ্যক্ষ সিরাজের ভাগ্নি উম্মে সুলতানা পপিসহ কয়েকজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করে আদালতের অনুমতিতে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পিবিআই।
আরেক আসামি ৭ দিনের রিমান্ডে : ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসা কেন্দ্রে আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে (১৮) কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে হত্যা মামলার আসামি জাবেদ হোসেনের সাতদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল শনিবার ফেনী সদর আমলি আদালতের অবকাশকালীন বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইন এ আদেশ দেন।
আদালতের পরিদর্শক (কোর্ট ইন্সপেক্টর) গোলাম জিলানী বলেন, মাদরাসাছাত্রীর গায়ে আগুন দেয়ার ঘটনায় গ্রেফতার জাবেদ হোসেনকে আদালতে নেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ওসি মো. শাহ আলম। তিনি আসামির ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। আদালত সাতদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, সোনাগাজীর চাঞ্চল্যকর নুসরাত হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে এজাহারভুক্ত ছয় আসামি এবং এজাহারবহির্ভূত সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ওই মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ ১০ জন আসামি রিমান্ডে। পর্যায়ক্রমে সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এর আগে ৯ এপ্রিল সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সরাফ উদ্দিন আহম্মেদের আদালত নূর হোসেন, কেফায়াত উল্লাহ, মোহাম্মদ আলা উদ্দিন ও শাহিদুল ইসলামকে পাঁচদিন করে রিমান্ড দেন। ১০ এপ্রিল অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ দৌলাকে সাতদিন, আবছার উদ্দিন ও আরিফুল ইসলামকে পাঁচদিন করে রিমান্ড দেন একই আদালতের বিচারক। ১১ এপ্রিল উম্মে সুলতানা পপি ও যোবায়ের হোসেনকে পাঁচদিন করে রিমান্ড দেন একই আদালতের বিচারক সরাফ উদ্দিন আহম্মেদ।

Please follow and like us:
2