নীতিমালার তোয়াক্কা করছে না চিকিৎসকরা

নীতিমালার তোয়াক্কা করছে না চিকিৎসকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক : ব্যবস্থাপত্রে ওষুধ লেখার ক্ষেত্রে দেশের বেশিরভাগ চিকিৎসকই বিএমডিসির প্রণীত নৈতিকতা নীতিমালার তোয়াক্কা করছে না। অথচ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো চিকিৎসকদের নৈতিকতা সুনির্দিষ্ট করে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলও (বিএমডিসি) নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। কিন্তু দেশে চিকিৎসকরা নৈতিকতা পরিপালন করছে কিনা তারও কোনো তদারকি নেই। ফলে ওষুধ কোম্পানিগুলো বিক্রি বাড়াতে নানা উপঢৌকন নিয়ে চিকিৎসকের পেছনে ছুটছে। চিকিৎসকরাও রোগীর কথা না ভেবে নির্দিষ্ট কোম্পানির নির্দেশিত ওষুধ ব্যবস্থাপত্রে লিখছে। চিকিৎসকরা তাতে লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রোগীরা। কিন্তু বিদ্যমা নীতিমালা অনুসরণ করা হলে চিকিৎসককে পেশাগত দৃষ্টিকোণ থেকে রোগীর ব্যবস্থাপত্রে ওষুধ লিখতে হবে। ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে উপঢৌকন বা আর্থিক সুবিধা নিয়ে ওষুধ লেখা পুরোপুরি নৈতিকতাবিরুদ্ধ। আর্থিক বা অন্য কোনো সুবিধার বিনিময়ে বিশেষ কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হাসপাতাল বা নার্সিং হোমে রোগী পাঠানোরও সুযোগ নেই। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও চিকিৎসকদের নীতিমালা কঠোরভাবে পালন করা হয়। সেখানে কোনো চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে উপঢৌকন বা আর্থিক সুবিধা গ্রহণের প্রমাণ পেলে এক বছরের জন্য চিকিৎসা সনদ রহিত করা হয়। আর যুক্তরাষ্ট্রে তাকে দেখা হয় ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে। বিএমডিসি সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। সূত্র মতে, বিএমডিসির নীতিমালায় রোগীর ব্যবস্থাপত্রে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ লেখা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অথচ দেশজুড়েই তা প্রতিনিয়তই লঙ্ঘিত হচ্ছে। অনেক চিকিৎসকই ব্যবস্থাপত্রে একাধিক সাংঘর্ষিক ওষুধের নাম লিখে। কোনো কোনো চিকিৎসক রোগীর ব্যবস্থাপত্রে একাধিক অপ্রয়োজনীয় ফুড সাপ্লিমেন্ট লিখে দিচ্ছে। এমন অবস্থায় রোগীর ভালো হওয়ার পরিবর্তে প্রাণনাশের ঝুঁকিই বেশি থাকে। দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো নগদ অর্থ, ভ্রমণ, ওয়ার্কশপের স্পন্সর, চেম্বার সাজানো, ওষুধের স্যাম্পল, পেশাগত বা পেশাবহির্ভূত নানা উপহার চিকিৎসকদের প্রমাণ রয়েছে। অথচ বিভিন্ন দেশে ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে নগদ অর্থ নিলে নিবন্ধন বাতিলসহ শাস্তির বিধান রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে নগদ অর্থ গ্রহণের অপরাধে ফৌজদারি মামলায় এক চিকিৎসক ৩০ বছরের সাজা দেয়ার নজির রয়েছে। সূত্র জানায়, বিএমডিসির কোড অব প্রফেশনাল কন্ডাক্ট, এটিকেট অ্যান্ড ইথিকস শীর্ষক নীতিমালা অনুযায়ী, চিকিৎসক কোনো রোগীকে পরামর্শ গ্রহণ বা চিকিৎসার জন্য রেফার করার বিনিময়ে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আর্থিক বা অন্য কোনো ধরনের সুবিধা (ফ্রি বা সুলভে কনসালটেশনের জায়গা বা সাচিবিক সহায়তাসহ) নিতে পারবে না। একই সঙ্গে ওসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানও ওই ধরনের কোনো সুবিধা দিতে পারবে না। অথচ দেশের অনেক সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকই বেনামে হাসপাতাল-ক্লিনিক গড়ে তুলেছে। সেখানে রোগী রেফার কওে তারা চিকিৎসাও দিচ্ছে। রাজধানীতেই এমন ধরনের অনেক একাধিক হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। তার মধ্যে আবার অনেকগুলোর আবার বৈধতাই নেই।
সূত্র আরো জানায়, বিএমডিসির নীতিমালা লঙ্ঘন করেই কোম্পানিগুলোর বিক্রয় প্রতিনিধিরা ওষুধের বিক্রি বাড়াতে নানা উপঢৌকন নিয়ে চিকিৎসকের চেম্বারে হাজির হচ্ছে। আর ওসব উপঢৌকনের বিনিময়ে চিকিৎসকরাও সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ওষুধ রোগীর ব্যবস্থাপত্রে লিখছে। অবশ্য ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ওষুধের বিক্রি ও প্রচারের জন্য পৃথক কোড অব ফার্মাসিউটিক্যাল মার্কেটিং প্র্যাকটিস প্রণয়ন করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নীতিমালার আলোকে তা প্রণয়ন করা হয়েছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ওই নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রচারের উদ্দেশ্যে মেডিকেল পেশার সঙ্গে জড়িত কাউকে কোনো ধরনের উপহার দেয়া বা আর্থিক সহায়তার প্রস্তাব কিংবা সহায়তা করা যাবে না। ওষুধ কোম্পানিগুলো চিকিৎসকদের চেম্বার সাজানো থেকে শুরু করে নগদ অর্থ প্রদান করতে পারবে না। নৈতিকতার নীতিমালা থাকার পরও তা পরিপালন না হওয়ার বিষয়ে বিএমডিসির ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এবিএম মাকসুদুল আলম জানান, আগে থেকেই চিকিৎসকদের নৈতিকতা ও শিষ্টাচার সম্পর্কে একটি নীতিমালা ছিল। বর্তমানে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সেটি মডিফাই করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব চিকিৎসকের কাছে নৈতিকতার ওই বার্তা পৌঁছে দেয়া হবে। তাতে চিকিৎসকদের মধ্যে নৈতিকতার চর্চা আরো বাড়বে।

Please follow and like us:
0