নিরাপদ শৈশব, সুন্দর ভবিষ্যৎ

নিরাপদ শৈশব, সুন্দর ভবিষ্যৎ

অভীক বসাক : সমাজ, দেশ ও বৈশ্বিক পরিবর্তনে নতুনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। পরিবর্তনই শুধু নয়, ক্রমাগত উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথেও এগিয়ে নিয়ে যায় নতুনরা। তরুণ বা নতুনের আগমন হঠাৎ করে আসে না, শিশুরা একটু একটু করে এগিয়ে যায় তারুণ্যের দিকে। আজকের শিশু মানেই আগামী দিনের সম্ভাবনাময় তরুণ। শৈশবের উচ্ছল স্মৃতি প্রত্যেক মানুষের নির্মল আনন্দের উৎস। তাই গুণীজনরা আজীবন শৈশবের প্রতি তীব্রভাবে ব্যাকুলতা প্রকাশ করেছেন। বহু গান, কবিতা, ছড়া, রূপকথা, উপকথার চর্চা হয়েছে শৈশব আর শিশুদের নির্মলতা প্রকাশে। কেবল নির্মলতার উচ্ছ্বাসই মুখ্য নয়, এর আড়ালে রয়েছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার প্রস্তুতি। কোনো স্থাপনার ভিত্তি যত মজবুত হয়, সেটি তত দৃঢ় হয়- তা সবার জানা। তাই সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি দেশের শিশুরা। তাদের নিরাপদ, সুস্থ ও আনন্দময় শৈশবের নিশ্চয়তার মাধ্যমে সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব। তাই প্রত্যেক শিশুর নিরাপদ, সুস্থ ও আনন্দময় শৈশবের প্রত্যাশা সবার।
শিশুদের নিরাপদ পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ কেন্দ্র করে রচিত হওয়া বহু গানের মধ্যে সুপরিচিত একটি হলো- ‘আজ যে শিশু/পৃথিবীর আলোয় এসেছে/আমরা তার তরে/একটি সাজানো বাগান চাই’। গানে সুন্দর সাজানো বাগানের দাবি জানানো হলেও বাস্তবতায় চোখে পড়ে ভিন্ন চিত্র। এ চিত্রে প্রথমেই উঠে আসে শিশুদের কথা। ধনী, গরিব নির্বিশেষে সব শিশুই অনিরাপদ। মা-বাবার সঙ্গে শত্রুতা প্রতিশোধের প্রথম শিকার হয় তাদের শিশুসন্তানরা। এছাড়া শিশু পাচার, অপহরণ, মুক্তিপণ ও যৌন নির্যাতনের মতো গা শিউরে ওঠা অনিরাপত্তায় বেড়ে উঠছে তারা। তবে সচেতনতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বদৌলতে ধনী পরিবারের শিশুরা কিছুটা নিরাপত্তাবেষ্টনীতে বেড়ে উঠলেও ভয়ঙ্কর অনিরাপদ অবস্থায় থাকছে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের শিশুরা। শহরে ভাসমান মানুষের ভিড়ে বেড়ে ওঠা এ শিশুদের ‘পথশিশু’ নামে ডাকা হয়। ছোটবেলা থেকেই তারা খাদ্যের সন্ধানে নেমে পড়ে কঠিন জীবন সংগ্রামে। নিজ সামর্থ্য্ের চেয়েও বড় ও বিপজ্জনক কাজের বোঝা নিয়ে দিন কাটায় এ শিশুরা। দিন শেষে একবেলা খাবার আর কোনো রকমে বেঁচে থাকার ভাবনায় বিদ্যালয় কিংবা পড়াশোনার কথা মাথায় আসে না কারো। কেউ কেউ কোনো রকমে প্রাথমিক শিক্ষাটুকু নিলেও তা আত্মস্থ কিংবা ব্যবহারিক জীবনে কাজে লাগানোর সময়-সুযোগ কিছুই পায় না। ফলে এ শিক্ষা তাদের কাছে অর্থহীন। শিশু নির্যাতনের বহু ধরন থাকলেও এ সময়ে যৌন নির্যাতন শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন খবর দেশ, বিদেশ সবখানেই পাওয়া যায়। কখনো প্রলোভন বা ভয়ভীতি দেখিয়ে যৌন নির্যাতনের শিকার বানানো হচ্ছে এ সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমে উঠে এসেছে এমন কিছু খবর। সারা দিনের কাজ শেষে ঘরে ফেরার সময় দুই শিশুকে ধর্ষণ করে বাসের চালক, কন্ডাক্টরসহ কয়েকজন। অনেকে এ শিশুদের অর্থ, খাদ্য বা কাপড়ের লোভ দেখিয়ে ব্যবহার করে এসব কাজে। ফলে এদের স্বাভাবিক জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ।
এ ঘোর অনিরাপদ অবস্থার সমাধান জরুরি। প্রত্যেক শিশুর ন্যূনতম মৌলিক অধিকার পূরণে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে সরকারকে। এছাড়া শিশুশ্রম বন্ধ বা তাদের উপযোগী কিছু কাজের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে প্রত্যেক মানুষের উচিত শিশুদের ওপর নেমে আসা যে কোনো অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং দোষীদের যথোপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা। নইলে অনিরাপদ শৈশব নিয়ে বেড়ে ওঠা শিশুরা একদিন সবার জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

Please follow and like us:
0