সোম. ডিসে ৯, ২০১৯

নাচ-গান-কবিতা আর নাটকে ভাষা শহীদদের স্মরণ

Last Updated on

নিজস্ব প্রতিবেদক:একুশে ফেব্রুয়ারিতে নানা আয়োজনে ভাষা শহীদদের স্মরণ করেছে রাজধানী ঢাকার সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো।

গত মঙ্গলবার সারাদিন মুখর ছিল সংস্কৃতি অঙ্গনের প্রতিটি মঞ্চ। এসব পরিবেশনায় উঠে আসে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা। ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে ছিল সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের একুশে অনুষ্ঠানমালা। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও একাডেমির নন্দন মঞ্চে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে শিল্পকলা একাডেমি। রাজধানীর হাতিরঝিলের উন্মুক্ত মঞ্চে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট : ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’- সেøাগানে ৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছিল সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের একুশের অনুষ্ঠানমালা। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শুরু হওয়া ১৪ দিনের এ অনুষ্ঠানমালা মঙ্গলবার শেষ হল ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে। বিকাল থেকে রাত অবধি নাচ, গান, কবিতা ও পথনাটকে নিবেদিত হয়েছে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। এই আয়োজনে একক গান পরিবেশন করেন ফেরদৌসী কাকলী ও নীলুফার জাহান চিনু। সমবেত সঙ্গীত পরিবেশন করে সুরসপ্তক ও সুরধ্বনি। একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন লায়লা আফরোজ, বেলায়েত হোসেন, মাসকুর-এ-সাত্তার কল্লোল ও ঝণ

ৃা সরকার। বৃন্দ আবৃত্তি পরিবেশন করে স্বণণ ও কণ্ঠশীলন। শিশুতোষ পরিবেশনায় অংশ নেয় কল্পরেখা। দেশাত্মবোধক নৃত্য পরিবেশন করে নৃত্যজন ও দৃষ্টি কালচারাল সেন্টার। পথনাটক পরিবেশন করে নাট্যধারা ও গতি থিয়েটার।

সর্বস্তরে বাংলা ভাষার দাবি উদীচীর : বাংলা ভাষার বিকৃতিরোধ করে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিতের দাবি উত্থাপন করেছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। উদীচীর অমর একুশে উদযাপন কর্মসূচির তৃতীয় ও শেষ দিনে হাতিরঝিলের মেরুল-বাড্ডা প্রান্তে ঝিলপাড়ে অনুষ্ঠিত হয় ‘শহীদ স্মরণ’। অনুষ্ঠানের শুরুতে দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করেন উদীচী বাড্ডা শাখার শিল্পী-কর্মীরা। এরপর শুরু হয় আলোচনা সভা। উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি সফিউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে আলোচনা সভার শুরুতে বক্তব্য রাখেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন। এরপর আলোচনা করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি হাবিবুল আলম, ঢাকা মহানগর সংসদের সভাপতি কাজী মোহাম্মদ শীশ এবং ঢাকা মহানগর সংসদের সহ-সভাপতি অধ্যাপক এ এন রাশেদা। এ পর্বটি সঞ্চালনা করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে।

আলোচনা সভায় অধ্যাপক সফিউদ্দিন বলেন, ‘সংবিধান এবং আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও এখনও সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। বিভিন্ন দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য স্থানের নামফলকে এখনও নির্বিচারে ব্যবহৃত হচ্ছে ইংরেজি ভাষা, যা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। এছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যমেও বাংলা ভাষাকে বিকৃতভাবে উচ্চারণ করে উপস্থাপন করা হচ্ছে।’

আলোচনা সভার পর শুরু হয় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। এ পর্বে দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে উদীচী তেজগাঁও শাখার শিল্পীরা। দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে উদীচী গুলশান শাখা। এছাড়া, একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি বেলায়েত হোসেন এবং বাচিক শিল্পী আশরাফুল আলম। সবশেষে ছিল উদীচীর প্রযোজনা গীতিনাট্য ‘ইতিহাস কথা কও’-এর প্রদর্শনী।

এর আগে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি রায়েরবাজার বধ্যভূমি এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কে শহীদ স্মরণ অনুষ্ঠান করে উদীচী। আদালত ও দাপ্তরিক কাজে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করাসহ কয়েকটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে পুরো ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে ভাষা অভিযাত্রা কর্মসূচি পালন করছে উদীচী।

শিল্পকলায় নানা আয়োজন : অমর একুশে উদযাপনের দুই দিনব্যাপী আয়োজনের সমাপনীতে বিকাল ৩টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে  বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষায় ১২টি মিশন ও দূতাবাসের পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে সঙ্গীত ও নৃত্য পরিবেশন করে ভুটান দূতাবাসের ৯ সদস্য বিশিষ্ট দল, একক সঙ্গীত পরিবেশন করে সুইডেনের রাষ্ট্রদূত ইয়োহান ফ্রিসেল, কবিতা আবৃত্তি করে চীনের ওয়াং কিংলিং, দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে ইন্দোনেশিয়ার শিশু দল, কবিতা আবৃত্তি করেন স্পেনের আমপারোপোর্তা, ইরানের ড. ফরহাদ দোরাউড গারিয়ান, সঙ্গীত পরিবেশন করে ফ্রান্সের ভিনসেন্ট মিয়ের, কবিতা আবৃত্তি করে কোরিয়ান দূতাবাসের সিওল পার্ক। ভারতের সন্তোশ কুমার মিশ্রা ও তার দল এবং ইন্টারন্যাশনাল তার্কিস হোপ স্কুলের দল সঙ্গীত পরিবেশন করেন। সবশেষে ২৫ টি দেশের ভাষায় সঙ্গীত পরিবেশন করে ঢাকা সাংস্কৃতিক দল।

সন্ধ্যা ৬টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণ নন্দনমঞ্চে পরিবেশিত হয় বিদেশি মিশন ও দূতাবাসের অংগ্রহণে এবং ঢাকা সাংস্কৃতিক দলের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এছাড়াও অনিক বোসের পরিচালনায় ‘রক্ত শিমুল তপ্ত পলাশ’, ‘আমার প্রতিবাদের ভাষা গানের’ ২টি সমবেত নৃত্য করে স্পন্দন, কণ্ঠশিল্পী ইয়াসমিন আলী সঙ্গীতে নৃত্য পরিবেশন করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নৃত্য দল।

অন্তর দেওয়ানের পরিচালনায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী চাকমা, ত্রিপুরা, বম, গারো, তঞ্চঙ্গী ও মারমা ৫টি সম্প্রদায়ের নৃত্য পরিবেশিত হয় এরপর। সমবেত সঙ্গীত পরিবেশনায় ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংগীত বিভাগ, সরকারি সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি সঙ্গীত দল, স্বপ্নবিকাশ কলা কেন্দ্র। এরপর গারো সঙ্গীত পরিবেশন করে সঞ্জীব দ্রং, মারমা গান করে শোয়ে শোয়ে ও মারমা এবং চাকমা গান পরিবেশন করে চৈতী চাকমা।

ঢাবিতে নাট্যোৎসব : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাত দিনব্যাপী ‘১১তম কেন্দ্রীয় বার্ষিক নাট্যৎসব’ শুরু হয়েছে মঙ্গলবার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থিয়েটার এন্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ এই উৎসব আয়োজন করেছে। উৎসব উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। নূর বলেন, ‘আজ একুশে ফেব্রুয়ারি এই ঘিরে ভাষা শহীদের শ্রদ্ধা জানাই। কিন্তু এইটাকে সারা বছর ধারণ করতে হবে।’ ঢাকা শহরে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের নাম ইংরেজিতে থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার এন্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান সুদীপ চক্রবর্তীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যএক্ষ অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দীন, কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আবু মো. দেলোয়ার হোসেন। উদ্বোধনী পর্ব শেষ ‘অভিনেত্রীর এক সাদা রাত্রি’ মঞ্চস্থ করে ওই বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীর্।া

 

Please follow and like us:
3