Published On: বুধবার ১৮ জুলাই, ২০১৮

দুনিয়া কাঁপানো অভিযান

শিশুস্বর্গ ডেস্ক : গোলে-বলে যেন এক চক্র। এই হলো ফুটবলের দুনিয়া। দুই পক্ষ। দুই প্রান্ত। নব্বই মিনিট। লড়াই আর লড়াই। তারপর জিত এবং হার। বৈরিতার অবসান। আবার বন্ধুতা। একতাই বল- সতীর্থ হলে এ তো অমিয় বাণীর মতো গ্রহণীয়। তাই দল বন্ধুত্ব ছাপিয়ে হয়ে যায় পরিবারের মতো। তো পরিবারের কারও জন্মদিনে যাপন করতে হয় সাড়ম্বরে। দলটি যদি হয় কিশোরদের, তাতে থাকবে আরো অনেক চমৎকৃত হওয়ার উপাদান। রোমাঞ্চকর কিছু একটা থাকা চাই-ই চাই। থাইল্যান্ডের শিশু-কিশোররা কি আর জগতের বাইরের কেউ! রোমাঞ্চের দুনিয়া তাদেরও নিশ্চয়ই হাতছানি দিয়ে ডেকে যায়। নইলে ১২ থাই কিশোরের ফুটবল দল কোচের নেতৃত্বে কেন যাবে চিয়াং রাই প্রদেশের ‘থাম লুয়াং’ গুহায়। ২৩ জুন এক সঙ্গীর জন্মদিন গুহার গভীরেই পালন করতে চেয়েছিল তারা। এর বেশি আর কিছু নয়। আনন্দের এ আবাহন যে তাদের মৃত্যুর খুব কাছ দেখিয়ে আনবে, তখন কি তারা আর সে কথা জানত।
যেভাবে বেঁচে ছিল তারা : গুহার ভেতর ১২ কিশোর ও তাদের কোচ ১৭ দিন ধরে আটকা পড়েছিল। ২৩ জুন তারা গুহায় ঢোকে। তাদের উদ্ধার পর্ব শেষ হয় ১০ জুলাই। পানিতে ডুবে যাওয়া গুহার ভেতর থেকে তাদের শেষ পর্যন্ত বের করে আনতে সক্ষম হন ডুবুরিরা। তাদের আটকে পড়া, বেঁচে থাকা এবং উদ্ধার করার কাহিনি সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। নিখোঁজ হওয়ার ৯ দিন পর তাদের সম্পর্কে প্রথম জানা গিয়েছিল। গুহার মুখে রেখে যাওয়া তাদের সাইকেলের সূত্র ধরে ব্রিটিশ ডুবুরিরা তাদের খুঁজে বের করেন। তখনই প্রথম জানা যায় যে তারা থাম লুয়াং নামের ওই গুহার আড়াই মাইলেরও বেশি গভীরে আটকা পড়ে আছে। গুহাটির কোথাও কোথাও এমনভাবে প্লাবিত হয়ে যায় যে সে পথ দিয়ে শিশুরা বের হয়ে আসতে পারছিল না। তাদের খোঁজ পাওয়ার আগে ৯ দিন ধরে এই ফুটবলারদের দলটিকে গুহার অন্ধকারের ভেতরে বেঁচে থাকতে হয়েছে। তাদের খোঁজে কীভাবে তল্লাশি চালানো হচ্ছে, সে সম্পর্কে তখন পর্যন্ত তাদের কোনো ধারণা ছিল না। কিন্তু এই এক সপ্তাহেরও বেশি সময় কীভাবে বেঁচে ছিল তারা? জানা যায়, পাহাড়ের ভেতরে চুইয়ে পড়া ফোঁটা ফোঁটা পানি, ওয়াইল্ড বোয়ার নামক ফুটবল দলের একজন সদস্যের জন্মদিন উপলক্ষে তারা যে স্ন্যাকস বা খাবারদাবার সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল সেসব খেয়ে এবং মেডিটেশন বা ধ্যান করেই তারা এত দিন নিজেদের জীবন রক্ষা করেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, প্রবল বৃষ্টির কারণে গুহার ভেতরে পানি ঢুকতে শুরু করলে তারা পালাতে পালাতে গুহার অনেক গভীরে চলে যায়।
এই কিশোর ফুটবলারদের কোচ একাপল চানতাওং, বাচ্চাদের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার কমে যাওয়ার আশঙ্কায় গুহার ভেতরে এসব খাবার খেতে রাজি হননি। ফলে ২ জুলাই ডুবুরিরা যখন এই ফুটবল দলটিকে গুহার ভেতরে খুঁজে পেলেন, তখন শারীরিকভাবে সবচেয়ে দুর্বল ছিলেন কোচ একাপল। সন্ধান পাওয়ার পর তাদের বাইরে থেকে খাবার দেওয়া শুরু হয়। এ প্রসঙ্গে উদ্ধারকারী দল থাই নেভি সিলের প্রধান অ্যাডমিরাল আরপাকর্ন ইওকোংকাওয়ে গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘এসব খাবারের মধ্যে রয়েছে সহজে হজম হয় এ রকম খাবার, শক্তিদায়ক খাদ্য, যেগুলোতে মিনারেল ও ভিটামিন মেশানো হয়েছে। চিকিৎসকদের পরামর্শেই তাদের এসব খাবার দেওয়া হয়।’ কিন্তু তার আগ পর্যন্ত জন্মদিনের খাবার খেয়েই বেঁচে ছিল তারা। কর্তৃপক্ষ এও বলেছে, গুহার দেয়াল থেকে যেসব পানি চুইয়ে চুইয়ে পড়েছে সেসব পানি পান করেছে বাচ্চারা। কারণ গুহায় প্লাবিত হয়ে যাওয়া বৃষ্টির পানি ছিল ঘোলা ও নোংরা।
ডুবুরি যারা… : কোনো গুহার ভেতরে উদ্ধার অভিযান চালানো সহজ কাজ হয় নয়। এটা একই সঙ্গে বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে ওই ডুবুরিকে এ ধরনের অভিযান পরিচালনায় অভিজ্ঞ ও পারদর্শী হতে হয়। থাইল্যান্ডের ওই গুহার উদ্ধার অভিযানে অন্তত ৯০ জন ডুবুরির একটি দল কাজ করেছে, যাদের ৫০ জনই এসেছেন বিভিন্ন দেশ থেকে। ওই আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দলের এমন কয়েকজন সাহসী ডুবুরির ব্যাপারে জানা যায়, যারা কিশোরদের বের করে আনতে নিজেদের জীবন ঝুঁঁকির মুখে ফেলেছেন। তাদের একজন বেন রেমেন্যান্ট। এই বেলজিয়ান নাগরিক মূলত ফুকেটে একটি ডুবুরির সরঞ্জামের দোকান পরিচালনা করেন। উদ্ধার অভিযানের প্রধান নারংসাক ওসোত্থানাকর্নের অধীনে তিনিও এই অভিযানে যোগ দিয়েছেন। ডেনমার্কের নাগরিক ক্লস রাসমুসেন এমনই আরেকজন ডুবুরি। তিনি রেমেন্যান্টের সঙ্গে ফুকেটের ওই ডুবুরির স্কুলে কাজ করেন।
আরেকজন এসেছেন ফিনল্যান্ড থেকে। তার নাম মিকো পাসি। তিনি এ উদ্ধার অভিযানে স্বেচ্ছাসেবক ডুবুরি হিসেবে কাজ করছেন। তিনি গুহার ভেতরের কিছু ছবি তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে শেয়ার করেন। তার মতোই আরেক স্বেচ্ছাসেবক ডুবুরি ডেন ইভান কারাজিচ। তিনি ডেনমার্কের নাগরিক। মিস্টার মিকোর সঙ্গে তিনি থাইল্যান্ডের ছোট আইল্যান্ড কোহ তাওতে একটি ডুবুরি বা ডাইভিংয়ের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিচালনা করেন। তারা দুজনই মূলত ডুবুরির প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। এর মধ্যে একটি হলো কেইভ ডাইভিং বা গুহার ভেতরে ডুব দিয়ে চলা। একই উদ্দেশ্যে অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছেন রিচার্ড হ্যারিস। তিনি পেশায় চিকিৎসক হলেও ডুবুরি হিসেবেও বেশ পারদর্শী। তিনি ঝুঁকি নিয়ে ওই গুহায় আটকে পড়াদের কাছে যান উদ্ধার অভিযান শুরুর আগেই তাদের জরুরি চিকিৎসা দিতে। ১০ বছরের ডুবুরির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি এ অভিযানে নামেন। তিনি একই সঙ্গে একজন এক্সিপিডিশন মেডিসিন এবং উদ্ধার অভিযানে অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ। যে ব্রিটিশ ডুবুরি সর্বপ্রথম ওই শিশুদের খোঁজ পান তার অনুরোধে তিনি এ অভিযানে যোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়া থাই নৌবাহিনীর একজন সাবেক ডুবুরি সামান গুনান মারা যাওয়ার ঘটনার মধ্য দিয়ে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে এই যাত্রা কতটা বিপজ্জনক ছিল। তিনি ৬ জুলাই গুহায় কিশোরদের অক্সিজেন ট্যাঙ্ক দিয়ে ফিরছিলেন। এ সময় পানির ভেতরেই অক্সিজেন ফুরিয়ে গেলে শ্বাসরোধ হয়ে মারা যান তিনি। প্রথমে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন, পরে তাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তার সহকর্মীরা গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, তাদের বন্ধুর এ আত্মত্যাগ তারা বৃথা যেতে দেবেন না।

বাড়ছে গুহার নিরাপত্তা : চিয়াং রাই প্রদেশের থাম লুয়াং গুহায় পর্যটকদের সুরক্ষার জন্য বাড়তি পূর্বসতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী প্রায়ুথ চান-ওচা। এ গুহাতেই কিশোর ফুটবল দলটি প্রায় ১৭ দিন আটকা পড়েছিল। ১০ জুলাই পুরো দলকে উদ্ধারের পরই প্রধানমন্ত্রী প্রায়ুথ চান-ওচা গুহার বাইরে ও ভেতরে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে গুহার প্রবেশমুখ ও বের হওয়ার পথে নজরদারি বাড়ানো হবে। এই গুহা এখন বিশ্ববিখ্যাত হয়ে গেছে। আমরা গুহার ভেতর আরও লাইট লাগাব এবং আরও সাইনবোর্ডের ব্যবস্থা করব।’ সবকিছু ঠিকঠাক করতে কিছুদিন গুহায় জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ রাখা হবে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘এটা একটি বিপজ্জনক গুহা।’ তবে যত বিপজ্জনকই হোক না কেন, গত দুই সপ্তাহে থাম লুয়াং গুহা যেভাবে সংবাদের শিরোনাম হয়েছে তাতে এর প্রতি পর্যটকদের আকর্ষণ স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। পর্যটকদের আরও আকৃষ্ট করতে গুহাটি নিয়ে প্রচার চালানোর পরিকল্পনার কথা গত সপ্তাহেই জানিয়েছিল থাইল্যান্ডের পর্যটন কর্তৃপক্ষ (টিএটি)। টিএটির প্রাদেশিক পরিচালক করুনা দিচাতিওয়াং বলেন, ‘গুহাটি এখন স্থানীয় ও বিদেশি উভয় পর্যটকদের কাছেই দারুণ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।’ থাইল্যান্ডের উত্তরের পাহাড়ি অঞ্চলে অনেক গুহা আছে। যেগুলোর বেশ কয়েকটিতে এখনও মানুষের পা পড়েনি।

Videos