মঙ্গল. অক্টো ১৫, ২০১৯

দুই অর্থবছরে দুই ব্যাংকের ১৯০ কোটি টাকা মন্দ ঋণ

দুই অর্থবছরে দুই ব্যাংকের ১৯০ কোটি টাকা মন্দ ঋণ

Last Updated on

দুই ব্যাংকের প্রায় ১৯০ কোটি টাকার মন্দ ঋণের অডিট আপত্তি পেয়েছে সংসদীয় কমিটি। জনতা ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের দুই অর্থবছরে এসব অডিট আপত্তি পাওয়া গেছে।
ব্যাংক দুটির গ্রাহকের কারো কারো ব্যবসায়িক লেনদেন সন্তোষজনক না হলেও ঋণ দেয়া হয়েছে। আবার কারো কারো ব্যবসার অস্তিত্ব না থাকলেও তাদেরকে ঋণ দেয়া হয়েছে। কেউবা একই ব্যবসার নামে একাধিকার বার ঋণ নিয়েছেন। আর এসব ঘটেছে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের যোগসাজসে।
এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি আগামী তিন মাসের মধ্যে অডিট আপত্তিগুলো নিষ্পত্তির সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি। একই সঙ্গে নিষ্পত্তি করা হলো কি-না তাও জানাতে বলেছে কমিটি।
বৃহস্পতিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ২০১২-১৩ অর্থ বছরের হিসাব সম্পর্কিত মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের বার্ষিক অডিট রিপোর্ট ২০১৩-১৪ এর অডিট আপত্তির অনুচ্ছেদ ১, ২, ৩, ৪, ৫ ও ১৩ নিয়ে আলোচনা হয় এবং অডিট আপত্তিগুলো কমিটি কর্তৃক প্রদত্ত নির্দেশনার আলোকে নিষ্পত্তির সুপারিশ করা হয়।
বৈঠকে গ্রাহকের ব্যবসায়িক লেনদেন সন্তোষজনক নয় তবুও সীমাতিরিক্ত দায় রেখে সিসি (হাইপে) ঋণ নবায়ন এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও গ্রাহকের অনুকূলে বিতরণ করা সিসি (হাইপো) ঋণের সীমাতিরিক্ত দায় স্থিতি রেখে এলটিআর (লোন অ্যাগেইনস্ট ট্রাস্ট রিসিট) ঋণ সৃষ্টি করায় মেয়াদোত্তীর্ণ ও ক্ষতি হিসেবে শ্রেণি বিন্যাসিত হওয়ায় ব্যাংকের অনাদায়ী ১৩ কোটি ৯৫ লাখ ৭০ হাজার ৭৬০ টাকা মর্মে উত্থাপিত অডিট আপত্তি পেয়েছে কমিটি।
আর এ কাজটি করেছে রাজধানীর মতিঝিলের জনতা ব্যাংকের কর্পোরেট শাখা। মেসার্স কোয়ালিটি টিম্বার ইন্ড্রান্ট্রিজকে এ ঋণ দেয়া হয়। ঋণের শর্তানুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে টাকা পরিশোধ করার কথা থাকলেও ওইসব টাকা এখনও পরিশোধ করা হয়নি।
কমিটি চেক ক্যাশ না হওয়াকে প্রতারণা হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং দুই মাসের মধ্যে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অনধিক তিন মাসের মধ্যে অনাদায়ী টাকা আদায়ের ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে।
বৈঠক সূত্র জানায়, জনতা ব্যাংকে বরিশাল শাখা থেকে মাহদী এন্টারপ্রাইজকে রড, সিমেন্ট ব্যবসায়ের উদ্দেশে সিসি (হাইপো) ঋণ প্রদান করা হলেও বর্তমানে ব্যবসা বন্ধ এবং প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্ব নাই। ফলে ঋণটি কু-ঋণে পরিণত হয়েছে। আর ক্ষতি হয় ৯২ লাখ ২৬ হাজার ৫২৭ টাকা। মেসার্স মাহদী এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স কালাম এন্টারপ্রাইজকে রড, সিমেন্ট ব্যবসার জন্য সিসি (হাইপো) ঋণ দেয়া হলেও বর্তমানে ব্যবসা বন্ধ। দোকানপাটের কোনো অস্তিত্ব নেই।
এ অডিট আপত্তির প্রেক্ষিতে কমিটি চলমান মামলা নিবিড় তদারকির সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি জামানতকৃত সম্পদ বিক্রয় করে অনাদায়ী টাকা আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে কমিটির সভাপতি মো. রুস্তম আলী ফরাজী জাগো নিউজকে বলেন, ব্যাংকের কর্মকর্তারা এসব দুর্নীতিতে জড়িত। তাই ওই সময় যারা দায়িত্বে ছিলেন তাদের সবাইকে জেলে ঢুকানো উচিত।
সূত্র আরও জানায়, ওই একই ব্যাংক। তবে স্থান খুলনার খান এ সবুর কর্পোরেট শাখা। ঋণ দেয়ার সময় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ঋণ গ্রহীতা ও প্রকল্প নির্বাচনে অদূরদর্শিতার কারণে গ্রাহকের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন এবং ঋণটি দীর্ঘদিন যাবৎ অনাদায়ী থাকায় শ্রেণিকৃত ঋণে পরিণত হয়েছে। এতে ক্ষতি ৪ কোটি ১৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৫৭ টাকা, জাহান জুট মিল এ ঋণ নিয়েছিল। তাদের ঋণ দেয়ার সময় কোনো জামানতও রাখা হয়নি। জানা যায়, এদের বিরুদ্ধে এখনও কোনো মামলা হয়নি, তবে প্রস্ততি চলছে।
কমিটির সভাপতি মো. রুস্তম আলী ফরাজী বলেছেন, কত বছর কেটে গেছে এখনও মামলা হয়নি। এতেই বোঝা যায় কর্মকর্তারাও চান না দোষীদের শাস্তি হোক।
অন্যদিকে রাজশাহীর জনতা কর্পোরেট শাখা থেকে একই মালিকানাধীন একাধিক প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ঋণ দেয়া হয়েছে। চলতি মূলধন ঋণ মঞ্জুর ও বিতরণের পর ঋণের টাকা পরিশোধ না করা সত্ত্বেও বার বার পুনঃতফসিল সুবিধা দেয়া হয়েছে। ঋণের টাকা আদায় না হওয়ায় খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে ৮ কোটি ৯৭ লাখ ৬ হাজার টাকা। নিউ উত্তরা ও আসমা কোন্ড স্টোরেজের অনুকূলে একই ব্যক্তি বার বার ঋণ নিয়েছেন।
এছাড়া চট্টগ্রামের লালদীঘি জনতা ব্যাংকের ইস্ট কর্পোরেট শাখা থেকে এলসির মাধ্যমে আমদানিকৃত ক্রুড পাম ওয়েলের জাহাজি দলিলপত্র ছাড় করানোর জন্য সহায়ক জামানত ছাড়াই ঋণ বা লোন অ্যাগেইনেস্ট ট্রাস্ট রিসিপ্টের (এলটিআর) ঋণ মঞ্জুর করা হয়। মঞ্জুরকৃত ঋণ মেয়াদোত্তীর্ণ, অনাদায়ী এবং মন্দ ঋণে পরিণত হয়। এ জন্য ক্ষতি হয় ৮৬ কোটি ৬৮ লাখ ৮৬ হাজার ৬৩ টাকা। নুর জাহান সুপার অয়েল লি. এ ঋণ নেয়।
আর বাংলাদেশে ডেপেলপমেন্ট ব্যাংকের ঢাকার প্রধান কার্যালয় থেকে যাচাই বাছাই না করে এমএম ভেজিটেবল অয়েল প্রোডাক্টকে এলটিআর সুবিধা দেয়া হয়। এটিও এক সময় মন্দ ঋণে পরিণত হয়। এতে ব্যাংকটির ক্ষতি ৭৫ কোটি ৭৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
কমিটির সভাপতি মো. রুস্তম আলী ফরাজীর সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্য ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, আবুল কালাম আজাদ, মো. আব্দুস শহীদ, র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, সালমান ফজলুর রহমান, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, মনজুর হোসেন, আহসানুল ইসলাম (টিটু), বেগম ওয়াসিকা আয়েশা খান এবং মো. জাহিদুর রহমান অংশগ্রহণ করেন।
বৈঠকে সি অ্যান্ড এজি মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলাম, বাংলাদেশ ব্যাংক, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, অডিট অফিস এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Please follow and like us:
2