দিলওয়ার : গণমানুষ ও চিরসঙ্গের কবি

দিলওয়ার : গণমানুষ

রুদ্র মিজান : শীতের সকাল পেরিয়ে দুপুর। আড্ডা দিচ্ছিলাম কবি দিলওয়ারের সঙ্গে। ভার্থখলাস্থ তাঁর বাসভবনে। তারপর খেতে হলো, বলতে হয় জোর করেই খাওয়ালেন দুপুরের খাবার। সেই দুপুরে একটি প্রজাপতি এসে বসেছিল কবির ঘরের ভেতরে। আমাদের পাশে। কবি হাসলেন। বললেন, প্রজাপতির আগমন একটা ভালো বার্তা বহন করছে নিশ্চয়ই। গৃহে প্রজাপতি বলে কথা!
সেই প্রজাপতি এখন কোথায় আছে জানি না। জানি না, না ফেরার দেশে কেমন আছেন প্রিয় কবি। প্রজাপতির মতই চলে গেলেন তিনি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামী সেনাপতি হিসেবে নিশ্চয়ই প্রভুর কাছ থেকে পুরস্কার লাভ করবেন কবি। কবি দিলওয়ার একটি লেখায় বলেছেন, ‘মানুষ যে দিন বুঝতে পারলো তার একটি সমাপ্তি আছে, যে সমাপ্তিকে পার্থিব কোনো কিছুই রুখতে পারবে না। তখন থেকেই মানুষ তার স্বরূপ সন্ধানে যাত্রা শুরু করে।’
সত্যি মানুষের সমাপ্তি আছে! দিলওয়ার এই দার্শনিক সত্যকে শুধু জানতেন তা নয় তিনি ওই সত্যকে জেনেই আলো প্রজ্জ্বলন করেছেন। সুরমা তীর থেকে শুরু করে তাঁর আলোকবর্তিকা পৌঁছে গেছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা বাঙলাবাসীদের কাছে। কবি লিখেছেন, ‘পৃথিবী স্বদেশ যার আমি তার সঙ্গী চিরদিন।’
দিলওয়ার বাংলা সাহিত্যের জন্য এক ঐশ্বরিক আর্শীবাদ। তিনি গ্রীক, রোম থেকে শুরু করে ভারতীয় পুরাণকে তৃতীয় দৃষ্টির আলোকে প্রকাশ করেছেন তাঁর কবিতায়। যা এই প্রজন্মকে হাজার-হাজার বছর আগের অতীত ঐতিহ্যের মুখোমুখি নিয়ে যায়। আড়াই হাজার বছর আগে রচিত নাটক ‘ওয়াদিপাস তিরোন্নাস’র নাট্যকার সফোক্লিস স্মরণে যেমন লিখেছেন তেমনি কবি গ্যেটে স্মরণে তিনি লিখেছেন, ‘কবি গ্যেটে মনে এসে তাঁর বুক আমাকে দেখান/ আমি নিরীক্ষণ করি হৃৎপি-ে রক্ত চলাচল/ মেফিস্টোফেলিস দূরে মুক্ত রাখে কুটিল কৌশল/ ইউরো ও ডলার হাতে খেলা করে ফেরশতা স্যাটান/ বিধাতার অঙ্গরাজ্যে পরিণামে কবি ও কবিতা/ একমাত্র উপাসনা/ মানবিক আলোর সবিতা।’
কবি দিলওয়ারকে স্থান, কাল ও বিশেষ কোনো সম্প্রদায় আবদ্ধ করে রাখতে পারে নি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় উচ্চারণ করেছেন, ‘বীর্য আমার আর্য অনার্যেই/ আমারই জাতক সেমিটিক হামিটিক/ আমিই আদিম/ চলিষ্ণু আধুনিক।’
বৃহস্পতিবার দুপুরে যখন সিলেটের ভার্থখলাস্থ কবির বাসভবনে সাদা কাপড়ে ঢাকা তাঁরই মৃতদেহ দেখলাম তখন বারংবার মনে হচ্ছিল, জীবনের সমাপ্তি আছে! আমি কী তার কানের কাছে গিয়ে ডাকবো। বুঝতে পারছিলাম না কী করবো। কবি কী আমাকে গ্রিক সাহিত্যের অনুবাদ শোনাবেন এখন। জানতে চাইবেন কি, কতগুলো গল্প পড়লে, কোন কোন লেখকের! না কিছুই জানতে চান না তিনি। কবির নিথর শরীর। তাঁর হাত দুটো নড়ে না। আমার মাথায় হাত রেখে বলেন না, ভাই, পৃথিবী সংগ্রামের জায়গা। তোমাকে লড়তেই হবে।
কবি দিলওয়ারের জন্ম সিলেটের সুরমা নদীর দক্ষিণ তীরে ভার্থখলা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। রক্ষণশীল ওই পরিবারে জন্ম হলেও প্রগতিশীল প্রতিটি আন্দোলনেই তিনি ছিলেন সোচ্চার। প্রতিবাদী। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রতিটি প্রগতিশীল-গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন কবি দিলওয়ার। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন ঘোষণা করলেন ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। ঠিক তখন বাংলা সাহিত্যের এ কবির চেতনায় অগ্নিস্ফূরণ ঘটে। কবি দিলওয়ার লিখেছেন ‘পৃথিবী স্বদেশ যার/ আমি তার সঙ্গী চিরদিন।’
কবি দিলওয়ারের বয়স তখন পনের। এই বয়সেই কবি হিসেবে পরিচিতি ঘটেছে তাঁর। এ প্রসঙ্গে কবি দিলওয়ার বলেন ‘উর্দু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে এ ঘোষণায় আমি শুধু মর্মাহত হই নি, আমার মাঝে এক প্রকার দ্রোহ সৃষ্টি হয়েছিলো।’
তিনি বলেন ‘ভার্থখলাগ্রামে ন্যাপের এক নেতা ছিলেন। তাঁর নাম আব্দুল বারী চান মিয়া। তিনি আমাকে দামান বলেন সম্বোধন করতেন। তাঁর একটি দোকান ছিল। আমি ওই দোকানে নিয়মিত যাওয়া-আসা করতাম। প্রগতিশীল ওই মানুষটির সাথে আমার বেশ সখ্য ছিল। ১৯৫১ সালের কথা। একদিন সকালে তাঁর দোকানে গেলাম। তখন এক বৃদ্ধ লোক ওই দোকানে বসা ছিলেন। আমি দোকানে গিয়েই বললাম, জিন্নাহ সাহেব যে ঘোষণা দিলেন আমারতো তা পছন্দ হলো না। তিনি এটি ঠিক করেন নি। এ কথা বলতেই দোকানে বসা সাদা দাঁড়িওয়ালা ওই ভদ্রলোক অগ্নিমূর্তি হয়ে চেয়ার হাতে তেড়ে আসলেন… বললেন-কিতা কইলেরে…’ (কি বললিরে)।
এ প্রসঙ্গে কবি দিলওয়ার আরও বলেন ‘অনেকে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর অন্ধ ভক্ত ছিল। বাংলা ভাষা চর্চা থেকে বিরত ছিল অনেক পরিবার। তাঁরা আরবি-ফার্সি আর উর্দু ছাড়া অন্য কোনো ভাষা জানতেন না। জানার প্রয়োজন বোধও করতেন না।’
ভাষা আন্দোলনে নিজের অংশগ্রহণ সম্পর্কে তিনি বলেন ‘প্রাণের তাগিদেই বাংলা ভাষা আন্দোলনে সিলেটে আমি সক্রিয় ছিলাম। যদিও আমার বড় ভাই আমাকে চোখে-চোখে রাখতেন। অনেক প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে আমি দেশ ও ভাষার সংগ্রামে অটুট ছিলাম। এখনও আছি।’
বোধোদয়ের পর থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী দিলওয়ার। পুত্রের এই প্রতিবাদী মানসিকতায় চিন্তিত ছিলেন কবিমাতা রহিমুন্নেসা। পারিবারিক বাধা-বিপত্তি এমনকি অসুস্থতাও তাঁকে থামাতে পারে নি। কবি দিলওয়ার বলেন ‘১৯৫৩ সালে ভার্থখলাস্থ সিফত উল্লাহর টং দোকানে বসে মহান একুশে ফেব্রুয়ারি পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। হঠাৎ বড় ভাই আসলেন। বললেন, এই দিলু, এখানে কী করিস? আয় বের হয়ে আয়।’ কবি দিলওয়ার বলেন ‘আমার তখন কান্না পাচ্ছিল। গোলাম রব্বানী ও শামসুদ্দিন ভাই বললেন-যাও..।’
সিলেটে ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ভাষা আন্দোলনে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতেন। এসব কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন দিলওয়ার। পরবর্তীতে ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান। এসব স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কবি দিলওয়ার বলেন ‘ওই সময়েই আমি লিখি, আয়রে চাষী মজুর কুলি মেথর কুমার কামার/ বাংলা ভাষা ডাক দিয়েছে বাংলা তোমার-আমার।’
ছাত্র ইউনিয়ন পরে ন্যাপ নেতা গুলজার আহমদের স্মৃতি চারণ করে কবি দিলওয়ার বলেন ‘১৯৬৮ সালের কথা। জিন্দাবাজারে দেখা হয় তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়নের প্রভাবশালী নেতা গুলজার আহমদের সাথে। তিনি থু থু ফেলে দেখান তাঁর মুখ থেকে রক্ত বের হচ্ছে। গুলজার ভাই এক সংগ্রামী মানুষ। মা-বাবার একমাত্র পুত্র। বিত্তশালী পরিবারের সন্তান হয়েও উপোস থেকেছেন। শ্রম দিয়েছেন। অবিরত সংগ্রাম করেছেন। ইতিহাস তাঁকে ভুলবে না। তোফায়েল আহমদ, সদ্য প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাক, সিরাজুল আলম খানের চেয়েও অনেক ভালো নেতৃত্বের অধিকারী গুলজার ভাই। ওই বছরেই ঢাকা মহাখালীতে আমার বাসায় (সরকারি কোয়ার্টার) আসলেন তিনি। হতাশা প্রকাশ করে বললেন, মা ডেকেছেন সিলেটে চলে যাব। আমি আর রাজনীতি করবো না। আইয়ূব সরকার পতন ঘটনো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’
কবি দিলওয়ার এ প্রসঙ্গে আরও বলেন ‘আমি তাঁকে বলি, আমি স্বপ্নে দেখেছি একটি বিড়ালকে এক অত্যাচারী ব্যক্তি চাবুক দিয়ে পেটাচ্ছে। একপর্যায়ে বিড়ালটি তাঁকে কামড় দিয়ে আহত করে প্রাণে রক্ষা পায়। এই স্বপ্নের কথা শুনিয়ে আমি তাঁকে বলি, আমার দৃঢ় বিশ্বাস একটি বড় পরিবর্তন আসবে।’
১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধ প্রতিরোধ সম্পর্কে তিনি বলেন ‘যুদ্ধ করার জন্য সুধীজনের একটি সভা হয়। ওই সভায় পীর হবিবুর রহমান, দেওয়ান বাসিত, দেওয়ান রব, বিমলেন্দু দে সাধু বাবু, মুসলিম লীগ নেতা মনির উদ্দিন আহমদ উপস্থিত ছিলেন। সেখানে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এতে আমাকে প্রচার দপ্তরের দায়িত্ব প্রদানের প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু আমার মামা মনির উদ্দিন আহমদ ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, কবি দিলওয়ার আমার ভাগ্নে, শুয়োরের বাচ্চা। এই খবরটি দ্রুত আমার কাছে পৌঁছে যায়।’
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে কবি দিলওয়ার আরও বলেন ‘ওই সময়ে আমার বন্ধু গণসঙ্গীত শিল্পী শামসুদ্দিন আহমেদ একটি গান করতো। সে গানটি ছিলো, কাউয়ায় ধান খাইলোরে খেদাইবার মানুষ নাই…।’
ভাষা আন্দোলন নিয়ে কবি দিলওয়ারের বিখ্যাত গান ‘সখিনারে প্রাণের সখিনা’ সম্পর্কে তিনি বলেন ‘আশির দশকে ঢাকায় রমনার বটমূলে একটি অনুষ্ঠান দেখতে যাই। ওই অনুষ্ঠানে পরিচয় হয় শিল্পী ফকির আলমগীরের সাথে। ফকির আলমগীর আমার কাছে একটি গান চাইলেন। আমি তাৎক্ষণিকভাবে লিখে দেই ‘সখিনারে প্রাণের সখিনা ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ/ তোর সাথে মোর পিরিতের বীজ/ লাগলো হাওয়া দেশ জুড়িয়া/ বয়রে দখিণা।’ পরে ওই গানটি তাঁর অ্যালবামের মাধ্যমে বাজারজাত হয়।’
বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি সম্পর্কে কবি দিলওয়ার বলেন ‘বাংলা ভাষা আন্দোলন এবং মহান স্বাধীনতার এত বছর পরে আজ আমরা দুর্নীতিগ্রস্ত কেন, আমাদের বুদ্ধিজীবীরা কোনপথে? মাতৃভাষার জন্য যে জাতি প্রাণ দিতে পারে তাঁরা পিছিয়ে থাকবে কেন। এই গলদটি খুঁজে দেখার দায়িত্ব কাদের? কেন শেয়ারবাজারে পুঁজি হারিয়ে মানুষ আজ আত্মহত্যা করছে?’
১৯৩৭ সালের ১ জানুয়ারি সিলেট জেলার দক্ষিণ সুরমার ভার্থখলাস্থ পৈতৃক নিবাস ‘খান মঞ্জিল’-এ জন্মগ্রহণ করেন কবি দিলওয়ার। তার বাবা মৌলভী হাসান খান এবং মা রহিমুন্নেসা খাতুন। দিলওয়ার এদেশের একজন অন্যতম প্রধান কবি। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মননের কথা তার কবিতায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে উঠে এসেছে বলে তাকে গণমানুষের কবি বলা হয়। দিলওয়ার বলতেন, আদি গণমানবের উত্তরাধীকারী হিসেবেই আমি গণমানুষের কবি। সাংবাদিক হিসেবেও রয়েছে কবি দিলওয়ারের পরিচিতি। ১৯৬৭ সালে দৈনিক সংবাদের সহকারী সম্পাদক হিসেবে সাংবাদিকতা শুরু করেন কবি দিলওয়ার। ৯৭৩-৭৪ সালে তিনি গণকণ্ঠের সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। মহান ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে রয়েছে তাঁর অনন্য ভূমিকা। ২০০৮ সালে সাহিত্যে অবদানের জন্য কবি দিলওয়ারকে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ একুশে পদক প্রদান করা হয়। তার আগে তিনি ১৯৮০ সালে কবিতায় বাংলা একাডেমী পুরস্কার লাভ করেন।
গণমানুষের এই কবির মৃত্যুতে তাঁর প্রতি গভীর শোক ও ভালোবাসার জানান দিয়ে যাইÍ ভালো থেকো কবি, তোমার সবটুকু বেঁচে থাকা ধরে আছি আমরা, যারা তোমার ‘সঙ্গী চিরদিন’…

Please follow and like us:
0