মঙ্গল. জানু ২১, ২০২০

থামতে জানাটাও সাফল্যেরই অংশ

থামতে জানাটাও সাফল্যেরই অংশ

Last Updated on

প্রভাষ আমিন : রোববার থেকে বৃহস্পতিবার- টানা পাঁচ দিন ছোঁ ছোঁ শিক্ষার্থীরা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, দেশটা ঠিকমত চলছে না। সেই দেশটাকে মেরামত করতে তারা ক্লাস ফেলে রাস্তায় নেমে এসেছে। সহপাঠীরা যখন বাসের চাপায় থেতলানো মাংসের দলা হয়ে যায়, তখন আসলে তাদের পক্ষে ক্লাসে মনোযোগ দেয়া সম্ভব হয় না। তারা নেমে আসে রাজপথে। অদৃশ্য হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার ডাকে পিলপিল ছেলেরা, মেয়েরা, শিশুরা রাস্তায় নেমে এসেছে। অন্য আন্দোলনে মানুষ রাস্তায় নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে। আর এবার শিক্ষার্থীরা নেমেছে শৃঙ্খলা ফেরাতে। প্রথম দুদিন আবেগের বশে বেশকিছু বাস ভাংচুর করলেও পরে আন্দোলনটি পুরো অহিংস রূপ নেয়। গত পাঁচ দিন রাজধানী ছিল অচেনা। শিশুরাজ্যে ছিল আমাদের বাস। দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে থেকেও মানুষের মুখে বিরক্তি নেই। হাসিমুখেই সবাই হাঁটছে। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েরা রাস্তা পরিষ্কার করছে, রিকশাওয়ালাদের এক লাইনে যাওয়া শেখাচ্ছে। গাড়ির কাগজপত্র চেক করছে। তাদের কাছে সবাই সমান। উল্টাপথে এসেও ফিরে যেতে হয়েছে তোফায়েল আহমদের মতো দাপুটে মন্ত্রীকে, গাড়ি থেকে নেমে যেতে হয়েছে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর মতো প্রভাবশালীকে। পুলিশ, সাংবাদিক, বিচারপতি কারও গাড়িই রেহাই পায়নি শিক্ষার্থীদের কবল থেকে। বাচ্চারা আসলে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, তোমরা ভুল। ওভাবে আর নয়, এখন থেকে এভাবে চলতে হবে। অসাধারণ-শ্বাসরুদ্ধকর এক সময় পার করছে বাংলাদেশ।
সরকারও শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবির যৌক্তিকতা মেনে নিয়েছে। পর্যায়ক্রমে দাবি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কঠোর শাস্তির বিধান রেখে আইন হচ্ছে। নিহত দু’জনের পরিবারকে ডেকে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাদের ২০ লাখ করে টাকা দিয়েছেন। আহতদের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছে সরকার। শহীদ রমিজউদ্দিন স্কুলকে ৫টি বাস দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ, স্পিডব্রেকার নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আমি নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের পদত্যাগ নয়, অপসারণ চাই। কিন্তু, শিক্ষার্থীদের ৯ দফায় শাজাহান খানের পদত্যাগ নয়, নিঃশর্ত ক্ষমার দাবি ছিল। যদিও আমার স্টাইল পছন্দ হয়নি। তবুও তিনি ক্ষমা চেয়েছেন, দিয়ার বাসায় গেছেন। এখন বোধহয় সময় এসেছে থামার। কারণ, থামতে জানাটাও আন্দোলনের সাফল্যেরই অংশ। তবে সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে দুটি শঙ্কার কথা বলতে চাই। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে পুলিশ প্রশংসনীয় সংযমের পরিচয় দিয়েছে। সরকারও পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিল, কেউ যেন বাচ্চাদের গায়ে হাত না তোলে। তবে এরপরও পঞ্চম দিনে মিরপুরে শিক্ষার্থীদের পুলিশ এবং ছাত্রলীগ নামধারীদের হামলা অনাকাক্সিক্ষত, অনভিপ্রেত।
যারা এটি ঘটিয়েছে, তাদের খুঁজে বের করে শাস্তি দিতে হবে। এ ধরনের ঘটনা যেন আর একটিও না ঘটে। আরেকটি শঙ্কা, আন্দোলনে অংশ নেয়ার অপরাধে নাকি ছাত্রদের টিসি দেয়ার হুমকি দেয়া হচ্ছে। রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল ও কলেজ থেকে নাকি ৪৭ জনকে বের করে দেয়া হয়েছে। এ ধরনের একটি ঘটনাও যাতে না ঘটে, আন্দোলন করার জন্য যেন কেউ ভিকটিম না হয়; তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। ঘরে ফেরা প্রসঙ্গে ফেসবুকে পাওয়া একটি বার্তা উদ্ধৃত করছি, ‘আশা করি, সবুজরা এবার ঘরে ফিরবে, শিক্ষাঙ্গনে ফিরবে। বিশ্বাস করি, নিশ্চয়ই তারা যাবতীয় অনিয়ম-দুর্নীতি থেকে নিজেদের দূরে রাখবে আজীবন, প্রলোভনে পা দেবে না, মাদক নির্মূলে কাজ করবে। এদের কেউ জঙ্গি-রগ কাটার-হাতুড়াওয়ালা হবে না। বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন করবে, পরিবারকে দুর্নীতি থেকে বাঁচাবে। বৃদ্ধাশ্রমে নয়, দাদা-দাদি, নানা-নানি এবং মা-বাবাকে ঘরে যতেœ রাখবে। বাবার অসদাচরণ-অত্যাচার থেকে মাকে বাঁচাবে, গৃহকর্মীদের প্রতি মানবিক হবে। নারী-শিশুসহ সবার প্রতি ভালো ব্যবহার করবে। ভালো সন্তান, ভালো স্বামী, ভালো সহকর্মী, সত্যিকারের বন্ধুরূপে থাকবে। ইভটিজিং, প্রশ্ন ফাঁসে জড়াবে না, চাকরির জন্য ঘুষের লেনদেন করবে না। ‘রেপ’ বলে কিছু থাকবে না দেশে, রেপিস্টদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করবে। ডাস্টবিনের বাইরে ময়লা ফেলবে না, বয়স্কদের নিয়ে হাসি-তামাশা করবে না। সারাক্ষণ মোবাইলে চোখ না রেখে সামনের মানুষগুলোর চোখে তাকাবে, হাসবে, মুগ্ধ হবে। ওরা নিশ্চয়ই বুঝবে: জাস্টিস শুধু পাওয়ার নয়, দেওয়ারও!’ তবে ঘরে ফিরে যাওয়া মানেই কিন্তু আন্দোলন শেষ নয়। বরং যে মহৎ আন্দোলনের সূচনা তারা করেছে, তা দেশকে নিতে পারে, আরও ভালোর দিকে। ফারজানা করিম ফেসবুকে লিখেছেন, ‘ওরা ভীষণ নিয়ন্ত্রিত ছিল। নিজেরাই নিজেদের ভালো-মন্দ বুঝতে পারছিল। শৃঙ্খলাবদ্ধ ছিল দারুণভাবে। পাশের বাচ্চাটিকে জিজ্ঞেস করলাম, ধৈর্য ধরে আন্দোলন চালিয়ে যেতে পারবে তো? বললো, অবশ্যই। প্রচ- আত্মবিশ্বাস তার স্বরে। বললাম, এখানেই থেমে যেও না। আরও অনেক কিছু করতে হবে। স্কুল থেকে শিক্ষকদের বলবে রোস্টার করে দিতে। একেক দিন একেকটা গ্রুপ করে রাস্তা পরিষ্কারে নামবে, গাছ লাগাবে, প্রতিবন্ধী মানুষদের সহায়তা করবে, দুস্থ শিশুদের সাহায্য করবে। এগুলো স্কুলে নিয়ম করে দিতে বলবে। কারোর রাস্তায় ফেলা চিপসের প্যাকেট যখন তুমি কুড়িয়ে আনবে সে লজ্জা পাবে। এভাবে মানুষকে লজ্জা দিতে পারবে তো? মানুষ কিন্তু ভালো হতে চায়। মানুষকে ভালো হবার সুযোগ করে দিতে পারবে তো? মায়ের বদলে একদিন করে তুমি ঘর পরিষ্কার করবে। রান্না করবে। করবে তো? আমাদের যা সাহস হয়নি তা তোমরা করে দেখিয়ে দিয়েছো। আমাদের ভয় ভেঙে দিয়েছো। যুগে যুগে তোমরাই আলো জ্বালাবে। একটুও পিছিয়ে যেও না।’ সত্যি এবার সময় এসেছে ক্লাসে ফিরে যাওয়ার। তবে রাষ্ট্রকে বদলানোর কাজ যেন থেমে না যায়। বিশৃঙ্খলা তো শুধু রাস্তায় নয়, বিভিন্ন স্তরে রয়েছে। শিশুদের দেখানো পথে শৃঙ্খলা আনতে হবে সব জায়গায়। তবে সময়মতো থামতে জানাটা কিন্তু চলার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। থামাটাও কিন্তু আন্দোলনের সাফল্যেরই অংশ। সময়মতো থামতে পারেনি বলে গণজাগরণ মঞ্চের মতো মহৎ আন্দোলনে নানান রং চড়ানো গেছে। ৫ দিনের মধ্যে অন্তত দুদিন আমি অবরোধে হেঁটে অফিসে গেছি। শিক্ষার্থীদের সাথে রাজপথে হেঁটেছি, খুব আনন্দের সাথে। সাধারণ মানুষও হাসিমুখে দুর্ভোগ মেনে নিচ্ছে। তবে কতদিন মানবে? মানুষ বিরক্ত হওয়ার আগেই কিন্তু থামতে হবে। লেবু বেশি চিপলে তিতা হয়ে যায়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে দৃঢ় কমিটমেন্ট, স্বচ্ছ ও সৎ মনোবল থাকলেও কোনো নেতা নেই, কারও কমান্ড নেই, প্লাটফরম নেই। তাই এ আন্দোলনে বিভ্রান্তি ছড়ানো, স্যাবোটাজ করা সহজ।
বুধবার হবিগঞ্জ থেকে আসা এক কলেজছাত্র গাড়ি ভাংচুর শুরু করলে আন্দোলনকারীরা তাকে পুলিশে দেয়। প্রথমে নিজেকে ছাত্রলীগ দাবি করলেও পরে স্বীকার করেছে বাঁচার জন্য এ পরিচয় দিয়েছে। এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্যাবোটাজের আশঙ্কার কথা বলেছেন। স্যাবোটাজ ভেতর থেকে হতে পারে, জামাত-শিবির করতে পারে, জঙ্গিরা করতে পারে, এমনকি ছাত্রলীগও করতে পারে। তাই অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ আপনার সন্তানকে ঘরে ফিরিয়ে নিন। তাদের দাবির সাথে সবাই একমত। কোটি মানুষ তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। আন্দোলন পুরোপুরিই সফল। এখন আন্দোলনের ফসল ঘরে তোলার পালা। সব দাবি মেনে নেয়ার পরও যারা এদের মাঠে রাখতে চায়, তাদের ভিন্ন উদ্দেশ্য আছে। এরপর তাদের সামনে রেখে কেউ রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চাইতে পারে। সতর্ক থাকবেন, আপনার-আমার সন্তান যেন কারও রাজনীতির গুটি না হয়। তবে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের- রাজপথে এবং স্কুলে। নিরাপদ হোক সড়ক, নিরাপদ হোক দেশ।
লেখক : সাংবাদিক, কলাম লেখক।
ঢ়ৎড়নযধংয২০০০@মসধরষ.পড়স

Please follow and like us:
3