সোম. ডিসে ৯, ২০১৯

তন্ময়তার তরল নদী

তন্ময়তার তরল নদী

Last Updated on

মুহিম মনির : ‘আগুনের শিখাগুলো নড়ছে এদিক সেদিক মৃদু বাতাসে, জিভ দিয়ে চেটে যাচ্ছে স্তেপের আদিগন্ত শূন্যতার গাল। কাঠ পোড়ানোর গন্ধে ভরে উঠছে চারদিক, ধোঁয়া এসে চোখে ঘষে যাচ্ছে অশিষ্ট হাত। আকাশের চাঁদ, পূর্ণচন্দ্র নয় কিন্তু প্রায় কাছাকাছি, আঠারো নয় ষোলো বছরের নারীর মতো। আমার মাথায় একটা বোধ, একটা কবিতা বা অন্য কিছু উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিল।’
আর সম্ভবত সে কবিতাই লিখেছেন শাহাব আহমেদ গদ্যের ভাষায়। আর তাই কবি বেলাল বেগও ‘নানুরে এক বিকেল’ গদ্যটি সম্বন্ধে বলেছেন ‘লিখব কি! মুগ্ধতার আবেশ কাটতে চায় না। মা, মাটি, মানুষ মাতৃভূমির এ প্রেমের উৎস না জানি কত কত অতল, কত বিশাল। এটি একটি বিশুদ্ধ গদ্য কবিতা; গদ্যের ঋজু বক্তব্য আছে, পদ্যের মোহনীয়তার সাথে।’
আর সে মোহে মুগ্ধ হয়েছি আমিও। বইটি পড়তে পড়তে বিভ্রমে পড়েছি বেশ কয়েকবার। গদ্য পড়ছি না পদ্য, না কোনো কবিতা? শব্দের এমন সুসজ্জা খুব বেশি চোখে পড়ে না। ভাষার দোলুনিতে ভেতরসুদ্ধ দুলে ওঠে। কোন দিকেই না আলোকপাত করেছেন শাহাব! ‘নিষ্কণ্টক সবুজ মাঠ, লোকগীতি, মধ্যযুগীয় কবিতা, বিভিন্ন সংস্কৃতির উপকথা ও তাদের চরিত্র, ভালোবাসা, হিংসা, সংঘাত, স্বপ্ন, আশাভঙ্গ, ঈপ্সিত যৌনাবেদনময়ী নারী, কামাকাক্সক্ষা, নতুন নতুন ভূসম্পদে পূর্ণ রকমারি জমিনে বিস্তৃত। ‘তিথোনসের তানপুরা’ গ্রন্থে মাধুর্যে ভরপুর, মহুয়ার মাদকতায় ঘোরলাগা ও সিক্ত আবেশে পরিবেশিত ছোটো ছোটো ঘটনায় নানা চরিত্র বিচরণ করে-কখনো এই পার্থিব প্রাত্যহিক জীবনের, কখনো উপকথার স্বপ্নিল জগতের কাল্পনিক কিছু বিস্ময়কর চরিত্র তারা।’ ভূমিকায় আরো বলেছেন কথাসাহিত্যিক পূরবী বসু, ‘তিথোনসের তানপুরা’ একটি অনবদ্য গদ্যরচনার সংকলন, যাকে ব্যক্তিগত জার্নাল, ব্যক্তিগত রচনা, রম্যরচনা, ফ্যান্টাসি অথবা সাহিত্যের অন্য কোনো বিশেষ শাখায় অন্তর্ভুক্ত করা যায় না। এটি শাহাব আহমেদের নিজস্ব ভঙ্গিতে, কাব্যময় ভাষায় রচিত একখানি গদ্যগ্রন্থ যা ছোটো ছোটো অধ্যায়ে বিভাজিত। এই গ্রন্থ শুধু দর্শন, উপকথা, ইতিহাসের কথা বলে না, কেবল নারী আর প্রেমের কথাও নয়, বলে সমসাময়িক জীবনের নানা উপসঙ্গ, গল্প ও নানা ঘটনা। রাজনীতি, প্রযুক্তি, অন্তর্জাল, টুইটার, ম্যাসেঞ্জার, ভাইবার, নেট, এডিএইচডিসহ বিভিন্ন মানসিক বৈকল্যের কথা, সব সব-ই রয়েছে পরতে পরতে গল্পের ছলে।’ এ যে কতোটা সত্য তা বইটিতে চোখ বোলালেই বোঝা যায়। বিস্মিত হতে হয় শাহাবের হাতে কবিতার মতো করে গদ্যের বুনন দেখে। এমনকি মনে গেঁথে যায় গদ্যগুলোর শিরোনামওÑ
তিথোনসের তানপুরা, কাতুল-লেসবিয়া-নদী, বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল, চাঁদনি পশর রাইত, উরুবাম্বা নদী তীরে, এ মণিহার আমার নাহি সাজে, একটি রাশিয়ান শব্দ শেখার ইতিবৃত্ত, ছোটো আঙ্গিকে বিশুদ্ধ, ক্যালিগুলার ঘোড়া ট্রয় ও বিষণœ কাশবন, নানুরে এক বিকেল, দুঃস্বপ্নের সাথে কথোপকথন, নিশাল বাদল ধারা, মন প্রান্তরে নীল চাষ, পিগম্যালিয়ন গালাতেয়া, আমি আর তুমি, লেখা নিয়ে লেখা বা বিশুদ্ধ ব্রেদ, নরকে নারকীয়, বর্গা ও ব্রেদের আখ্যান, তোমাকে নিয়ে কয়েক পঙক্তি।
প্রসঙ্গত দুএকটি অংশ উদ্ধৃত করা যেতে পারে–
১। সুইমিং পুলের ঝরনায় জলগুলো খুব শব্দ করে আমার স্মৃতির গুদাম ঘরে এমন কিছু অস্থিরতার সৃষ্টি করেছে যে সেখানে জমে থাকা যত ধুলাবালি, শুকনো পাতা, কাগজের ঠোঙা, ডাইরির পৃষ্ঠা ওড়াওড়ি শুরু করেছে। গাছের ফাঁক গলিয়ে কপাল ও গালে এসে পড়েছে এক চিলতে রোদ। দূরে কমলালেবুর গাছে হলুদ হলুদ কমলার গালেও। আকাশে আস্ত একটা ধবল দ্বীপ ভেসে যাচ্ছে নীলসাগরে। (৩৯ পৃষ্ঠা; এ মণিহার আমার নাহি সাজে)
২। উনিশ শ সাতচল্লিশে বাংলার বুকে করাত চালিয়ে যে রক্ত ও অশ্রুর প্লাবন ডাকা হয়েছিল, এখনও সেই অশ্রু টলটল করে অনেকের চোখে। (৭০ পৃষ্ঠা; নানুরে এক বিকেল)
আলোচ্য বইটি সম্পর্কে অনেকেই অনেক কথা বলেছেন। ব্যাক কভারে লেখাও আছে সেসব। আমার পাঠোপলব্ধিও তাদের থেকে খুব একটা ভিন্ন নয়। বলা বাহুল্য, এ বইটি পড়া আমার জন্য দারুণ এক অভিজ্ঞতার। যেহেতু কাব্যসুষমাম-িত গদ্যে আমি আকর্ষিত হই বেশি, খুব করে টানে এমন গদ্য, সেহেতু শাহাবের এই অনবদ্য গদ্য পড়ে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। মোহাবিষ্ট হয়ে আছি; নির্মোহ হবো কী করে? কবিযশোপ্রার্থী যাঁরা, যাঁরা গদ্যে পদ্য সঞ্চারণে আগ্রহী আর যাঁরা শব্দালঙ্কারে বাক্যালঙ্কারে ভাষাকে সাজিয়ে তুলতে চান, এ বইটি তাদের জন্য সহায়ক হবে বলে মনে করি। কেননা পাঠশেষে মনে হয়েছে, ‘তিথোনসের তানপুরা’ বাংলা ভাষাপ্রেমীদের জন্য কথাসাহিত্যিক শাহাব আহমেদের এক অনন্য উপহার। প্রিয় পাঠক, চলুন তবে নমুনা হিসেবে শাহাবের এই লেখাটি পড়তে পড়তে কথার কচকচি শেষ করি-
‘তখন বয়স বেশি ছিল না। যৌবন ছিল উদ্দামতার তুঙ্গে। তাকে নিয়ে হাঁটছিলাম লেলিনগ্রাদের সামার গার্ডেনে, জুন মাস। তার তখন সাড়ে সতেরো, আমার চব্বিশ কি পঁচিশ। সে ছিল সুন্দর নিষ্পাপ, চোখে আকাশ, চুলে স্বর্ণলতা। দিন করছিল যাই যাই, আর লেলিনগ্রাদের স্নিগ্ধ শ্বেতরাত আসি আসি।
অদ্ভুত ভাস্কর্যটি: কিউপিড ঘুমোচ্ছিল আর সাইকী দেখছিল তাকে মুগ্ধ চোখে লুকিয়ে। ছোটো একটা বাতি হাতে। নিষেধ ছিল তার ঘুমন্ত কিউপিডকে দেখার। সে যদি চোখ খুলে দেখতে পায় সাইকীকে তবেই সর্বনাশ হয়ে যাবে কিন্তু সাইকী কিছুতেই রুখতে পারেনি তার প্রেমিককে দেখার টেম্পটেশন।
পারিনি আমিও। তার ঠোঁটে দিয়েছিলাম আচম্বিত প্রথম চুম্বন। আর সে তিরস্কার করে বলেছিল ‘পারাছিওনক’। শব্দটি খটমটে, তখনও অর্থ জানতাম না।
জিজ্ঞেস করলাম।
ও বলল, ‘এর মানে হলো ‘বাচ্চা শুওর’, ওরাও তোমার মতো মিষ্টি দুষ্টুমি করে।’ চুম্রু বদলে শুওরের বাচ্চা শুনে খুব চুপ মেরে গেলাম। ও লক্ষ্য করল। বলল, ‘কি হলো হঠাৎ, খুব আপসেট।’
বললাম, ‘শুওরের বাচ্চা’ খুব জঘন্য গালি এবং এমন গালি দেওয়া ঠিক নয়।’ এবার তার হাসির পালা। খিল খিল খিল। সে কি হাসি, বৈকালিক সূর্যের হাসির চেয়েও সুন্দর।
বলে, ‘বাচ্চা শুওর এত আমুদে একটা প্রাণী! আমরা কাউকে আদর করলে ওভাবে ডাকি।’ বলা বাহুল্য, বাচ্চা শুওর হতে আমার আর আপত্তি হয়নি। অনেকদিন কোনো আচম্বিত দুষ্টুমি করলে সে আমাকে ওভাবে আদর করে ডাকতো। বহুদিন সে ডাকটি শুনিনি।
কে জানে এতদিনে হয়তো বাচ্চা থেকে আমি জেনুইন শুওরে পরিণত হয়েছি।’ (৪৮ পৃষ্ঠা; একটি রাশিয়ান শব্দ শেখার ইতিবৃত্ত)
বইয়ের নাম : তিথোনসের তানপুরা, লেখক : শাহাব আহমেদ, প্রকাশক : পুথিনিলয়, প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৯, প্রচ্ছদ : মোস্তাফিজ কারিগর, মুদ্রিত মূল্য : ২৪০ টাকা মাত্র।

Please follow and like us:
3