ড. কামালকে বাক সংযত হতে বলা শোভা পায় না, তবুও…

ড. কামালকে বাক সংযত হতে বলা শোভা পায় না, তবুও…

আনিস আলমগীর : আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা শালীনতাবোধ হারিয়ে ফেলেছেন। ড. কামাল হোসেন আন্তর্জাতিক স্তরে খ্যাতিমান আইনজীবী। তিনি গণফোরামের সভাপতি, আবার জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের আহ্বায়ক। গত ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাসের দুই বছর উপলক্ষ্যে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে এক প্রতিবাদ সভায় ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ‘সত্যিকার অর্থে একটি অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করতে হবে। এখন যারা আছে, তাদের লাথি মেরে দেশ থেকে বের করে দিতে হবে। পদত্যাগ না করলে লাথি মেরে নামাতে হবে। ওই সব ভাষায় না হলে, তাদের হাত ধরে টেনে রাস্তায় নামিয়ে দিতে হবে।’
ড. কামালের রাজনৈতিক জীবন ব্যর্থতায় ভরা। আওয়ামী লীগ থেকে বের হয়ে গণফোরাম গঠন করেছেন, তাও দীর্ঘ তিন দশক হয়ে গেছে। এই তিন দশকে গত সাধারণ নির্বাচনে তার দলীয় মার্কা নিয়ে মাত্র একজন প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। সফলতার মাপকাঠিতে রাজনীতিবিদেরা কথা বলে থাকেন। ৭ মার্চের জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিকে ‘তোমরা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। তার ত্যাগ-তিতিক্ষা, সফলতা তাকে জনগণকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করার অধিকার এনে দিয়েছিল। সে কারণে তিনি বলতে পারেন ‘আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো।’
তিনি এর আগে প্রকাশ্যে দেশের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা এটর্ণি জেনারেলকে ‘বাস্টার্ড’ বলেছেন, সাংবাদিককে ‘খামোশ’ বলেছেন, পুলিশকে ‘জানোয়ার, লাঠিয়াল’ বলেছেন। বুড়ো বয়সে মানুষের হুঁশ-জ্ঞান দুর্বল হয়ে যায়। অনুরূপ অবস্থা অনুভব করলে মানুষ নির্বাক হয়ে থাকার অভ্যাস কবুল করে। আমার মনে হয় কামাল সাহেবের এখন তাই করা উচিত। তাকে বাক সংযত হওয়ার কথা বলা আমার পক্ষে শোভনীয় নয়। উনার বয়সের কথা চিন্তা করে বললাম। ভাষার শুদ্ধতা রাখার দায়িত্ব তার মত প্রবীণ মানুষের অত্যন্ত জরুরি। কথা বলতে বুদ্ধি ও যুক্তিবোধ সুস্থির রাখা দরকার।
কামাল হোসেনের ব্যক্তিগত জীবনে আইন ব্যবসার সফলতা আছে, তা কেউ অস্বীকার করবে না। কিন্তু তার রাজনৈতিক জীবন তো ব্যর্থতা আর ব্যর্থতায় ভরা। এক ঝাঁক বামপন্থী নেতাকে দলে পাওয়ার পরও সংগঠন দাঁড় করাতে পারেননি তিনি। তাকে রাজনীতিতে বিবেচনায় আনা হয় তার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির কারণে, তার রাজনীতি বা সংগঠনের কারণে নয়। তিনি ঐক্যজোট করলেন সত্য কিন্তু মনোনয়নের সময় বিএনপিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। বিএনপি এত ব্যাপকভাবে মনোনয়ন বাণিজ্য করলো যে- বিরোধী দলের সম্পূর্ণ নির্বাচনটাই হতাশাজনক হয়ে গেল।
আমরা দুঃখিত হয়েছি, ঐক্য ফ্রন্ট গঠনের পর তিনিও বিএনপি’র নিয়মে গা ভাসিয়ে দিয়ে সংঘবদ্ধভাবে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠক করে অভিযোগ উত্থাপন করলেন। এই বিষয়টা তো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠক করে অভিযোগ উত্থাপন তো অপর রাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপের জন্য আমন্ত্রণ জানানোর সামিল।
এই প্রসঙ্গে আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রে গুজরাটের রেস্টুরেন্ট মালিকদের অ্যাসোসিয়েশন আছে। এর সদস্য সংখ্যা প্রায় আট হাজারের বেশি। রেস্টুরেন্টগুলোর জনবল প্রায় দশ লক্ষ। বছরে আয় এক লক্ষ আশি হাজার কোটি টাকার মতো (তথ্যসূত্র: দেশ পত্রিকা, ২ এপ্রিল, ২০০৫)। নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী। তিনি চেষ্টা চালাচ্ছিলেন এই সংস্থার সঙ্গে একটা সম্পর্ক গড়ে তুলতে। ২০০২ সালের গুজরাটের দাঙ্গার জন্য নেরেদ্র মোদি ‘দাঙ্গা মোদি’ ‘কসাই মোদি’ হিসেবে খ্যাতি কুড়িয়েছেন। কিন্তু এই সংস্থার প্রবীণেরা তার বিরুদ্ধে হলেও নবীনেরা ছিল তার পক্ষে। ২০০৫ সালে সমিতির নির্বাচনে মোদিকে ভাষণ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল তারা। কিন্তু আমেরিকা তার ভিসা খারিজ করে দেওয়ায় আর যেতে পারেননি।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন তখন জর্জ ডব্লিউ বুশ। আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কংগ্রেসের মনমোহন সিং। বিজেপির প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে কংগ্রেস আর নরেন্দ্র মোদি গুজরাটে বিজেপি দলীয় মুখ্যমন্ত্রী। বিজেপি দলীয় বিধায়করা নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে মুখ খোলা আরম্ভ করেছিলেন। আর তখন তার মুখ্যমন্ত্রীত্ব যায় যায় অবস্থা। তখনই লোকসভায় খুনের অভিযোগে নরেন্দ্র মোদির ভিসা খারিজের প্রসঙ্গটি আলোচনায় আসে। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বক্তব্যে লোকসভাসহ সারা ভারত স্তম্ভিত হয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘এটা আমাদের ঘরোয়া ব্যাপার, তার মধ্যে কেন নাক গলাবে ওয়াশিংটন। আমাদের অর্থাৎ ভারতীয় রাজনৈতিক দল সমূহের মধ্যে বিরোধ ও মতানৈক্য থাকতেই পারে। আমরাই তার সমাধান খুঁজে নেব। তার মধ্যে বিদেশি সরকারের হস্তক্ষেপ আমরা বরদাশত করতে প্রস্তুত নই।’ কংগ্রেসের জন্য এই ঘটনার প্রকাশ্যে প্রতিবাদ না করাটা হতো এক ধরনের রাজনৈতিক হারিকিরি। মনমোহন সিং তা যথাযথ বুঝেছিলেন।
দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ড. কামালসহ বিএনপি নেতাদের অভিযোগ উত্থাপন যথাযথ হচ্ছে কিনা তা আশা করি এই ঘটনা থেকে তারা উপলব্ধি করতে পারবেন। আমাদের দেশ ছোট দেশ। আবার আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দু’টি বড় দেশ- ভারত, চীন আমাদের প্রতিবেশী। কয়দিন আগে ভারত ও আমেরিকা আমাদেরকে চীনের কাছ থেকে অধিক ঋণ না নেওয়ার পরামর্শ পর্যন্ত দিয়েছে। শক্তির রাজনীতিতে আমরা পারবো না। গ্লোবাল রাজনীতিতে মস্তিষ্কের জোরে টিকে থাকাই হচ্ছে বাংলাদেশের কূটনীতি। সেখানে রাষ্ট্রদূতদের ডেকে ডেকে প্রত্যেকদিন দেশের দুর্বলতা বিদেশিদের কানে তুলে দেওয়া তো দেশ প্রেমের লক্ষণ হতে পারে না। অন্যদিকে, সরকার এই সবকিছু দেখেও দেখে না। এটাও সরকারের উত্তম কাজ বলে মনে হচ্ছে না। এইসব ভন্ডামীর জন্য রাজনৈতিক স্বাধীনতা দেওয়ার প্রয়োজন কি!
গত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচনে দূতাবাসগুলো বাড়াবাড়ি আরম্ভ করেছিল। অবশ্য সরকারের চোখ রাঙানিতে মাঝপথে তা বন্ধ হয়ে যায়। আমেরিকান দূতাবাসের রাজনৈতিক কর্মকর্তা গিয়েছিলেন বিএনপি প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের বাসায়, আর ব্রিটিশ হাইকমিশনার গিয়েছিলেন বিএনপির আরেক প্রার্থী ইশরাক হোসেনের বাসায়। যেন তারা আমাদের ভোটের কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রা। দীর্ঘদিন ড. কামাল হোসেন আর বিএনপি নেতারা দূতাবাসে দূতাবাসে ঘুরেছেন। লাভের লাভ কি হল আমার বুঝে আসেনা। জানি সরকারের দোষ ত্রুটি অনেক আছে। সেই দোষ ত্রুটি সারানোর জন্য অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কর্মকা-কে শক্তিশালী করতে হবে। দূতাবাসে গিয়ে কিছুই হবে না। নিজের দুর্বলতা নিজেকে তালাশ করতে হয়।
বেগম জিয়ার কারাবাসের দুই বছর পূর্ণ হয়েছে। ড. কামাল আর বিএনপি দেশব্যাপী একটি হরতাল করতে পারেনি। সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি ২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ একটি হরতাল ডেকেছিল। খুবই করুণভাবে ফ্লপ করেছে সেই হরতাল। বিএনপির তৃণমূল নাকি বিপ্লবী কর্মসূচি চায়। তাদের তৃণমূল অনেকটা ভুয়া শক্তি। তবে আওয়ামী বিরোধী সাধারণ মানুষ বিএনপির শক্তি, তারা কষ্ট স্বীকার করে বিএনপিকে ভোট দেয়। তারাই তাদেরকে উজ্জীবিত রেখেছে। মাঝে মাঝে নির্বাচনে অংশগ্রহণ বিএনপির জন্য ইন্সেন্টিভ।
যা হোক, লেখা আরম্ভ করেছিলাম ড. কামালের লাথি মেরে তাড়িয়ে দেবার প্রসঙ্গে। তিনি এর আগে প্রকাশ্যে দেশের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা এটর্ণি জেনারেলকে ‘বাস্টার্ড’ বলেছেন, সাংবাদিককে ‘খামোশ’ বলেছেন, পুলিশকে ‘জানোয়ার, লাঠিয়াল’ বলেছেন। বুড়ো বয়সে মানুষের হুঁশ-জ্ঞান দুর্বল হয়ে যায়। অনুরূপ অবস্থা অনুভব করলে মানুষ নির্বাক হয়ে থাকার অভ্যাস কবুল করে। আমার মনে হয় কামাল সাহেবের এখন তাই করা উচিত। তাকে বাক সংযত হওয়ার কথা বলা আমার পক্ষে শোভনীয় নয়। উনার বয়সের কথা চিন্তা করে বললাম। ভাষার শুদ্ধতা রাখার দায়িত্ব তার মত প্রবীণ মানুষের অত্যন্ত জরুরি। কথা বলতে বুদ্ধি ও যুক্তিবোধ সুস্থির রাখা দরকার।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

Please follow and like us: