শনি. আগ ১৭, ২০১৯

ডেঙ্গুর লক্ষণ কী, হলে কী করবেন

ডেঙ্গুর লক্ষণ কী, হলে কী করবেন

Last Updated on

লাইফস্টাইল ডেস্ক : ডেঙ্গু ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ায় তা নিয়ে মানুষের আতঙ্কের প্রেক্ষাপটে এই জ্বরের লক্ষণ ও তা দেখা দিলে কী করতে হবে, তা সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
গতকাল সোমবার ‘ডেঙ্গু মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞ পরামর্শ’ শিরোনামের এক তথ্য বিবরণীতে বিষয়গুলো জানানো হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ডেঙ্গু রোগে বিচলিত বা আতঙ্কিত না হয়ে পরামর্শগুলো অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়েছে। আগের বছরগুলোতে যে লক্ষণগুলো দেখে ডেঙ্গু জ্বর শনাক্ত করা যেত, এবার তা বদলে যাওয়ায় বিভ্রান্ত হচ্ছেন অনেকেই।
কী লক্ষণ দেখলে হাসপাতালে যেতে হবে : নিচের যে কোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলে অতিসত্বর হাসপাতালে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। জ্বর কমার প্রথম দিন রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি। বার বার বমি/ মুখে তরল খাবার খেতে না পারা। পেটে তীব্র ব্যথা। শরীর মুখ বেশি দুর্বল অথবা নিস্তেজ হয়ে পড়া/হঠাৎ করে অস্থিরতা বেড়ে যাওয়া। শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক কমে যাওয়া/শরীর অস্বাভাবিক ঠা-া হয়ে যাওয়া
বাড়িতে চিকিৎসা : পর্যাপ্ত বিশ্রাম (জ্বর চলাকালীন এবং জ্বরের পর এক সপ্তাহ)। স্বাভাবিক খাবারের পাশাপাশি পর্যাপ্ত পরিমাণে তরল জাতীয় খাবার খাওয়া, যেমন খাবার স্যালাইন। গ্লুকোজ, ভাতের মাড়, বার্লি, ডাবের পানি, দুধ/হরলিকস, বাসায় তৈরি ফলের রস, স্যুপ ইত্যাদি
জ্বর থাকাকালীন চিকিৎসা : প্যারাসিটামল ট্যাবলেট সেবন করতে হবে। পূর্ণবয়স্কদের জন্য ২টি করে প্রতি ৬/৮ ঘণ্টা পর পর; শিশুদের জন্য বয়স ও ওজন অনুসারে চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী। কুসুম গরম পানি বা নরমাল তাপমাত্রার পানি দ্বারা সারা শরীর মোছা। জ্বর থাকাকালীন রোগী দিনরাত সবসময় মশারির ভেতরে থাকবে
যে সব ওষুধ বারণ : ব্যথানাশক ওষুধ (এন.এস.এ.আই.ডি গ্রুপ যেমন, ডাইক্লোফেন, আইবুপ্রোফেন, ন্যাপারক্সেন, মেফেন)। এসপিরিন/ক্রোপিডোপ্রেল (এন্টি প্লাটিলেট গ্রুপ) হৃদরোগীদের জন্য জ্বর থাকাকালীন ও প্লাটিলেট হওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। ওয়ারফারিন (এন্টিকোয়াগুলেন্ট) হৃদরোগীদের জন্য জ্বর থাকাকালীন ও প্লাটিলেট হওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। এন্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধ (বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতিরেকে)
এবছর বর্ষার শুরুতেই মশাবাহিত ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ দেখা দেয় ঢাকায়; এখন তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। সরকারি হিসাবে ১৮ জনের মৃত্যুর খবর দেওয়া হলেও এই সংখ্যা অর্ধশত ছাড়িয়ে যাওয়ার খবর গণমাধ্যমে এসেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, রোববার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ে মোট ২০৬৫ জন ডেঙ্গু নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে গেছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এ পর্যন্ত মোট ২৭ হাজার ৪৩৭ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৯ হাজার ৭৬১ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। ৭ হাজার ৬৫৮ জন এখনও চিকিৎসাধীন।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ডেঙ্গু পরীক্ষা নয়: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর : ঢালাওভাবে ডেঙ্গু পরীক্ষায় কিটের অপচয় হওয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই পরীক্ষা না করাতে নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সারা দেশে বেড়ে চলা ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ মোকাবেলার লক্ষ্যে গত রোববার জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এইডিস বাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় আয়োজিত এক সভায় এ অনুরোধ জানান অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ঢালাওভাবে সব ধরনের রোগীর এনএস-ওয়ান পরীক্ষা করা হচ্ছে। এ কারণে পরীক্ষায় ব্যবহৃত কিটের অপচয় হচ্ছে। এ কারণে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ডেঙ্গু রোগের পরীক্ষা না করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে সভায় রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা, ডা. সমীর কান্তি, মো. রুহুল আমিন এবং জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এইডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. এম এম আক্তারুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বাংলাদেশ কলেজ অব মেডিসিন এর পক্ষ থেকে সোমবার সারা দেশের ১৩টি সরকারি মেডিকেল কলেজ এবং ৭ আগস্ট ৫১টি জেলার সদর হাসপাতাল এবং উপজেলা হাসপাতালের চিকিৎসকদের ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
এছাড়া গত ৩১ জুলাই থেকে ৩ অগাস্ট পর্যন্ত দেশে তিন লাখ ৬৮ হাজার ২০০ ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিট আমদানি করা হয়েছে। ৬ অগাস্ট থেকে দেশে কিট তৈরির জন্য কাঁচামাল আমদানির প্রক্রিয়া চলছে। এখানে প্রতিদিন ৩৫ হাজার ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিট তৈরি করে সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
ডেঙ্গু জ্বর নেমে গেলে রোগীর পরিচর্যা কেমন হবে : তাহমিনা আক্তার পলি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খন্ডকালীন শিক্ষক ও মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা।তার সপ্তম শ্রেণীতে পড়–য়া ছেলে নব জাহিদুল কবীরের গায়ে জ্বর ওঠেছিলো ২০শে জুলাই। দেরী না করে দ্রুতই সন্তানকে হাসপাতালে নিয়ে যান তারা।
‘যখন ছেলেকে হাসপাতালে নিলাম তখন জ্বর ছিলো কম। কিন্তু প্রেশার কমে গিয়েছিলো। রক্তে প্লেটলেট কমতে শুরু করে। এরপর সাত দিন হাসপাতালে থেকে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।’
তিনি বলছেন, ‘জ্বর চলে যাওয়ার পর ছেলেকে স্যালাইন ও প্রচুর তরল খাওয়াতে হয়েছিলো এবং চিকিৎসকরা যে কয়েকটি জিনিসের প্রতি লক্ষ্য রেখেছিলেন তা হলো নব’র পাতলা পায়খানা হচ্ছে কি-না কিংবা বুকে বা পেটে কোনো ব্যথা হচ্ছে কি-না সেদিকে নজর রাখা।’
তাছাড়া আলট্রাসনোগ্রাম ও বুকের এক্স রে করা হয়েছে কয়েকবার বুকে পানি জমেছে কি-না সেটি নিশ্চিত হওয়ার জন্য। চিকিৎসকরা বলছেন, এবারে যাদের ডেঙ্গু হয়েছে তাদের মধ্যে জ্বর খুব একটা বেশি ওঠছে না। আবার উঠলেও সেটি ২/৩ দিনের মধ্যেই নেমে যাচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে এবারে ডেঙ্গুর যে প্রবণতা সেটি আগের বছরগুলোর মতো নয়, এমনকি লক্ষণও কিছুটা ভিন্ন।
কারণ আগের বছরগুলোতে এডিস মশা কামড়ালে প্রচ- জ্বর হতো কিন্তু এবার অনেক ক্ষেত্রেই তাপমাত্রা খুব বেশি হতে দেখা যাচ্ছে না। গত কয়েক বছর হেমোরেজিক জ্বর হচ্ছিলো অনেকের।
কিন্তু এবার সেটি তেমন একটা দেখা যাচ্ছে না। এবার যা হচ্ছে চিকিৎসকরা তার নাম দিয়েছেন ‘শকড সিনড্রোম।’ একারণে এবার অল্প জ্বর হলেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে বলছেন তারা।
জ্বর নেমে যাওয়ার পর রোগীর পরিচর্যা : বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানভীর ইসলাম বলছেন, ৩/৪ দিনে জ্বর কমে আসার পরই মূলত ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর জটিলতা বেশি দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলছেন, রক্তের উপাদান কমে যাওয়া কিংবা রক্তের ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা জ্বর চলে যাওয়ার পরেই দেখা যায়।
‘অনেকে মনে করেন জ্বর কমে গেলে আশঙ্কা থাকবে না। আসলে কিন্তু তা নয়। জ্বর কমে গেলেও চিকিৎসকদের পরামর্শ মতো ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই ভয়ের কিছু থাকবে না।’
মিস্টার ইসলাম বলেন, যেসব জটিলতা সাধারণত দেখা যায় তা হলো: রক্তের ভেতরের তরল অংশ বের হয়ে আসা, রক্ত ঘন হয়ে যাওয়া কিংবা রক্তের প্রেশার কমে যাওয়া- এর চিকিৎসা একটাই স্যালাইন নেয়া বা প্রয়োজনে শিরায় স্যালাইন দেয়া।
তবে রক্তের প্লেটলেট নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, প্লেটলেট অতি মাত্রায় কমে না গেলে এ নিয়ে ব্যবস্থাও নিতে হয় না।
‘প্লাজমা লিকেজ বা রক্তের তরল অংশ কমে যাওয়ার কারণে সমস্যা হয়। তাই প্রয়োজনীয় স্যালাইন দেয়ার পাশাপাশি ডাবের পানি, ওরস্যালাইন, লেবুর শরবত এসব প্রচুর পরিমাণে খাওয়াতে হবে যাতে প্রেশার কমে রোগী শক সিনড্রোম পর্যন্ত না যায়।’
আর এটুকু করা গেলেই ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে ভয়ের কিছু নেই বলে মন্তব্য করেন ডা: তানভীর ইসলাম।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক রাজীব কুমার সাহা বলছেন, ফ্লুয়িড ম্যানেজমেন্ট অর্থাৎ তরল খাবার ঠিকমতো খেলে ডেঙ্গু নিয়ে ভয়ের কোনো কারণ নেই। ‘জ্বর চলে গেলে রোগীকে সচেতনভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো চলতে হবে, তাহলেই আর সমস্যা হবে না।’
ডেঙ্গুর ভাইরাস শরীরে থেকে যেতে পারে কী? ডা: তানভীর ইসলাম বলছেন, এরকম কোনো সম্ভাবনা নেই। তার মতে জ্বর চলে গেলে ভাইরাসটিও আস্তে আস্তে বিদায় নিতে থাকে। এরপর ভাইরাসের যেসব প্রতিক্রিয়া বিশেষ করে রক্তের তরল উপাদান কমে যাওয়া তার চিকিৎসা ঠিক মতো হওয়াটাই এর সমাধান। তিনি বলেন, ‘যেটুকু সময় জ্বর থাকে শুধু সেসময়টুকুই ভাইরাসটা সচল থাকে। এরপরে এন্টিবডি তৈরি হলে ভাইরাসটা আর থাকার সুযোগ নেই। অর্থাৎ আক্রান্ত রোগীর রক্তের প্লেটলেট কাউন্ট উন্নত হলে বা ফ্লুয়িড ম্যানেজমেন্ট হয়ে গেলে ভাইরাস আর থাকে না ‘
এর ঝুঁকিগুলো কী? ডা: রাজীব কুমার সাহা বলছেন, রোগী সচেতন হলেই ঝুঁকি এড়ানো যায়। কিন্তু বিলম্ব হলে ঝুঁকি তৈরি হয়। ‘মোট কথা জ্বর চলে গেলই যে ভালো হয়ে গেলেন তা নয়। পুরোপুরি বিশ্রাম নিতে হবে এবং প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার খেতে হবে।’

Please follow and like us:
2