রবি. এপ্রি ২১, ২০১৯

ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা, ভোটকেন্দ্র হলেই থাকছে

ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা, ভোটকেন্দ্র হলেই থাকছে

Last Updated on

নিজস্ব প্রতিবেদক : বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের বিরোধিতার মধ্যে ভোটকেন্দ্র হলে রেখেই ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়েছে। আগামি ১১ মার্চ অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার শেষ সময় ২ মার্চ; যাচাই-বাছাই শেষে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ হবে ৩ মার্চ। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হবে ৫ মার্চ। ১১ মার্চ সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হলগুলোতে স্থাপিত ভোটকেন্দ্রে গিয়ে শিক্ষার্থীরা পরিচয়পত্র দেখিয়ে ভোট দিতে পারবেন। দীর্ঘদিন পর এবার ডাকসু নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়ার সঙ্গে থেকে ভোটগ্রহণ কোথায় হবে, তা নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। আগের মতো হলগুলোতে ভোটকেন্দ্র স্থাপনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তকে ছাত্রলীগ স্বাগত জানালেও ছাত্রদল ও বাম সংগঠনগগুলো অ্যাকাডেমিক ভবনে ভোটকেন্দ্র স্থাপনের দাবি তোলে। তবে কর্তৃপক্ষ আগের মতোই হলেই ভোটকেন্দ্র রাখার সিদ্ধান্ত নিল। গতকাল সোমবার সকালে নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন ডাকসু নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. এস এম মাহফুজুর রহমান। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট হলের ভোটার (আবাসিক ও অনাবাসিক) তার নিজ নিজ হলের ভোটকেন্দ্রে বৈধ পরিচয়পত্র দেখিয়ে ভোট দেবেন। ডাকসুতে পদাধিকার বলে উপাচার্য সভাপতির দায়িত্বে থাকেন। বাকি ২৫টি পদে নির্বাচন হবে। পদগুলো হল সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সহ-সাধারণ সম্পাদক, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, সাহিত্য সম্পাদক, সংস্কৃতি সম্পাদক, ক্রীড়া সম্পাদক, ছাত্র পরিবহন সম্পাদক, সমাজ সেবা সম্পাদক এবং ১৩ জন সদস্য। আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি গতকাল সোমবার হলের নোটিস বোর্ড ও ডাকসুর ওয়েবসাইটে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে। ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে আপত্তি গ্রহণের পর খসড়া ভোটার তালিকা সংশোধন করে ২০ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ করা হবে। হলগুলোর প্রাধ্যক্ষের কার্যালয় থেকে ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মনোনয়নপত্র বিতরণ করা হবে। ২৬ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টা থেকে ১২টার মধ্যে হলের রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে। ২৬ ফেব্রুয়ারি দুপুর ২টায় ডাকসুর মনোনয়নপত্র বাছাই করবেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। ২৭ ফেব্রুয়ারি হলের নোটিস বোর্ড ও ওয়েবসাইটে প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করা হবে। প্রকাশিত তালিকার বিষয়ে কোনো প্রার্থীর আপত্তি থাকলে তা ২৮ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টার মধ্যে তা ডাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্যকে লিখিতভাবে জানাতে হবে। মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ সময় ২ মার্চ। ৩ মার্চ হলের নোটিস বোর্ড ও ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা। ৫ মার্চ সম্পূরক ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে হলের নোটিস বোর্ড ও ডাকসুর ওয়েবসাইটে। হল সংসদে ১৩টি পদের জন্য নির্বাচন হবে। পদগুলো হল সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সহ-সাধারণ সম্পাদক, সাহিত্য সম্পাদক, সংস্কৃতি সম্পাদক, পাঠকক্ষ সম্পাদক, আভ্যন্তরীণ ক্রীড়া সম্পাদক, বহিরাঙ্গন ক্রীড়া সম্পাদক, সমাজসেবা সম্পাদক ও ৪ জন সদস্য। হল সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র বিতরণ, জমা বাছাই ও প্রত্যাহারের তারিখ কেন্দ্রীয় সংসদের জন্য নির্ধারিত তারিখেই রাখা হয়েছে। তবে প্রচার ও প্রচারণার বিষয়ে তফসিলে কিছু বলা হয়নি। এ বিষয়ে প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তাকে প্রশ্ন করলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি। তিন দশক পর আদালতের নির্দেশে ডাকসু নির্বাচনের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯০ সালে, তারপর আর নির্বাচন হয়নি। ডাকসু নির্বাচন চেয়ে আদালতে রিট আবেদন হয়েছিল, তাতে ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশনা আসে গত বছর হাই কোর্ট থেকে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আবেদনে ওই আদেশ স্থগিত করেছিল আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত। আপিল বিভাগ গত ৬ জানুয়ারি সেই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নিলে নির্বাচন আয়োজনের বাধা কাটে। এরপর নির্বাচনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্সুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম মাহফুজুর রহমানকে প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং আরও পাঁচজনকে রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়।
তফসিল নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া: এদিকে, ডাকসু নির্বাচনের ঘোষিত তফসিলকে স্বাগত জানিয়েছে ছাত্রলীগ; অন্যদিকে তা প্রত্যাখ্যান করেছে ছাত্রদল; বাম ছাত্র সংগঠনগুলো তুলেছে আপত্তি। এবার ডাকসু নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়ার পর থেকে ভোটগ্রহণ কোথায় হবে, তা নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। আগের মতো হলগুলোতে ভোটকেন্দ্র স্থাপনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তকে ছাত্রলীগ স্বাগত জানালেও ছাত্রদল ও বাম সংগঠনগুলো অ্যাকাডেমিক ভবনে ভোটকেন্দ্র স্থাপনের দাবি তোলে। তবে কর্তৃপক্ষ আগের মতোই হলেই ভোটকেন্দ্র রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তফসিলে বলা হয়েছে, আগামি ১১ মার্চ হলগুলোতে পরিচয়পত্র দেখিয়ে ভোট দেবে শিক্ষার্থীরা। ডাকসু নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়ার পর থেকেই প্রস্তুতি শুরু করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থক ছাত্রলীগ। তফসিল ঘোষণার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইন বলেন, তারা একে স্বাগত জানাচ্ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা নির্বাচিত নেতৃত্বের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। তারা এমন ধরনের ছাত্র রাজনীতিই চায়, যারা তাদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে এবং তারা একটা স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চায়। কিন্তু এর জন্য কোনো যৌক্তিক প্ল্যাটফর্ম যেহেতু নেই; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি, তাদের সেই প্রত্যাশার প্রতি সম্মান রেখে আমরা তফসিলকে স্বাগত জানাচ্ছি। ছাত্রদল ক্যাম্পাসে সহাবস্থান নিশ্চিতের পর নির্বাচনের দাবি তুলেছিল। সেজন্য তফসিল পেছাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে স্মারকলিপিও দিয়েছিল তারা। তফসিলের পর ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক বাশার সিদ্দিকী বলেন, সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠনকে ‘জেতানোর আয়োজন’ করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এই তফসিলকে আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। আমরা স্মারকলিপি দিয়ে, আলোচনা করে নির্বাচন পেছানোর কথা বলেছিলাম, কিন্তু আমাদের কোনো কথাই তো শুনলো না। আমরা বলেছি, আগে সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কিন্তু সেসব না করেই তফসিল দিয়ে দিল। এথেকে সুস্পষ্টভাবে এটাই প্রমাণিত হয় যে, ছাত্রলীগকে নির্বাচনে জেতানোর জন্য সব আয়োজন প্রশাসন করে রাখছে। হলে ভোটকেন্দ্র রাখার বিরোধিতা করে ছাত্রদল নেতা বলেন, হলগুলো তো তাদের (ছাত্রলীগ) দখলে। হলে ভোট হলে যে তা সুষ্ঠু হবে না, সেটাও জানা কথা। নির্বাচনে অংশ নেবেন কি না- জানতে চাইলে বাশার বলেন, এ বিষয়ে আলোচনা করে তারা সিদ্ধান্ত নেবেন। বাম ছাত্রসংগঠনগুলোর মোর্চা প্রগতিশীল ছাত্রজোটের নেতা ও ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী বলেন, তাদের দাবি উপেক্ষা করে তফসিল ঘোষণা করায় ‘উৎকণ্ঠা’র সৃষ্টি করেছে। তফসিল ঘোষণা একদিকে যেমন আনন্দের, অন্যদিকে যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এ তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে, তা আমাদের মাঝে অনেক বেশি উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা সুনির্দিষ্ট কিছু দাবি উপস্থাপন করেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে। সেই দাবিগুলোকে অগ্রাহ্য করে, শুধু একটি দলের সামগ্রিক বিবেচনাকে প্রাধান্য রেখে বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনের আয়োজন করতে যাচ্ছে। এই বিষয়টা নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে কি না, তা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি করে। ভোটের প্রস্তুতির পাশাপাশি নিজেদের দাবি-দাওয়া নিয়ে নির্বাচনের আগ পর্যন্ত সোচ্চার থাকবেন বলে জানান লিটন। তিনি বলেন, আমরা হয়ত আগামি পাঁচ-ছয় দিনের মধ্যেই অনানুষ্ঠানিক প্যানেল ঘোষণা করতে পারব। আমরা চাইব, আমাদের যৌক্তিক দাবিগুলো সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পুনর্বিবেচনা করে সকলের জন্য সমসুযোগ ও নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু করার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা হবে। ছাত্র সংগঠনগুলোর পাশাপাশি কোটা আন্দোলনকারীদের প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদও এবার প্যানেল দিয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তফসিলের প্রতিক্রিয়ায় পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন বলেন, হলের বাইরে ভোটকেন্দ্রসহ বেশ কয়েকটি দাবি আমরা উপাচার্যকে স্মারকলিপি দিয়ে জানিয়েছিলাম। বেশিরভাগ ছাত্র সংগঠনই হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র চেয়েছে। আমাদের কোনো দাবিই সেই অর্থে গ্রহণ করা হয়নি তফসিলে। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা সবাই মিলে বসে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।

Please follow and like us:
0