ট্রাম্প, মোদি ও নেতানিয়াহু : বিশ্ব শান্তির হুমকি

ট্রাম্প, মোদি ও নেতানিয়াহু : বিশ্ব শান্তির হুমকি

আনিস আলমগীর : জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৪তম বার্ষিক অধিবেশনে যোগ দিতে এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান এবং রাষ্ট্রপ্রধান নিউইয়র্কে সমাবেত হয়েছেন। শুধু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সরকার গঠন নিয়ে বিপর্যয়কর অবস্থায় আছেন বলে যেতে পারেননি। তিনি হয়তো তৃতীয় দফা নির্বাচনের মুখোমুখি হবেন, প্রধানমন্ত্রী পদে হয়তো অধিষ্ঠিত হতে পারবেন না। সম্ভবত বিরোধী ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট কোয়ালিশনের জেনারেল বেনি গ্যান্টজ প্রধানমন্ত্রী হবেন। নির্বাচনে ১২০ আসনের পার্লামেন্টে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি পেয়েছে ৩১ আসন।
এর আগে প্রথম দফা নির্বাচনে দুই দল সমানসংখ্যক ৩২টি করে আসন পেয়েছিল। কিন্তু কোয়ালিশন সরকার গঠনে ব্যর্থ হওয়ায় দ্বিতীয় দফা ভোট হলো গত ১৭ সেপ্টেম্বর। নেতানিয়াহু ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট জোটের সঙ্গে কোয়ালিশন গঠনে তৎপর কিন্তু জেনারেল গ্যান্টজ ক্ষমতাসীন থাকতে নেতানিয়াহু ব্যাপক দুর্নীতি করেছেন এবং দেশকে বিভক্ত করেছেন অভিযোগ করে তার সঙ্গে সরকার গঠনে আগ্রহী নয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্প, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং নরেন্দ্র মোদি মানবতার শত্রু, বিশ্ব শান্তির শত্রু। এই তিন খলনায়কের পতন না হলে বিশ্ব নিরাপদ হবে না
আরব পার্টিগুলোর জোট জয়েন্ট লিস্ট ১৩ আসনে জিতেছে আর সাবেক বাউন্সার লিবারম্যানের দল ৮ আসনে জিতেছে। এই দুই দল জেনারেল বেনি গ্যান্টজকে সমর্থন দিলেও সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা হয় না। অনুরূপ পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট হয়তো শেষ পর্যন্ত তৃতীয় দফা নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তৃতীয় দফার নির্বাচন হলে নেতানিয়াহু ভালো করবেন সেই গ্যারান্টি নেই। কারণ দ্বিতীয় দফায় তিনি পিছিয়ে পড়েছেন এক সিট। ইসরায়েলের মানুষ ধীরে ধীরে নেতানিয়াহুর প্রতি আস্থা প্রত্যাহার করতে শুরু করেছে বলা যায়।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিশ্বব্যবস্থার জন্য এখন হুমকিস্বরূপ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবার তার জাতিসংঘের বক্তৃতায় বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে বলেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বব্যবস্থার বিপরীতে জাতীয়তাবাদী মতাদর্শকে সামনে নিয়ে আসার কথা বলেছেন। বিশ্বনেতাদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের নেতাদের নিজ নিজ দেশের স্বার্থকে উপেক্ষা করার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই বিশ্বায়ন। মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে নিজের এমন অবস্থান তুলে ধরেন ট্রাম্প।
গত ২২ সেপ্টেম্বর নরেন্দ্র মোদি আমেরিকার টেক্সাসে ভারতীয়দের বিরাট এক জনসমাবেশে উপস্থিত ছিলেন। প্রায় ৫০ হাজার ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান সে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। নরেন্দ্র মোদি আগামী বছরের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন। মোদি ট্রাম্পের হাত ধরে বলেছেন, হোয়াইট হাউসে ভারতের সত্যিকারের মিত্র অবস্থান করছেন। ভারতীয় ভোটারদের তিনি ইঙ্গিত দিয়ে গেলেন ট্রাম্পকে নির্বাচনে জিতিয়ে আনার জন্য। নরেন্দ্র মোদি স্লোগান দিয়েছেন, ‘আবকি বার ট্রাম্প সরকার’। তার এমন বক্তৃতা কোনোভাবেই ভারতের পররাষ্ট্র নীতির সঙ্গে যায় না দাবি করে ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেস তার তীব্র সমালোচনা করেছে। ট্রাম্প-মোদি উভয়ে জনসভায় ‘ইসলামী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে’ ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করেছেন। মোদিকে খুশি করতে ট্রাম্প তাকে বলেছেন ‘ফাদার অব ইন্ডিয়া’।
ভারত, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র- রাষ্ট্রীয়সন্ত্রাসকে বৈধতা দিতে এসব অঙ্গীকার করে থাকে। ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয়সন্ত্রাস, কাশ্মীরে ভারতের কাশ্মীরিদের ওপর সন্ত্রাস, আমেরিকায় অভিবাসীদের ওপর সন্ত্রাস- এই সবই বৈধসন্ত্রাস! মানবাধিকার এখানে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস দ্বারা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। এটার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলাকে তারা ‘সন্ত্রাস’ বলে আখ্যায়িত করছে।
কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা বাতিলের অন্যতম কারণ হলো কাশ্মীরে ভিন্ন জাতির বসতি স্থাপনের সুযোগ প্রদান করে কাশ্মীরিদেরকে কাশ্মীরে সংখ্যালঘুতে পরিণত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা
এই তিন দেশ এখন রাষ্ট্রীয়ভাবে বর্ণবাদ, উগ্র সাম্প্রদায়িকতা, হিংসা-বিদ্বেষ লালন করছে। নরেদ্র মোদি এ বছর দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রীয়ভাবে মুসলিমবিদ্বেষী কার্যক্রম আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। নিজ দেশের সংখ্যালঘু মুসলিমদের তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের জন্য হুমকি হিসেবে নির্বাচনেও প্রচার করেছেন। নানা মত-পথ-বিশ্বাসের ভারতকে তিনি ‘হিন্দু পাকিস্তান’ বানানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
২০০২ সালে নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় দুই হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। তখন আমেরিকা নরেন্দ্র মোদিরকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করেছিল। অথচ আজ বর্ণবাদী এবং সাম্প্রদায়িক ট্রাম্প আর নরেন্দ্র মোদি হরিহর আত্মারূপে আত্মপ্রকাশ করেছে, সন্ত্রাসের নামে মানুষের অধিকার ভূলুণ্ঠিত করার জন্য। অথচ কাশ্মীরের জনগণ সংগ্রাম করছে তার আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের জন্য। তাকে অবহিত করা হচ্ছে সন্ত্রাস হিসেবে।
আর নেতানিয়াহু এবং নরেদ্র মোদির পরিকল্পনা প্রায় অভিন্ন। কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা বাতিলের অন্যতম কারণ হলো কাশ্মীরে ভিন্ন জাতির বসতি স্থাপনের সুযোগ প্রদান করে কাশ্মীরিদেরকে কাশ্মীরে সংখ্যালঘুতে পরিণত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। ঠিক একই পরিকল্পনায় নেতানিয়াহু সিরিয়ানদের গোলান মালভূমি থেকে উচ্ছেদ করে সেখানে ইহুদি বসতি গড়ে তুলছেন এবং পশ্চিমতীর ও জেরুজালেম থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে সেখানেও ইহুদিদের বসতি গড়ে তুলছেন। মোদি এবং নেতানিয়াহু দেখা হলেই জড়াজড়ি করে পরস্পর হরিহর আত্মা হিসেবে প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন।
আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন দুই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানের জন্য। কিন্তু নেতানিয়াহু দীর্ঘ ১৬ বছর ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী। দুই রাষ্ট্রতত্ত্বের বিরোধী তিনি। নেতানিয়াহু দুই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে নস্যাৎ করে দেয়ার প্রচেষ্টা আরম্ভ করেছেন এবং এ বিষয়ে তাকে সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। জেরুজালেম ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত জর্ডানের অধিকারে ছিল। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ইসরায়েল জর্ডান নদীর পশ্চিমতীর ও জেরুজালেম অধিকার করে নেয়। গোলান মালভূমিও একই কায়দায় ইসরায়েল দখল করেছে। পূর্বে এটি সিরিয়ার অংশ ছিল।
এখন জেরুজালেম অর্থাৎ জর্দান নদীর পশ্চিম তীর এবং গোলান মালভূমি নেতানিয়াহু ইসরায়েল রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন। বিষয়টা জাতিসংঘের বিচারাধীন। জাতিসংঘ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশ এর নিন্দা জানিয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প নেতানিয়াহুর এই উদ্যোগকে সমর্থন দিয়েছেন।
ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর আমেরিকাকে একটি বর্ণবাদী, জাতীয়তাবাদী দেশ বানানোর অব্যাহত চেষ্টা করছেন। সম্পূর্ণ অভিবাসী রাষ্ট্র আমেরিকাকে তিনি অভিবাসীবিরোধী রাষ্ট্র বানাতে চাচ্ছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিশ্বব্যবস্থার প্রতিও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর থেকে আমেরিকা তার ২৪ শতাংশ খরচের টাকা প্রদান করত। এখন ধীরে ধীরে ট্রাম্প তার অনুদানের অংশ কমানো আরম্ভ করেছেন। ট্রাম্প দ্বিতীয়বার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হতে পারলে নির্ধারিত মেম্বারশিপ ছাড়া আর কিছুই হয়তো দেবেন না। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উষ্ণতা বেড়েই যে পৃথিবী ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, একথা ট্রাম্প বিশ্বাসই করেন না।
প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে জলবায়ু চুক্তি হয়। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাতে দস্তখত করেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর আমেরিকার নাম প্রত্যাহার করে নেন। ইরানের পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হওয়ার পথ রুদ্ধ করার জন্য জাতিসংঘের পাঁচ স্থায়ী সদস্য ও জার্মানি দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর ২০১৫ সালে চুক্তি করেছিল। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর সেই চুক্তি হতে তাদের নাম প্রত্যাহার করে নেন। এখন আমেরিকা ইরানের ওপর পুনরায় বাণিজ্য অবরোধ আরোপ করেছে। ইসরায়েল মনে করে মধ্যপ্রাচ্যে এখন তার একমাত্র শত্রু ইরান। তাই ইরানের অবস্থা বিপর্যস্ত করার জন্য নেতানিয়াহুর পরামর্শে ট্রাম্প উঠেপড়ে লেগেছেন। পারস্য উপসাগরে এখন বিস্ফোরণ্মুখ অবস্থা। যেকোনো সময় পারস্য উপসাগরে একটা দুর্ঘটনা সূত্রপাত হতে পারে।
পরিশেষে বলা দরকার- ডোনাল্ড ট্রাম্প, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং নরেন্দ্র মোদি মানবতার শত্রু, বিশ্ব শান্তির শত্রু। এই তিন খলনায়কের পতন না হলে বিশ্ব নিরাপদ হবে না।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

Please follow and like us: