রবি. মে ১৯, ২০১৯

টেলিভিশন

টেলিভিশন

Last Updated on

লিডিয়া ডেভিস : প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমাদের প্রিয় অনুষ্ঠানমালা হত। তারা বলতো এগুলো খুব মজার হবে। সত্যিই হতোও তাই।
তারা আমাদের সংকেত দিয়ে বুুঝিয়ে দিতো অনুষ্ঠানের ধরনটা, এবং সেই মতো অনুষ্ঠানটা হতো। এবং তা যথারীতি মজার ছিল।
যদি আমাদের পাশ দিয়ে মৃত মানুষরা হেঁটে যায় তাহলেও আমাদের পক্ষে এর চেয়ে উত্তেজিত হওয়া সম্ভব না।
আমরা এটার একটা অংশ হতে চাই।
আমরা তাদের স্রোতা হয়ে থাকতে চাই, যাদের সাথে কথা বলে ওরা জানিয়ে দেবে ঐদিন সন্ধ্যায় কি হবে এবং পরের সপ্তাহে কি ধরনের অনুষ্ঠান হতে চলেছে।
আমরা যতক্ষণ না হাপিয়ে উঠি ততক্ষণ বিজ্ঞাপন শুনতাম। ভারাক্রান্ত হতাম দীর্ঘ তালিকায়: তারা আমাদের এতো এতো সব কিনতে বলে, এবং আমরা কিনিও, কিংবা চেষ্টা করি যতটা সম্ভব কেনা যায়, তবে আমাদের তত টাকা ছিল না। তারপরও এটার কার্যকারিতার প্রসংশা না করে পারতাম না।
আমরা কেমন করে অতটা নিশ্চিত হয়, যতটা নিশ্চিত ওরা হতে বলে! এইসব নারীরা খুব নিয়ন্ত্রিত। আমাদের সংসারের নারীদের মতো নয়।
তারপরও আমরা এই দুনিয়াটাকে বিশ্বাস করি।
আমরা মনে করি, এই মানুষগুলো আমাদের সাথেই কথা বলছে।
মার কথায় ধরা যাক, তিনি এক উপস্থাপকের প্রেমে পড়ে গেছেন। এবং আমার স্বামী নির্দিষ্ট কিছু তরুণী রিপোর্টারদের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে কখন ক্যামেরা গিয়ে ঐ তরুণীর বুকের দিকে পড়ে সেই উদ্দেশ্যে।
খবরের পরে, আমাদের একটি কুইজ শো দেখানো হয়, এবং এরপর থাকে একটি গোয়েন্দা কাহিনী।
সময় চলে যায়, আমাদের হার্টবিট চলতে থাকে, এই বাড়ে, এই কমে। একটা কুইজ অনুষ্ঠান আছে খুবই ভালো। দর্শকসারীতে প্রতিদিন একইমানুষ বসে থাকে, তার মুখ আঁটা থাকে, এবং চোখে জল টলটল করে। তার ছেলে আবার উঠে আসছে স্টেজে আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে। ছেলেটি টেলিভিশন ক্যামেরার দিকে পিটপিট করে তাকায়। তারা তাকে সব প্রশ্নের উত্তর জানাতে দেবে না, যদি সে ফাইনালে সব টাকা জিতে নেয় এই ভয়ে। আমরা ছেলেটিকে নিয়ে অত ভাবি না, এবং ঐ বাজে দাঁত বের করে হাসতে থাকা মাকে আমাদের পছন্দ হতো না। তবে আমরা ঐ বাবার দ্বারা আবেগ তাড়িত হতাম: তার ভারি ঠোঁট, ভেজা চোখ।
তাই আমরা এই অনুষ্ঠানটি চলাকালে টেলিফোন বন্ধ করে রাখতাম। এবং দরজায় কেউ কখননো কড়া নাড়তে খুলতে যেতাম না। আমরা খুব কাছ থেকে দেখতাম। আমার স্বামী তখন দুই ঠোঁট চেপে এত লম্বা করে হাসি দিতো যে চোখদুটি প্রায় হারিয়ে যেত। আর আমি ঐ মায়ের মতো দাঁত বের করে বসে থাকতাম।

২.
এমনটি নয় যে আমি এই পুলিশদের অনুষ্ঠানটির ভক্ত ছিলাম, ব্যাপারটা হলো এটা আমার কাছে আমার নিজের জীবনের চেয়েও বাস্তব মনে হতো।
সমস্ত সন্ধ্যা বিভিন্ন চ্যানেল ঘুরে ঘুরে, মাঝে মাঝে আমি ঐ পুলিশ-ড্্রামাগুলোকে দেখতে চাইতাম। আবার কখনো কখনো টেলিভিশনের তথ্যচিত্রগুলো দেখতাম, যেমন একটার নাম হলো সুয়াম্প ক্রিটার্স।
রাতে আমার একাকিত্ব, বাইরের অন্ধকার, নৈঃশব্দ, ক্রমবর্ধমান রাত এসব বিষয়গুলো টেলিভিশনের অনুষ্ঠানকে আরও উপভোগ্য করে তুলতো। গল্পের কাহিনী বিন্যাসের সাথেও এটার একধরনের সম্পর্ক আছে: আজ রাতে বহুবছর পর একটা ছেলে বাড়ি ফিরে আসলো এবং বাবার স্ত্রীকে বিয়ে করলো, মহিলা তার সৎ মা ছিল।
আমরা খুব আগ্রহের সাথে এই অনুষ্ঠানগুলো দেখতাম, কেননা মনে হতো এই কাজগুলো এখন স্মার্ট এবং ফ্যাশান সচেতন মানুষগুলো করে বেড়ায়।
আমি মনে করি, এটা দেয়ালের ওপাশের একটি টেলিভিশনের স্বর, সন্ধ্যার আগে ঘরে ফেরা সারিসারি সাদা বকের শব্দের মতো।
তুমি দেখতে পাও সুসান স্মিথ নামের এক অল্পবয়স্ক মেয়ে হকি খেলা শুরুও আগে গলায় মুক্তার হার পরে কানাডার জাতীয় সংগীত গায়। তুমি গানটি শেষ পর্যন্ত শোনো, তারপর তুমি চ্যানেল বদলাও।
অথবা তুমি যা করতে চাও এটা তা না। আবার তুমি সময় পার করছো তাও না।
তুমি একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করছো, অথবা তুমি ঘুম না আসা পর্যন্ত চালিয়ে যেতে চাও।
পরের দিনের আবহাওয়া সংবাদ জানতে পারার মাঝে সত্যিই একটা ভালো লাগা আছে: কত বেগে বাতাস বয়ে যাবে, কোনদিকে যাবে, বৃষ্টি কখন হবে, কখন মেঘ সরে যাবে এইসব আরকি! এবং এর সঠিক গাণিতিক সম্ভাবনা, যেমন চল্লিশে চল্লিশ, খুব মজা দিতো।

৩.
প্রায়ই দিনের শেষভাগে, যখন আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ি, আমার জীবনটা একটা মুভিতে পরিণত হয়েছে বলে মনে হয়। এবং জীবন আমার কাছে থেকে যথেষ্ট দূরে সরে যায় অদ্ভূত হতে, মুভি হতে। এরপর এটা এতটা জটিল হয়ে যায় যে বোঝা মুশকিল হয়ে পড়ে, যে আমি ভিন্ন একটা মুভি দেখতে চাই। টিভির জন্যে নির্মিত কোন মুভি আমি দেখতে চাই, যেটা খুব সাবলিল হবে এবং সহজে বোঝা যাবে। এটা ধ্বংস, অক্ষমতা ও রোগ নিয়ে হলেও ক্ষতি নেই। এটা অনেক কিছু এড়িয়ে যাবে, এটা সবধরনের জটিলতাকে এড়িয়ে যাবে কেননা মূল ঘটনাগুলোর জন্যে প্রস্তুত করার মতো যথেষ্ট সময় এই বাঁধাধরা ১ঘণ্টা ২০মিনিটের ভেতর পাওয়া যায় না। এর ভেতর আবার বিজ্ঞাপন বিরতির কথা মাথায় রাখতে হয়, এবং আমরা প্রধান ঘটনাগুলো চাই।
একটা মুভি ছিল আলজিমারস রোগে আক্রান্ত এক মহিলা প্রফেসরকে নিয়ে। একটা ছিল ওলেম্পিক গেমস-এ অংশ নেওয়া একজন স্কিয়ারকে নিয়ে, সে তার একপা হারিয়ে বসে, তারপর আবার স্কি করতে শেখে। আজ রাতেরটা ছিল এক বধির মানুষকে নিয়ে, যে তার স্পিস থেরাপিস্ট-এর প্রেমে পড়ে যায়। আমি আগেই ধরতে পেরেছিলাম, কারণ মেয়েটি খুব সুন্দর ছিল, যদিও ভালো অভিনেত্রী ছিল না। এবং বধির লোকটি ছিল হ্যান্ডসাম, যদিও বধির। সে ছবির শুরু ও শেষে বধির হয়ে যায়, আর মাঝখানে সে শুনতে পেত এবং একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভাষায় কথা বলা শিখছিল। একঘণ্টা বিশ মিনিট সময়ের ভেতরে, এইলোকটি শুধুমাত্র শুনতে শেখার পর আবার বধিরই হয়নি, বরং তার প্রতিভা দিয়ে তৈরি করেছে এক সফল ব্যবসা, যা আবার কোম্পানির এক ব্যাক্তি ছলচাতুরি করে তার সাথে ছিনিয়ে নেয়। তাছাড়াও এসবেরই মধ্যে সে প্রেমে পড়ে এবং সিনেমার শেষ অবধি তার প্রেমিকাকে পাওয়ার জন্যে অপেক্ষা করে। এবং একপর্যায়ে সে হারায় তার কৌমার্য। শ্রবনশক্তিসম্পন্ন হলে ব্যাপারটা সহজ ছিল, কিন্তু একজন বধির হিসেবে কৌমার্য হারানোটা হয়তবা কঠিনই হবে।
এসবকিছুই সঙ্কুচিত হয়েছিল আমার জীবন থেকে একটি দিনের ঠিক শেষটুকুতে যা কিনা সন্ধ্যা ঘন হতে থাকার মুহূর্তে, আমার থেকে কোনো দূরে, হারিয়েও গিয়েছিল ততক্ষণে।

Please follow and like us:
0