Published On: বুধবার ১৩ জুন, ২০১৮

টানা বর্ষণে সৃষ্ট বন্যা ও পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে রোহিঙ্গারা

প্রত্যাশা ডেস্ক : কয়েকদিনের টানা বর্ষণে সৃষ্ট বন্যা আর পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে রয়েছেন এখনো ৩১ হাজার রোহিঙ্গা। গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া ভারী বর্ষণে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালি ক্যাম্পের কয়েকটি ব্লক ও টেকনাফের উনচিপ্রাংয়ের একাংশের রোহিঙ্গারা। জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা আইওএম’র দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ক্যাম্পে ভূমিধস, ঝড়ো বাতাসে তাবু উঠে যাওয়া, পানিতে ক্যাম্প তলিয়ে যাওয়া এবং বজ্রপাতসহ ৫৯টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৯ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু আক্রান্ত হয়েছেন। অবিরাম বর্ষণ অব্যাহত থাকায় এটি মানবিক বিপর্যয় হিসেবে দেখা দিতে পারে বলেও মন্তব্য করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিকারুজাম্মান বলেন, ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে বালুখালির রোহিঙ্গা ক্যাম্প পানিতে তলিয়ে গেছে। তাদেরকে নিরাপদ স্থানে সরানো হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ভারী বর্ষণে মাটির দেয়াল চাপায় উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ই-৩এফএফ জোনের বাসিন্দা আবদু শুক্কুরের তিন বছরের শিশু সন্তান আবদুর রহমান হারেছ মারা গেছে। আহত হয়েছে নিহতের মা আছিয়া খাতুন (৩৫)। কক্সবাজার বন বিভাগের কর্মকর্তা (দক্ষিণ) আলী কবির বাবলু বলেন, নতুন ও পুরাতন মিলিয়ে ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে হাজারো পাহাড় কাঁটা হয়েছে। গাছপালা শূন্য করে এসব পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে রোহিঙ্গা শিবির। তাই মাটি দুর্বল হয়ে গেছে। ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি থাকবেই। এদিকে পাহাড় ধস আর ঢলের কবল থেকে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের বাঁচাতে সরকার ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সেবা সংস্থা বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কক্সবাজারের সিভিল সার্জন আবদুস সালাম বলেন, বর্ষাকালে রোহিঙ্গাদের বিশুদ্ধ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শ, সুরক্ষা এবং আশ্রয় নিশ্চিতকরণে কাজ করছে সরকার ও সেবা সংস্থাগুলো। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম বলেন, বর্ষণের কারণে পাহাড় ধস আর বন্যার ঝুঁকিতে থাকবে রোহিঙ্গারা, এমন তথ্য আমাদের কাছে আগেই ছিল। আমরা সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছি। এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গাকে পাহাড় ধস থেকে বাঁচাতে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছি। তিনি আরো বলেন, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইএমওর সহায়তায় গত ৫ জানুয়ারি থেকে ২৫ হাজার রোহিঙ্গাকে (৫১৯৬ পরিবার) নিরাপদ স্থানে সরানো হয়েছে। চলতি মাসে আরো ৭ হাজার ২৪৮ জনকে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হবে। এ ছাড়া একই সংস্থার সহযোগিতায় টেকনাফের উনচিপ্রাং ক্যাম্পের ৭৮৭টি পরিবারকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এদিকে আইওএম’র এর সাইট ম্যানেজার মোহাম্মদ মানুন বলেন, উনচিপ্রাংয়ে এখনো ৬৫টি রোহিঙ্গা পরিবার পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের মধ্যে ১৯টি পরিবারকে আপাতত শিক্ষাকেন্দ্র ও শিশুবান্ধব স্থানগুলোতে স্থানান্তর করা হয়েছে। বৃষ্টি থামলে নতুন জায়গায় সরানো হবে তাদের। কক্সবাজারে আইওএম এর জরুরি সমন্বয়ক ম্যানুয়েল পেরেইরা বলেন, ‘প্রতি ফোঁটা বৃষ্টিতেই ঝুঁকি বাড়ছে রোহিঙ্গাদের। রোহিঙ্গা শিবিরের পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। পাহাড়ি জমিতে এক মিলিয়ন লোক বাস করে। আমরা তাদের জীবন বাঁচানোর জন্য লড়ছি। এজন্য আমাদের আরো টাকা দরকার। তিনি আরো বলেন, ১৮৬.৮ একর জমিতে আমরা নতুন করে একটি আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করছি। যেখানে ৭ হাজার লোক বাস করতে পারবেন। এদিকে, বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাব ও পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। স্যানিটেশন ব্যবস্থা নষ্ট হওয়া যাওয়া ও যোগযোগহীনতার কারণে রোহিঙ্গাদের এখন ত্রাহি অবস্থা। এ বিষয়ে কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সাইট পরিচালনা প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, টানা বৃষ্টিতে পাহাড় ধস, পানিতে ক্যাম্প তলিয়ে যাওয়া, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, বানের ¯্রােতে আশ্রয়কেন্দ্র ভেসে যাওয়া, বজ্রপাতসহ গত পাঁচদিনে শতাধিক ঘটনা ঘটেছে। এতে রোহিঙ্গাদের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সূত্র জানায়, শনিবার থেকে বুধবার পর্যন্ত উখিয়া ও টেকনাফে গড়ে ১৪৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। যাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গার জনজীবন। তবে বৃষ্টিপাতে যে ক্ষতি হয়েছে তা এখনও অফিসিয়ালি প্রকাশ করা হয়নি। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তাদানকারী সংস্থা (রেডক্রস) ও স্বেচ্ছসেবী সংস্থা রেডক্রিসেন্ট কর্মীসহ বিভিন্ন সেবা সংস্থার কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভারী বর্ষণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কিছু এলাকা বর্তমানে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে কুতুপালং ৫ ও ৬ বালুখালী ১ এবং ২ এর ক্যাম্পে অধিকাংশ আশ্রয়কেন্দ্র। চলতি সপ্তাহে বৃষ্টিতে নড়বড়ে হয়ে থাকা পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে ভূমিধস হয়। এরমধ্যে কুতুপালংয়ে পাহাড় ধসে এক শিশু নিহত হয়। ওইসময় তার মা আহত হন। এ ছাড়া ১৩ জুন সকালে শফিউল্লাহ কাটায় পাহাড়ধসে ৪ জন আহত হয়েছেন। এ বিষয়ে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেডক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের (আইএফআরসি) কক্সবাজার উপ-অফিসের প্রধান সঞ্জীব কাফে বলেন, গত ৯ জুন থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে গড়ে ১৩৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। যাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ৬ লাখ ৯৩ হাজার রোহিঙ্গার স্বাভাবিক জীবন। টয়লেট ও খাবার পানির সংকটে জীবনযাপন করছেন তারা। তিনি আরও বলেন, বানের পানির সঙ্গে ময়ল ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এককার হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সে কারণে ক্যাম্পগুলোতে বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এটি উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Videos