জ্বলতেই থাকুক আলো, বিদূরিত হোক অন্ধকার

Last Updated on

অধ্যাপক ড. সাহেদা আখতার : চট্টগাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। আমার দেখা এক সৌম্যকান্তি জন। ভাষা অন্তর্গতপ্রাণ জন। ক্যাম্পাসে যখন যার সাথেই দেখা হলো, সালামের জবাবে স্মিত হাস্যে প্রমিত উচ্চারণে জানতে চাইবেন ‘ভালো?
প্রফেসর ড. মনিরুজ্জামান। প্রাক্তন অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, নির্বাহী পরিচালক, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা, ডীন, কলা অনুষদ, চেয়ারপার্সন, নজরুল চেয়ার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
আমার এম.ফিল গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক। তাঁর হাত ধরে আমার গবেষণার হাতেখড়ি। বিভাগ, দণি ক্যাম্পাসের কোয়ার্টার এবং নিজ বাড়ি সর্বত্রই ছিলো আমার অবাধ যাতায়াত। ছিলো ওপেন বুক সেলফ লাইব্রেরি ব্যবহারের অবারিত সুযোগ।
বাসায় দিকনির্দেশনার মাঝেই ডেকে বলতেন, ‘শুনছো, সাহেদা এসেছে।’ পরিপাটি বেশে স্বনামখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী আবদুল হাইকন্যা পরম শ্রদ্ধেয় হাসিন জাহান ঢুকতেন ট্রে হাতে।
পায়েস যে কেবলই দুধময় হতে পারে, পুডিং যে এতো লোভনীয় হতে পারে, মমতা মেশানো হাতের ছোঁয়া স্পর্শে তা জেনেছি। প্রসঙ্গ আসলেই ভাবী বলতেন, ‘তোমার স্যার খুব মিষ্টি পছন্দ করেন।’
স্নেহের কমতি ছিলোনা, ছিলোনা ভালোবাসার। অনেক সময় ব্যাগ হাতে হল হতে বের হতাম। উদ্দেশ্য, স্যারের বাসা হয়ে শহরে ফেরা। গৃহকর্মীকে সাথে দিয়ে ব্যাগের ভারসহ আমাকে শহরমুখী শিকবাসে তুলে দিতেন প্রতিনিয়ত।
ফোনালাপে সীমাবদ্ধ ছিলোনা শিক শিার্থী সম্পর্ক। পত্রালাপও হতো নিয়মিত। মনে পড়ে ডান হাতে ব্যথা, হয়েছিলেন সব্যসাচী। স্যার বাম হাতে আমাকে চিঠি লিখেছেন। পরামর্শ দিতেন, ভুলগুলো শুধরে দিতেন। খসড়া কপিতে নিজ হাতে লিখেও দিতেন।
স্যারের বন্ধু ব্রিটিশ কবি উইলিয়ম রাদিচে এসেছেন, আমার দেখা প্রথম বার। আমাকে দেখা করতে বললেন, গেলাম না। লুকিয়ে ছিলাম, ভয় ছিলো ইংরেজিতে কথা বলবো কী করে। স্যার ডেকে পাঠালেন, নির্ভয়ে সমস্যার কথা জানালাম। স্যার তখন হো হো করে খুব হাসলেন। জানলাম রাদিচে বাংলাভাষী। কত স্মৃতি বৃটিশ কবিকে নিয়ে।
স্যার সিলেট এসেছেন, বাসায় আনতে পেরেছি। বিভাগে প্রফেসর ড. মনিরুজ্জামান স্যারকে নিয়ে ভাষাবিজ্ঞান বিষয়ক সেমিনার করতে পেরেছি। ঋদ্ধ হয়েছে আমার শিার্থীরা, তৃপ্তিকণা মিলেছে আমার।
প্রমি আর দোলাকে নিয়ে ছিলো স্যারের সুখের জীবন। একদিন দোলা স্কুল বাসে উঠেই মনে করেছিলো ঘরে রেখে আসা ফুলের তোড়ার কথা। চলতে থাকা গাড়ি হতে তাড়া করে নামতে যেয়ে কিশোরী মেয়েটি গিয়েছিলো চিরতরে হারিয়ে।
কী নির্মম পরম্পরা। বিশিষ্ট ভাষাবিজ্ঞানী প্রফেসর আবদুল হাই যিনি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। প্রিয়ভাষিণী হাসিন জাহান আজও বয়ে বেড়ান পিতা আর কন্যা হারানোর বেদনা। দণি ক্যাম্পাসের ‘দোলা সরণী’ নাম নিয়ে সে সড়কটিও যেন ধারণ করে আছে বিষাদময় স্মৃতি।
আজ অবধি যোগাযোগ আছে স্যারের সাথে, ভাবীর সাথে। স্যার কিছুটা অসুস্থ। দোয়া চান।
কাল ছিলো ‘বিশ্ব বই দিবস’। ‘কালের কণ্ঠ’র শেষ পৃষ্ঠায় ‘নরসিংদীতে মিনি শান্তিনিকেতন’ শিরোনামে সংবাদটি আমাকে আবেগাপ্লুত করেছে।
‘আদিয়াবাদ’, ‘আদিয়াবাদ সাহিত্যভবন ও ভাষাতত্ত্ব কেন্দ্র’ এবং সর্বোপরি এসবের নিউকিয়াস প্রফেসর ড. মনিরুজ্জামান। যাঁর কাছে আমার আকণ্ঠ ঋণ। ভালোবাসার ঋণ। অপরিশোধ্য ঋণ।
‘একমাত্র সন্তান সস্ত্রীক আমেরিকা প্রবাসী। আইটি বিজ্ঞানী হিসেবে বই নয়, পিসি, সফটওয়্যার কিংবা গ্রাফিক্স এনিমেশন নিয়ে সময় কাটে তার।’ (কালের কণ্ঠ)
প্রফেসর ড. মনিরুজ্জামান আদিয়াবাদে গড়ে তুলেছেন বইয়ের জগত, মিনি শান্তিনিকেতন। এ জগত আগলে আছেন কর্ণধার। আরো বহুদিন বেঁচে থাকুন জ্ঞানতাপস। জ্বলতেই থাকুক আলো। বিদূরিত হোক অন্ধকার।

Please follow and like us:
3
20
fb-share-icon20
Please wait 10 second