জীবনের এপার ওপার

জীবনের এপার ওপার

ডা. বিএম আতিকুজ্জামান : মিসেস নেহা চুপচাপ বসে আছেন। দিনের শেষ রোগী তিনি। তার হাত আলতো করে ধরে আছে অমল মেহতার হাত। সাধারণত আমার সামনে তারা হাত ধরাধরি করে বসেন না। আজ বসেছেন। মেহতা সাহেব বসে আছেন হুইল চেয়ারে।
মেহতা সাহেবের বয়স আশি ছুঁই ছুঁই করছে। এখনো মাথায় অনেক চুল। সব ধবধবে সাদা। খানিকটা ক্লান্তি তার চোখে-মুখে। সবসময়ই পরিপাটি করে পোশাক পরে আসেন এ দম্পতি। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
গত একবছরে মেহতা সাহেবের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হয়েছে। স্মৃতিশক্তিও কমেছে একইভাবে। এখন তিনি আপনজনকে চিনতে পারেন না। আমাকেও চিনতে পারেন না। মাঝেমধ্যে প্রলাপ বকেন। আজকাল প্রায়ই ভুলে যান নিজের বাড়িতে আছেন। নিজের বাড়িতে বসেই তিনি নিজের বাড়ি খুঁজতে বের হয়ে যেতে চান। মিসেস নেহা তার পরিচর্যা করতে যেয়ে ক্লান্ত। তাদের দুজন সন্তানই চিকিৎসক। দুজনই খুব বিখ্যাত দুটি মেডিকেল ইনস্টিটিউশনে কাজ করছেন। একজন নিউইয়র্ক, আরেকজন বোস্টনে। তার সন্তানরা প্রায়ই এখানে আসেন। কিন্তু কোভিড অতিমারির কারণে আজকাল চাইলেও সেভাবে আসতে পারেন না তারা। মিসেস নেহা কোভিড ইনফেকশনের ভয়ে কোনো নার্স বা তাদের পরিচর্যাকারীদের ঘরে ডাকেন না। কিন্তু এখন তিনি খুব ক্লান্ত। দীর্ঘদিন ধরে অরল্যান্ডোর চমৎকার এক লোকালয়ে বসবাস করছেন তারা। দুজন সন্তানকে নিয়ে বড় এই বাড়িতে তারা আছেন গত চার দশক ধরে। বাড়ির চারদিকে শখ করে অনেক ফলের গাছ লাগিয়েছেন তারা। প্রতিবেশীরা হয়ে গেছেন পরমাত্মীয়। কিন্তু আজকাল তাদের দেখেন না তারা। এই প্রথম মিসেস নেহা খুব শঙ্কিত। তিনি আর পারছেন না। আজকাল অমল মেহতার দিকে তাকিয়ে তিনি অসহায়বোধ করেন। প্রাণে ভরপুর এই ডাকসাইটে সার্জনকে তিনি খোঁজেন। কিন্তু খুঁজে পান না। এখন তিনি খুব গভীরভাবে চিন্তা করেছেন একটি দীর্ঘমেয়াদি কেয়ারহোমে চলে যাওয়ার জন্য। বাসার কাছে লেকের ওপর একটি একরুমের কেয়ারহোম খুঁজে পেয়েছেন তিনি। এক চিলতে বারান্দা আছে। নার্স, সাহায্যকারী সবাই আছে ওখানে। রান্নাবান্নার ঝামেলা নেই। ডাক্তাররাও আসবে তাদের সেখানে দেখতে। আমার মতামত চাইতে এসেছেন তিনি। আমি খুব অস্বস্তিবোধ করছি। কী বলব ভেবে পাচ্ছি না। জীবন বড় হতে হতে আবার ছোট হয়ে যায়। সব প্রাপ্তিগুলো অচল হয়ে যায়। একসময় মিলিয়ে যায়।
লেখক : কলামিস্ট

Please follow and like us: