সোম. ডিসে ৯, ২০১৯

জাতীয় শোক দিবস, কাঁদো বাঙালি কাঁদো

জাতীয় শোক দিবস, কাঁদো বাঙালি কাঁদো

Last Updated on

বিশেষ প্রতিনিধি : শোকাবহ ১৫ আগস্ট, জাতীয় শোক দিবস আজ। বাঙালি জাতির শোকের দিন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে সংঘটিত হয়েছিল ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। ৪৪ বছর আগে এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করেছিল চক্রান্তকারী কিছু সেনাসদস্য। ঘাতকেরা নারী এবং শিশুদেরও রেহাই দেয়নি। আজ যথাযথ মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মাধ্যমে জাতীয় শোক দিবস ও বঙ্গবন্ধুর ৪০তম শাহাদতবার্ষিকী পালনের জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলাদা বাণী দিয়েছেন। আজ সরকারি ছুটি। সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি ভবনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতেও জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে এবং আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে।
সে রাতে যাঁদের হত্যা করা হয়েছিল: বঙ্গবন্ধু ছাড়াও ১৫ আগস্ট রাতে তাঁর ধানমন্ডির বাড়িতে তাঁর সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশুপুত্র শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসের, বঙ্গবন্ধুর ফোন পেয়ে তাঁর জীবন বাঁচাতে ছুটে আসা কর্নেল জামিল, এসবির কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান, সেনাসদস্য সৈয়দ মাহবুবুল হককে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর ভাগনে যুবলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মণির বাসায় হামলা চালিয়ে তাঁকে, তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি, বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায় হামলা করে তাঁকে ও তাঁর কন্যা বেবী, পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত বাবু, সেরনিয়াবাতের বড় ভাইয়ের ছেলে সজীব সেরনিয়াবাত এবং এক আত্মীয় রেন্টু খানকে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবার এবং নিকটাত্মীয়সহ মোট ২৬ জনকে ওই রাতে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সে সময় তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করায় তাঁরা বেঁচে যান।
আজ টুঙ্গিপাড়া যাবেন প্রধানমন্ত্রী : আজ বৃহস্পতিবার টুঙ্গিপাড়া যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতির পিতার ৪৪তম শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবসে জাতির পিতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে এবং সেখানে অন্যান্য কর্মসূচিতে যোগ দিতে আজ বৃহস্পতিবার গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া সফর করবেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী জাতীয় শোক দিবসের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ শেষে বিকেলে ঢাকায় ফিরবেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী বৃহস্পতিবার সকালে বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর পৈতৃক বাড়ির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী জাতীয় শোক দিবসের কর্মসূচির অংশ হিসেবে সকালে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এরপর তিনি বনানী কবরস্থানে ১৫ আগস্টের হত্যাযজ্ঞে নিহত শহীদদের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং ফাতেহা ও মোনাজাতে শরিক হবেন। প্রধানমন্ত্রী টুঙ্গিপাড়া হেলিপ্যাডে পৌঁছে সরাসরি বঙ্গবন্ধুর মাজারে গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু এবং ১৫ আগস্টের হত্যাযজ্ঞে নিহত অন্যান্য শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে ফাতেহা ও মোনাজাতে অংশ নেবেন। অনুষ্ঠানে এর আগে তিন বাহিনীর একটি চৌকষ দল প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অব অনার প্রদান করবে। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, দলের নেতাকর্মীরা মাজার প্রাঙ্গণে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসন আয়োজিত মিলাদ ও দোয়া মাহফিলে যোগ দেবেন।
শোক দিবসে ধানম-ি ৩২ নম্বর এলাকায় যান চলাচলে নির্দেশনা : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী এবং জাতীয় শোক দিবসের দিন ধানম-ির ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর এলাকায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করবে পুলিশ। রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিপরিষদ সদস্যসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের স্বার্থে বৃহস্পতিবার ভোর থেকে অনুষ্ঠান শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংলগ্ন সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রিত থাকবে বলে ঢাকা মহানগর পুলিশ জানিয়েছে।
রাজধানীতে যান চলাচলে নির্দেশনা: মিরপুরের গাবতলী থেকে আগত রাসেল স্কোয়ার-আজিমপুর অভিমুখী যাত্রীবাহী যানবাহন মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে ধানম-ি ২৭ নম্বর সড়কের ডানে মোড় নিয়ে শংকর-জিগাতলা-সাইন্সল্যাব হয়ে গন্তব্যে যাবে। নিউমার্কেট ও সায়েন্স ল্যাব হয়ে রাসেল স্কোয়ার অভিমুখী যাত্রাবাহী যানবাহন ধানম-ি ২ নম্বর রোড থেকে বামে মোড় নিয়ে জিগাতলা-শংকর হয়ে নিদিষ্ট গন্তব্যে যাবে। রেইনবো এফডিসি হয়ে রাসেল স্কোয়ার অভিমুখী যাত্রীবাহী বাস সোনারগাঁও ক্রসিং দিয়ে বাংলামটর হয়ে শাহবাগ দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাবে। যারা ৩২ নম্বরে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আসবেন তারা মানিক মিয়া এভিনিউ- ধানম-ি ২৭-মেট্রো শপিং মলের ডানের মোড়- আহসানিয়া মিশন ক্রসিং বামে মোড়- ৩২ নং সড়কের পশ্চিম পাশে যাবেন। এ ক্ষেত্রে পতাকাবাহী, পিজিআর, এসএসএফ, ফায়ার সার্ভিস, বাহিনীর প্রধানসহ আইজিপি ও সচিব পদ মর্যাদার সকল গাড়ি ৩২ নং ব্রিজের উত্তরের ১১ নং রোডের উত্তর ও পশ্চিম পাশে অবস্থান নেবে। সাংসদসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সকল গাড়ি থাকবে ৩২ নং ব্রিজের দক্ষিণে পূর্ব ও পশ্চিম পাশে এবং আইন-শৃংখলা বাহিনীর সকল গাড়ি থাকবে আহসানিয়া মিশনের উত্তর পাশে। পুলিশ কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া এ ব্যাপারে সকলকে সহযোগিতা করার আহ্বান করেছেন।
রাজধানীতে কঠোর নিরাপত্তা: জাতীয় শোক দিবস ১৫ আগস্টে রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২, বঙ্গবন্ধু জাদুঘর ও বনানী কবরস্থানসহ পুরো ঢাকা নগরীজুড়ে নিñিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া গতকাল বুধবার রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২-এ জাতীয় শোক দিবসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন শেষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন। তিনি বলেন, শোক দিবসের নানা অনুষ্ঠান যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপনে ঢাকা মহানগরীজুড়ে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা বলবৎ থাকবে। শোক দিবস উপলক্ষে শহীদদের উদ্দেশে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, এমপিসহ সামরিক-বেসামরিক ও কূটনীতিকরা। তাদের নিরাপত্তায় কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার বলেন, পুরো ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকা নিরাপত্তার স্বার্থে সিসি ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। চেকপোস্ট ও আর্চওয়ে পেরিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে সবাইকে যেতে হবে। এর আগে (ডিএমপি) কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া পুরো এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন করেন। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম, কৃঞ্চপদ রায়, মীর রেজাউল আলম ও আবদুল বাতেন। ধানমন্ডি ৩২-এ বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানাতে আসা সর্বস্তরের মানুষকে শৃঙ্খলার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতার অনুরোধ জানিয়ে আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে ডগ স্কোয়াড দিয়ে সুইপিং করা হবে। শোক দিবসে শ্রদ্ধা জানাতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকার শৃঙ্খলার স্বার্থে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও যান চলাচলে নতুন নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নিরাপত্তায় নির্ধারিত পোশাকে ও সাদা পোশাকে পুলিশ, র‌্যাবের সদস্যরা সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকবেন। তিনি আরো বলেন, ভিভিআইপিদের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে উন্মুক্ত করে দেয়া হবে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকা। তবে, সবাইকে আর্চওয়ে ও তল্লাশির মধ্য দিয়ে ঢুকতে হবে। ডিএমপি কমিশনার জানান, ভিভিআইপিদের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক-নেতাকর্মীরা রাসেল স্কয়ার দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে পারবেন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে পশ্চিম প্রান্ত দিয়ে বেরিয়ে যাবেন। শ্রদ্ধা নিবেদনের ক্ষেত্রে অনেকে সেলফি বা ছবি তুলতে গিয়ে জটলা পাকান। অন্যান্যের শ্রদ্ধা নিবেদনে সুযোগ করে দিতে সবাইকে যথাসম্ভব দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানান তিনি। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার এ এলাকা যানবাহনমুক্ত থাকবে। সোনারগাঁও ক্রসিং থেকে রাসেল স্কয়ার, সিটি কলেজ থেকে রাসেল স্কয়ার পর্যন্ত ধানমন্ডি ২৭ থেকে রাসেল স্কয়ার পর্যন্ত যানবাহন চলাচল ও পার্কিং বন্ধ থাকবে। নিরাপত্তার স্বার্থে সবাইকে হেঁটে আসতে হবে। ধানমন্ডি লেকেও পাহারা থাকবে। সেখানে নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দা সদস্যরা নিয়োজিত থাকবেন। এছাড়া নগরীজুড়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দুঃস্থদের মধ্যে খাবার বিতরণসহ অজ¯্র অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকবে। সেখানেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে বলেও জানান ডিএমপি কমিশনার।

Please follow and like us:
3