রবি. ডিসে ৮, ২০১৯

জাতিস্মর

জাতিস্মর

Last Updated on

লাবণ্য প্রভা : দাউ দাউ রোদের জ্যোৎস্নায় পুড়ে যাচ্ছে আমাদের নওহর বিল। জলের সাঁতার ছেড়ে মাছেরা ঝাঁকে ঝাঁকে উঠে আসতে থাকে আমাদের বাড়ির বাতায়। রোজ কিয়ামতের আলামত ভেবে গাঁয়ের মানুষেরা ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালাতে থাকে।
কেবল আমি আর আমার জননী পালাই না
চৌকির নিচে মাছদের রেখে আমরা দু’জন পাহারা দেই
এই যে একটি মাত্র মৎস্য আমাদের ঘরের বাতায়, তিনিই আমাদের পূর্ব পুরুষ
ইনিই তোমার পিতা, কন্যা
ইনিই তোমার পিতা
হা ঈশ্বর!
এতোকাল জেনে এসেছি আমি এক প্রজ্ঞাবান মানুষের সন্তান। পিতৃপরিচয় পেয়ে আমি আকুল হই না।তাহলে এক মৎস্যের ঔরসে আমার জন্ম!
আমি এক মৎস্যবালা! তাই হবে বোধ হয়! না হলে পিতা এমন মহান, কী করে পরিত্যাগ করলেন আমায়!
আমি মৎস্যটির চোখে চোখ রাখি
তার চোখে আমি কোনো ছায়া দেখি না
আমি কি তবে তার চোখে ঘন দুঃখের ছায়া কিংবা জলের রেখা দেখতে চেয়েছিলাম!


পঙ্খীরাজ ঘোড়ার ডানা ভেঙে গেছে। মুখ থুবড়ে পড়ে আছে রাক্ষসপুরীর সিংহদুয়ারের সামনে। আমার মাথার ওপর কাঁটা, আর পায়ের নিচেও কাঁটার গালিচা। কাঁটা মাথায় নিয়ে পায়ে দলে পথ অতিক্রম করি; আমি অতিক্রম করি পাপ, পরমাঙ্ক…
রাক্ষসপুরীর চারদিকে জলের পরিখা। ব্যাঙমা-ব্যাঙমী বলেছিল, রাতের কোনো এক প্রহরে পরিখার জল শুকিয়ে যায়। আমি ও আমার ডানাভাঙা পঙ্খীরাজ অপেক্ষা করি, যেন জল সরে যায়। নগ্ন পায়ে ওই পরিখা পার হতে হবে আমায়।
হায়!
মা আমার রাক্ষসপুরীর অলিন্দে দাঁড়িয়ে থাকেন।
এক চন্দ্র
দুই চন্দ্র
তিন চন্দ্র
সহস্র চন্দ্র বৎসর পার হয়ে যায়… আমিও বেড়ে ওঠি রাক্ষসের উদরে। কেবলই বেড়ে উঠি, পালাবার পথ খুঁজে পাই না।
কোনো রাজপুত্র আসে না আমার জন্য। ব্যাঙমা-ব্যাঙমী সারারাত অলৌকিক বৃক্ষের ডালে বসে কাঁদে। তাদের ক্রন্দনে বৃক্ষের পাতা ঝড়ে পড়ে। ঝরা পাতারা সর্প হয়ে বাগানে নৃত্য করে। আমি রাক্ষসের উদরে বসে থাকি, দাঁড়িয়ে থাকি…


কোনোকালেও কোথাও ছিলাম না আমি, কিংবা ছিলাম; জলের চিতায়। তবুও জল তৃষ্ণা আমার। প্রার্থনা শেষে আমি জলের ঈশ্বরের স্তুতি করি, তার জন্য শ্লোক রচনা করি। অথচ প্রতিরাতেই তিনি আমার গৃহ থেকে জলের কলস সরিয়ে নেন।
ঘর ছেড়ে বৃক্ষের কাছে যাই। বৃক্ষ, আদি মাতা আমার, আমাকে তোমার বীজের মাঝে আগলে রাখো।


আমার জননী ছিলেন দেব-বংশীয়া। ভবিষ্যৎ দেখতে পান তিনি।
‘তুই কোনোদিন সুখী হবি না, মা। তোর কোনোদিন জলতেষ্টা মিটবে না।
তুই জন্ম বেহুলা। জানিস তো বেহুলাদের ঘর থাকতে নেই।’
আজন্ম জলের দাসী। পাহারা দেই মৃত স্বামীর হাড়।
মনে পড়ে, কোনো একদিন জল চেয়েছিলাম বলে আগুন খেতে দিয়েছিলেন ঈশ্বর। কুমোর পাড়ায় জলের ঘটি চুরি করতে গিয়ে আমি পাহারাদারের কাছে ধরা পড়ে যাই। পাড়ার লোকেরা আমার কেশ কেটে নেয়। কেশ হারিয়ে আমি বিলাপ করি না। কাটা কেশ নিয়েই মৃত সখীদের সাথে গোল্লাছুট খেলি…


কোনোকালে নাকি ছিলাম জলের ঘূর্ণনে; সমুদ্রের চূর্ণ লবণ। আদি মাতা যিনি তিনি আমার মা নন। আমার কোনো পিতা নেই। কেননা, কোনো পুরুষের বীর্যে আমার জন্ম হয়নি। আমি সজাত সম্ভূতা। মায়ের গর্ভে নয়, চোখের ভেতর ছিলাম আমি। ধীরে ধীরে তার চোখের ভেতর বেড়ে উঠি। মা আমাকে চোখ থেকে তার মগজে রাখেন। আমি মায়ের মগজ থেকে পৃথিবীর পাঠ নেই…

Please follow and like us:
3