ছাদ বাগানে ড্রাগন ফল চাষ

ছাদ বাগানে ড্রাগন ফল চাষ

কৃষিবিদ জিয়াউল হক : কল্পকাহিনির ড্রাগন নয়, সুস্বাদু ও লোভনীয় ফল ড্রাগন। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফলটি মূলত ভিনদেশি হলেও এখন দেশেই চাষ হচ্ছে। ড্রাগন ফলের সুখ্যাতি এখন সব জায়গায়। খুব সহজেই বাড়ির আঙিনা বা ছাদে ফলটি চাষ করা যায়। ড্রাগন ফলের গাছ লতানো, মাংসল ও খাঁজকাটা। লোহা, কাঠ বা সিমেন্টের খুঁটি বেয়ে এটি বড় হতে পারে। আসুন জেনে নেই কিভাবে খুব সহজে বাড়ির ছাদে ড্রাগন ফল চাষ করা যায়-

উৎপত্তি ও বিস্তার: ড্রাগন মূলত আমেরিকার একটি প্রসিদ্ধ ফল, যা বর্তমানে বাংলাদেশেও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। আমাদের দেশে ২০০৭ সালে প্রথম থাইল্যান্ড, ফ্লোরিডা ও ভিয়েতনাম থেকে এ ফলের বিভিন্ন জাত আনা হয়। নরম শাঁস ও মিষ্ট গন্ধযুক্ত গোলাপি বর্ণের এ ফল খেতে অনেক সুস্বাদু। তার সাথে ভিটামিন সি, মিনারেল পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ ও ফাইবারের উৎকৃষ্ট উৎস। ড্রাগন ফল গাছ ক্যাকটাস সদৃশ। আমাদের দেশের আবহাওয়া ড্রাগন ফল চাষের জন্য উপযোগী। চাইলে বাড়ির ছাদে বড় টবে বা ড্রামে ড্রাগন চাষ করতে পারেন।
যেভাবে চাষ করবেন: সারা বছরই ড্রাগন ফল চাষ করা যায়। তবে ছাদ বাগানে ড্রাগন ফল চাষ করে ভালো ফলন পেতে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাসে চারা রোপণ করাই উত্তম। প্রায় সব ধরনের মাটিতেই ড্রাগন ফল চাষ করা যায়। তবে জৈবপদার্থ সমৃদ্ধ বেলে দোআঁশ মাটি ড্রাগন চাষের জন্য উত্তম। ড্রাগন সাধারণত গাছের কাটিং লাগানো হয়। টবে ড্রাগন ফলের কাটিং লাগানোর জন্য ২০ ইঞ্চি ড্রাম বা টব সংগ্রহ করতে হবে। কারণ এ আকারের ড্রামে চারা ভালোভাবে শিকড় ছড়াতে পারবে আর তাতে ফলনও অনেক ভালো হবে। টবে বা ড্রামে যাতে পানি না জমে সে জন্য ড্রামের তলায় ৪-৫টি ছোট ছিদ্র করে নিতে হবে এবং ছিদ্রগুলো ইটের ছোট ছোট টুকরা দিয়ে বন্ধ করে দিতে হবে।
মাটি তৈরি: ড্রাম বা টবের ২ ভাগ বেলে দোআঁশ মাটি, ১ ভাগ গোবর, ৪০-৫০ গ্রাম টিএসপি সার এবং ৪০-৫০ গ্রাম পটাশ সার মিশিয়ে টব বা ড্রাম এমনভাবে ভর্তি করতে হবে, যেন উপরে পানি দেওয়ার জন্য একটু (৩-৫ সেমি) খালি থাকে। এরপর মাটির সাথে অন্যান্য উপাদান ভালোভাবে মেশানোর জন্য পানি দিয়ে ১০-১২ দিন রেখে দিতে হবে। এরপর মাটি কিছুটা আলগা করে দিয়ে পুনরায় ৪-৫ দিন একইভাবে রেখে দিতে হবে। টবের মাটি ঝুরঝুরে করে ড্রামে ভরতে হবে। টবের মাটি ঝুরঝুরে হয়ে গেলে ড্রাগনের কাটিংয়ের চারা ওই টবে ৮-১০ সেমি গভীর করে রোপণ করতে হবে। গাছের গোড়ায় মাটি কিছুটা উঁচু করে হাত দিয়ে চেপে চেপে দিতে হবে। যাতে গাছের গোড়া দিয়ে বেশি পানি না ঢুকতে পারে।
কাটিং বা চারা পাওয়ার স্থান: ড্রাগন ফলের সুস্থ ও রোগমুক্ত কাটিং বা চারা বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া যায়। তার মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহে অবস্থিত বৃহৎ জার্মপ্লাজম সেন্টার, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের বিভিন্ন হর্টিকালচার সেন্টার, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন গবেষণা কার্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন নার্সারিতেও পাওয়া যায়।
গাছের পরিচর্যা: ড্রাগন ফল গাছের সঠিক পরিচর্যা না করলে ফলন ভালো হবে না। ড্রাগনের গাছের কা- লতানো প্রকৃতির। তাই চারা লাগানোর পর গাছ কিছুটা বড় হয়ে গেলে গাছকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য খুঁটি বা পিলার পুঁতে দিয়ে পিলারের মাথায় গোলাকার কোন কিছু যেমন টায়ার বেঁধে দিতে হবে, এতে গাছ সহজেই ঢলে পড়বে না। গাছে অতিরিক্ত বা রোগাক্রান্ত শাখা বের হলে তা কেটে ফেলে দিতে হবে। গাছের চারপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। যদিও ড্রাগন ফল গাছে তেমন একটা রোগ-বালাইয়ের আক্রমণ হয় না। তবে পারিপার্শ্বিক অন্যান্য যতœ নিয়মিত নিতে হবে। ড্রাগন ক্যাক্টাস জাতীয় গাছ। তাই পানি খুব কম দিতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে, যেন গাছের গোড়ায় পানি কখনই জমে না থাকে। কাটিং লাগানোর পরে টব বা ড্রামটিকে মাটিতে বা ছাদে রৌদ্রোজ্জ্বল জায়গায় রাখতে হবে।
ফল সংগ্রহ: ড্রাগন ফলের কাটিং বা চারা রোপণের এক থেকে দেড় বছর বয়সেই এর ফল সংগ্রহ করা যায়। গাছে ফুল ফোটার ৩৫-৪০ দিনের মধ্যেই ফল পরিপক্ক হয়। তখন ফল সংগ্রহ করে খাওয়া যায়। প্রতিকেজি ফল বাজারে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা ধরে বিক্রি হয়। একবার গাছ লাগালে প্রায় ২০ বছর এর ফল পাওয়া যায়।

ছাঁটাই: ড্রাগন ফলগাছ খুব তাড়াতাড়ি বৃদ্ধি পায়। তাই ফল আহরণ শেষে গাছের শাখা-প্রশাখা ভালোভাবে ছেঁটে দিতে হয়। শাখা-প্রশাখা ছেঁটে দেওয়ার পর ভালো ছত্রাকনাশক ব্যবহার করলে গাছের রোগবালাই হয় না। আর ছাদ বাগানের প্রতিটি ফল গাছই ছাঁটাই করা জরুরি। এতে রোগাক্রান্ত ডালপালা কমে যায়। আর গাছটির গঠন মজবুত ও সুন্দর হয়। পরবর্তী বছর আরও বেশি ফলন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
লেখক: উদ্যোক্তা ও ডিপ্লোমা কৃষিবিদ।

Please follow and like us: