Published On: বুধবার ১৬ মে, ২০১৮

চাকরিজীবী পুরুষের তুলনায় নারীর পরিশ্রম প্রায় তিন গুণ

নারীজীবন প্রতিবেদন : ফরিদা পারভীন। চাকরি করেন গুলশানের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। থাকেন ধানমন্ডিতে। ভোরে ঘুম থেকে উঠে সংসারের কাজ করে তবেই অফিসের পথে রওয়ানা হন। আবার অফিস শেষ করে বাজার করে ঘরে ফেরা। ঘরে ফিরে আবার ঘরের কাজ, রান্না।
ঠিক কতটা কাজ করতে হয় ফরিদা পারভীনকে? ‘আমার বাসার রান্না আমি নিজেই করি। সেই সঙ্গে অফিস করা, কাপড় ধোয়া, শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করাসহ বিভিন্ন কাজ করতে হয় প্রতিদিন।’ ফরিদা পারভীন প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেন ভোরে। আর ঘুমাতে যাওয়ার সুযোগ মেলে রাত ১২টার পর।
-স্বামী কী করেন?
-‘আমার স্বামী ব্যবসা করেন। বেশি বাজার করার প্রয়োজন হলে সেটা তিনি করেন। এখন মেয়েকে কলেজে দিয়ে আসেন। তবে কখনও রান্নায় সহায়তা করেননি। অনেক সময় শরীর যখন খুব খারাপ থাকে, তখনও রান্না করতে হয়।’
-রান্না করা তো সহজ কাজ। এ আর কী পরিশ্রমের?
-‘অনেকে মনে করেন নারীর রান্না করতে কোনো কষ্ট হয় না। বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু যেমন বুঝিয়েছেন গাছেরও জীবন আছে দুঃখ কষ্টের অনুভূতি আছে। ঠিক সেই ভাবে মনে হয় পুরুষদের বোঝাতে হবে। পুরুষের যেমন রান্না করতে কষ্ট হয়, নারীরও রান্না করতে কষ্ট হয়। নারীও  ইচ্ছে করে অফিস থেকে এসে বিশ্রাম নিতে।’
সংসারের কর্ত্রী যে নারী চাকরিও করেন তার জীবনের অভিজ্ঞতা কি ফরিদা পারভীনের চেয়ে আলাদা কিছু? মোটেও না। সমাজে প্রচলিত ধারণা আছে, পুরুষরা অফিস শেষে ঘরের কাজ খুব একটা করেন না। কিন্তু নারীর বেলায় উল্টো। অফিস করে ঘরও সামলাতে নয় নিপুন হাতে।
এটি কি কেবলই ধারণা?
মোটেও না, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপেও প্রচলিত ধারণা যে সত্য সেটা উঠে এসেছে। বরং আরও জানা গেছে কর্মজীবী নারী কর্মজীবী পুরুষের তুলনায় কত বেশি কাজ করেন। জরিপ অনুযায়ী চাকরিজীবী পুরুষের তুলনায় চাকরিজীবী নারী কাজ করেন তিন গুণ। গত মঙ্গলবার বিবিএস পরিচালিত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের শ্রমশক্তি জরিপে চাকরিজীবী নারীর ঘরের কাজকে ‘ডাবল বারডেন’ বলা হয়েছে। ঘরের কাজ কে কতটুকু করে : জরিপ অনুযায়ী, চাকরি করেন এমন নারীদের শতকরা ৮৬.৬ শতাংশ ক্ষেত্রেই  রান্নার কাজ করেন, আর চাকরিজীবী পুরুষদের মধ্যেশতকরা তিন শতাংশ রান্না করেন। বাকি পরিবারে রান্না করে অন্য কেউ। কর্মজীবী মধ্যে ১০০ জন নারীর মধ্যে কাপড় ধোয়ার কাজ করেন ৮৯ জন। আর ১০০ জন পুরুষের ক্ষেত্রে এই কাজ করেন ১২ জন। ঘর পরিষ্কারসহ বাসার বিভিন্ন জিনিস পরিষ্কারের ৮৮.৪ শতাংশ করে নারী। আর ৭.১ শতাংশ কাজ করে পুরুষ। ঘরের কেনাকাটার ক্ষেত্রে অবশ্য পুরুষের অংশগ্রহণ বেশি। বাজারের ৭৬.৬ শতাংশ করে পুরুষ। বৃদ্ধদের সেবা করা ও বাসার কেউ অসুস্থ হলে তাদের সেবা করার ক্ষেত্রে নারীর অবদান শতকরা ৫৩.২ শতাংশ। আর পুরুষের অবদান ২১ শতাংশ। আর নিজেদের ঘরের অন্যান্য কাজগুলো চাকরিজীবী নারী করে ৫০ শতাংশ আর পুরুষ করে ২২.৮ শতাংশ। এতো গেলো ঘরের কাজের হিসাব। যে দম্পতির সন্তান লালন পালন করতে হয়, সে পরিবারে নারীর পরিশ্রম আরও বেশি। দিনভর কাজ করে রাতেও সন্তানের জন্য ঘুম হয় না মায়েদের। এই জরিপ অনুযায়ী নারীরা পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ পাচ্ছে না।
এ বিষয়ে জানতে চ্ইালে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান- বিআইডিএস এর জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘এটাকে আনপেইড (বিনামূল্যে) ফ্যমেলি ওয়ার্ক বলে। দেখা যায় এখন নারীরা শ্রম বাজারে আসছে কিন্তু সেই সঙ্গে তারা ঘরের কাজও করছে। তাদের এখন অবসর পাচ্ছে না। এতে তাদের ওপর মানসিক চাপ পড়ছে।’ ‘তারা বাইরেও কাজ করছে আবার সংসারের কাজও করছে। অনেক পরিবার আছে নারীকে চাকরি করার শর্তই দেয় যে ঘরের কাজ সামলে যদি চাকরি করতে পার তাহলে করো।’ ‘যিনি বেশি বেতনে চাকরি করেন তিনি হয়ত ঘরের কাজে সহায়তা করার জন্য লোক রাখতে পারেন। কিন্তু কম পারিশ্রমিক পাওয়া চাকরিজীবী নারীদের সমস্যা হয় বেশি। তারা ঘরে বাইরে কাজ করতে যেয়ে অসুস্থ হয়ে যায়।’
নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘নারীর শ্রমবাজারে আসা মানেই যেন না হয় ঘর ঠিক রেখে আসা। ঘরের কাজে নারী-পুরুষ সবাইকে মিলেমিশে করার মানসিকতা তৈরির করতে হবে।’
নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম বলেছিলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, নারীরা শ্রমের স্বীকৃতি পায় না, মর্যাদা পায় না। আমরা চাই মর্যাদার সঙ্গে নারীরা বসবাস করবে। দেখা যায়, স্বামী-স্ত্রী দুজনই বাইরে কাজ করে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরছেন। স্বামী বিশ্রাম নিচ্ছেন, টিভি দেখছেন, পেপার পড়ছেন; স্ত্রী তখন রান্নাঘরে চলে গেছেন, বাচ্চাদের সামলাচ্ছেন।’
‘এই যে দৃষ্টিভঙ্গি, আগে থেকে তৈরি করে রাখা যে- একজন নারী সে তো সংসারের কাজ করবেই। হ্যাঁ, মেয়েরা রান্না করবে, সংসারের কাজ করবে, কিন্তু এটা যেন বাধ্যতামূলক না হয়। এটা যেন স্বামী-স্ত্রী মিলেমিশে করেন।’
‘স্বামীও কাজ করবেন, স্ত্রীও করবেন। এ কাজটা যেন শুধু নারীর কাজ হিসেবে দেখা না হয়। আমি রান্না করি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রান্না করছেন- সে ছবি আমরা দেখছি পত্রিকায়।’
স্ত্রীর প্রতি সহানুভূতিশীল স্বামীও আছে : চাকরিজীবী মহসিনা বেগম থাকেন মিরপুরে। তার মতো তার স্বামীও চাকরি করেন। ঘরের কাজ? ‘আমরা মিলেমিশে ঘরের কাজ করি। বাচ্চাদের স্কুলে নেওয়া, স্কুলের বেতন দেওয়া, রান্না করা, ঘর গোছানো, কেনাকাটা সবকাজই পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে করি।’
‘বাসায় কাজের লোকও আছে আমাদের। কিন্তু এমনও সময় ছিল কাজের লোক পাইনি আমরা তখন যদি মিলেমিশে ঘরের এ কাজগুলো না করতাম তাহলে একজনের চাকরি ছেড়ে দিতে হতো।’
সরকারি চাকুরে আসলাম হোসাইনের তিন সন্তান। তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রী গৃহিনী, আমার বাসাকে সুন্দরভাবে গুছিয়ে রাখা, রান্না করা,বাচ্চাদের স্কুলে নেওয়াসহ বিভিন্ন কাজ করে। আমি চেষ্টা করি তার রান্নায় সাহায্য করতে।’
‘বাজার থেকে মাছ অথবা মুরগি আনলে সেটা কুটে দেই। কোন কোন সময় নিযে রান্নাও করি। বাচ্চাদের গোসল করাই। সাজিয়ে দেই। আমি মনে করি সাবার কাজ স্বামী- স্ত্রী মিলেমিশে করলে অন্তরিকতা বাড়ে।’ স্ত্রীকে সহায়তা করেন বলে পরিচিতজনরা ভালো চোখে দেখেন না বলেও জানান আসলাম। বলেন, ‘আমি কাজে বাসার কাজে স্ত্রীকে সহায়তা করার জন্য অনেক আত্মীয় আমাকে ‘বউ পাগল’ বলে। কেউ আবার বলে আমি আমার স্ত্রীকে ভয় পাই। তবে এসব কথায় আমি কর্ণপাত করি না। কারণ আমার পরিবারে সুখের কথা আমাকেই ভাবতে হবে।’

Videos