মঙ্গল. মার্চ ৩১, ২০২০

ঘাতক মুক্ত শিক্ষাঙ্গন নিশ্চিত হোক

ঘাতক মুক্ত শিক্ষাঙ্গন নিশ্চিত হোক

Last Updated on

ফারজানা কাশেমী : সময়টা ১৯৭১। বাংলা ভাষা-ভাষী জাতির জন্য এক গৌরব উজ্জ্বল ও দুর্নিবার নিপীড়ন গ্রহণের এক ক্রান্তিকাল। দীর্ঘ নয় মাস বহু ত্যাগ, তিতিক্ষা ও বিসর্জনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি স্বাধীন হয়। স্বাধীনতার পূর্ব লগ্নে আমাদের এই দেশকে মেধাশূন্য করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল ও পরিকল্পিতভাবে এই সব হত্যাকা- সংগঠিত হয়েছিল। বাঙালি জাতি হারিয়েছে বহু সূর্য সন্তান। তারাই আমাদের শহীদ বুদ্ধিজীবী। স্বাধীনতার পরবর্তী প্রজন্ম হিসেবে আমার মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাস জানা। ১৪ই ডিসেম্বর ১৯৭১ বুদ্ধিজীবী নিধন, হনন, অপহরণের আনুষ্ঠানিক এক কালো দিন। পরবর্তীতে আমরা মনে প্রাণে যারা বাঙালি তারা ১৪ই ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে পালন করে আসছি, শহীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন এর মাধ্যমে। যা এখনও বহমান। নিখোঁজ হওয়া, গুম হওয়া, খুন হওয়া বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সর্বাধিক ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশ আজ স্বাধীন। তবুও আমাদের দেশের আকাশে আজও শকুনের বিচরণ। শকুন, হাযনা এখনও হাতছানি দিচ্ছে আমাদের স্বদেশে।
পরিকল্পিতভাবে আজও আমার দেশের সূর্য সন্তানরা দূরবৃত্তের হাতে প্রাণ হারাচ্ছে। এখনও তাদের লক্ষ্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা?। শিক্ষক জাতির নির্মাতা। শিক্ষক চাত্রদের আদর্শ ও অনুপ্রেরণা। সেই শিক্ষক প্রতিনিয়ত প্রহসনের শিকার হচ্ছে। এ যেন টার্গেট কিলিং। ২০০৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রসের ড. হুমায়ন আজাদ দুর্বৃত্তের হাতে গুরুতর আহত হয়, তার নিজ কর্মক্ষেত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংলগ্ন এলাকায়।
এই নিষ্ঠুর পৈচাশিক চর্চা আজও চলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত দেশের অনেক পাবলিক বিশববিদ্যালয়ে এযেন এক বহাল চিত্র। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকটাই সমান পরিস্থিতি। ২০০৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি শিক্ষক ইউনুস নিজ ক্যাম্পাসে খুন হয়েছিল। ২০০৬ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এস এম তাহের খুন হয়েছিল। এই অপচর্চা যেন আর থামছেনা। ২০১৪ ও ২০১৬ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক নিহিত হয়েছিলেন দুর্বৃত্বের হাতে। এই কালো মিছিল যেন শুধু বেড়ে যাচ্ছে। ক্রমাগত হারে। ২০১৮ সালে শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মানিত শিকষ ড. মোহাম্মদ জাফর ইকবাল দুর্বৃত্তের ছুরির আঘাতে আহত হয়েছিলেন। একজন শিক্ষক কেন এইভাবে লাঞ্ছিত হবে? দিনশেষে একজন শিক্ষকের মূল্যায়ন কি? অপমান, লাঞ্ছনা, দারিদ্র্যতা ও অপমৃত্যু! প্রশ্নটা খুবই প্রাসঙ্গিক। প্রতিটা ঘটনা ঘটছে শিক্ষকদের কর্মক্ষেত্রে। শিক্ষাঙ্গন কি সন্ত্রাসীদের অভয় অরণ্য? সন্ত্রাসমুক্ত শিক্ষাঙ্গন একটা স্বাধীন জাতির বড় চাওয়া ও যৌক্তিক অধিকার। তথাকথিত এই সন্ত্রাসী ও তাদের দোষরদের হাত থকে শিক্ষাঙ্গন মুক্ত করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান যারা সন্ত্রাস মুক্ত করতে সহায়তা করতে পারে।
এই অপচর্চা যদি বন্ধ না হয় হারিয়ে যাবে দেশের সূর্য সন্তানরা। তৃতীয় সারির নাগরিক হয়ে দেশ ছাড়বে আমাদের দেশের মেধাবীরা। ধ্বংস হবে শিক্ষা ব্যবস্থা। জাতি হারাবে মেধাবী প্রজন্ম। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার। ফলশ্রুতিতে লজ্জিত হচ্ছে রাষ্ট্র। প্রতিনিয়ত হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে মুক্তিবুদ্ধির চর্চাকারী ও অন্যায়ের প্রতিবাদী। বেড়ে যাচ্ছে ক্ষোভ, ঘৃণা। এখনই সময় এই নিষ্ঠুরতা, বিবেকহীনতা, স্বার্থপর মহলকে রুখে দাঁড়াবার। আর যেন ১৯৭১ এর পরাজিত হায়নারা আমাদের দেশে পুনর্বাসিত না হয়।
লেখক: ফারজানা কাশেমী আনিজীজী, সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশ

Please follow and like us:
3