রবি. মে ১৯, ২০১৯

খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি আদালতের

খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে

Last Updated on

নিজস্ব প্রতিবেদক : মানুষের জন্য নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের যে সব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব রয়েছে, তাদের হুঁশিয়ার করে দিয়েছে হাই কোর্ট।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশন (বিএসটিআই), নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জাতীয় নিরাপদ খাদ্য গবেষণাগারকে সতর্ক করে আদালত বলেছে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে আদালত কাউকে ছাড় দেবে না।
দুধ, দইয়ে ক্ষতিকর মাত্রার অনুজীব, টেট্রাসাইক্লিন, কীটনাশক ও সিসার উপস্থিতি নিয়ে জারি করা রুলের শুনানিতে বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলমের হাই কোর্ট বেঞ্চ থেকে গতকাল বুধবার এই হুঁশিয়ারি আসে। আদালতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন ফরিদুল ইসলাম। বিএসটিআইর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী সরকার এম আর হাসান মামুন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিনউদ্দিন মানিক। আর দুদকের পক্ষে ছিলেন সৈয়দ মামুন মাহবুব।
দুধ, দই এবং পশু খাদ্যে ভেজাল মেশানোয় কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান জড়িত তা জানাতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়ে গতকাল বুধবার রিট মামলাটি আদেশের জন্য রেখেছিল আদালত। শুনানি শুরু হলে বিএসটিআই ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আইনজীবীরা প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সময় আবেদন করেন। আদালত ২৩ জুন পর্যন্ত সময় দিয়েছেন তাদের। তবে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী জাতীয় নিরাপদ খাদ্য গবেষণাগারের গবেষণা প্রতিবেদনটি না দেওয়ায় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জাতীয় নিরাপদ খাদ্য গবেষণাগারের প্রধান শাহনীলা ফেরদৌসীকে ২১ মে আদালতে তলব করা হয়েছে। নিরাপদ খাদ্য গবেষণাগারের দুধ-দই ও গোখাদ্য নিয়ে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনটি নিয়ে আদালতে থাকতে বলা হয়েছে তাকে।
বুধবার শুনানির শুরুতেই দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব আদালতে বলেন, ‘আমাদের কাছে তো রিপোর্ট আসেনি। রিপোর্ট না আসলে অ্যাকশনে যাওয়ার সুযোগ নেই।’
এসময় বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক বলেন, কোন কোন কোম্পানির দুধ বা দুগ্ধজাত খাদ্যপণ্যে ভেজাল রয়েছে তা চিহ্নিত করতে চাই। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আইনজীবী ফরিদুল ইসলাম এসময় বলেন, ‘সাব স্ট্যান্ডার্ড বলতেই যে হার্মফুল এমন কিন্তু নয়। তাই সাব স্ট্যান্ডার্ড বিষয়টা নিয়ে ঢালাওভাবে বলে ফেললে মানুষের মাঝে আতঙ্ক তৈরি হয়।’
তখন বিচারক বলেন, ‘এই যে রিপার্টগুলো (যে রিপোর্টের ভিত্তিতে আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুলসহ আদেশ দিয়েছিল) আপনারা দেখেন? দেখার পর কি আপনাদের বিবেক জাগ্রত হয় না? আপনারা একটু কি টেস্ট করে দেখবেন না?’ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘গত সপ্তাহেই আমরা কমিটি করেছি। এক মাসের মধ্যে সব টেস্ট করে রিপোর্ট দিতে পাবব বলে আশা করি।’ এ পর্যায়ে বিএসটিআই’র আইনজীবী হাসান মামুন বলেন, ‘প্রফেসর শাহনীলা ফেরদৌসী (নিরাপদ খাদ্য গবেষণাগারের প্রধান) যে রিপোর্ট করেছেন, সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে। ‘ওই রিপোর্ট করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের জানা নেই। বিএসটিআই তো একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একটি স্ট্যান্ডার্ডকে মেইনটেইন করে পরীক্ষা করে রিপোর্ট করে। উনি (শাহনীলা ফেরদৌসী) তো ঢাকাসহ তিন জেলার ছয়টি উপজেলাসহ ১৮টি স্থান থেকে দুধের পাশাপাশি অন্যান্য নমুনাও সংগ্রহ করে রিপোর্টটি করেছেন। এখানে তো সারা দেশের সামগ্রিক চিত্র নাও উঠে আসতে পারে। আর এই সকল রিপোর্ট গণমাধ্যমে প্রকাশের পর আতঙ্কের তৈরি হয়।’
তখন বিচারক বলেন, ‘এটা বলতে হবে যে, মিডিয়াতে এই সকল ভেজাল বিষয় উঠে আসার কারণেই আমরা বিষয়গুলো জানতে পারি। তাই মিডিয়াকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত। তারা বিষয়গুলো সামনে না নিয়ে আসলে আমরা তো জানতেই পারতাম না। ‘মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা যাবে না। মানুষের স্বাস্থ্য ঠিক না থাকলে জীবন থেকে লাভ কী? এসব ব্যাপারে কোনো ছাড় দেব না।’ ভেজালবিরোধী অভিযানে প্রতিদিনই ধরা পড়ছে অস্বাস্থ্যকর খাবার ভেজালবিরোধী অভিযানে প্রতিদিনই ধরা পড়ছে অস্বাস্থ্যকর খাবার বিচারক বিএসটিআইর আইনজীবীকে বলেন, ‘আপনারা কবে রিপোর্ট দেবেন, কতদিন সময় লাগবে?’ আইনজীবী ‘এক মাস’ সময় চাইলে আদালত তখন জানতে চায়, প্রতিবেদনে কী থাকবে?
জবাবে বিএসটিআইর আইনজীবী বলেন, ‘আমরা যাদের লাইসেন্স দিয়েছি তাদের নাম, তাদের উৎপাদিত দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্য পণ্যের নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট। এবং পরীক্ষায় ভেজাল পেলে সেক্ষেত্রে যারা জড়িত তাদের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরব।’
এরপর নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আইনজীবী ফরিদুল ইসলামের কাছে আদালত জানতে চায়, তাদের প্রতিবেদন দিতে কত সময় লাগবে? আইনজীবী বলেন, ‘আমরা একটা ডিটেইল রিপোর্ট দেব। আমাদের এক মাসের মধ্যে সময় লাগবে।’ তখন আদালত প্রতিবেদন দিতে বিএসটিআই ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে ২৩ জুন পর্যন্ত সময় দিয়ে ওইদিন পরবর্তী আদেশের জন্য রাখে রিট মামলাটি। দুধ, দই এবং পশু খাদ্যে ভেজাল মেশানোয় কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান জড়িত সে বিষয়ে গত ৮ মে হাই কোর্ট নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন চেয়েছিল হাই কোর্ট। কিন্তু তারা তা দিতে পারেনি। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আইনজীবী ফরিদুল ইসলাম পরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘গত সপ্তাহে একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রদান করেছি। আমরা তাতে বলেছি, এক মাসের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রদান করব। ‘এটা বিশাল একটি কাজ। বিভিন্ন রিপোর্ট সংগ্রহ করতে হবে, গবেষণা প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে হবে। মিটিং করে তা স্বাস্থ্যের জন্য কতটুকু ক্ষতিকর ও নিম্নমানের তা নিরূপণ করে প্রতিবেদন দিতে হবে। তাছাড়া আমরা শাহনীলা ফেরদৌসীর প্রতিবেদনটিও সংগ্রহ করব।’
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আমিনউদ্দিন মানিক সাংবাদিকদের বলেন, ‘নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও বিএসটিআই তাদের প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সময় দেওয়ার পাশাপাশি জাতীয় নিরাপদ খাদ্য গবেষণাগারের (এনএফএসএল) প্রধান অধ্যাপক শাহনিলা ফেরদৌসীকে আগামী ২১ মে সকাল সাড়ে ১০টায় সশরীরে উপস্থিত হয়ে তার প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে। জাতীয় নিরাপদ খাদ্য গবেষণাগারের (এনএফএসএল) এক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবর দেখে গত ১১ ফেব্রুয়ারি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুলসহ আদেশ দিয়েছিল আদালত।
দুধ পরীক্ষার প্রক্রিয়া জানাতে এনএফএসএলের প্রধানকে তলব : বাজারের তরল দুধ পরীক্ষার প্রক্রিয়া কি ছিল তা জানাতে সরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির (এনএফএসএল) প্রধান প্রফেসর ড. শাহনীলা ফেরসৌসিকে তলব করেছেন হাইকোর্ট। গরুর দুধ ও দইয়ে অ্যান্টিবায়োটিক, কীটনাশক, অণুজীব ও সিসা রয়েছে বলে সম্প্রতি এক গবেষণায় জানায় এনএফএসএল। প্রতিষ্ঠানটির এই প্রতিবেদন নিয়ে ফেরসৌসিকে আগামী ২১ মে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে হাজির হতে বলেছেন হাইকোর্ট।
গতকাল বুধবার শুনানিতে হাইকোর্টের বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী একেএম মানিক এ তথ্য জানিয়েছেন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) আর্থিক সহায়তায় গরুর দুধ, প্যাকেটজাত দুধ, দই ও গোখাদ্য নিয়ে এনএফএসএল’র ওই গবেষণা করে। গবেষণায় বলা হয়, ঢাকাসহ ৪টি জেলার ২৭টি উপজেলা/থানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। গরুর দুধ সরাসরি খামার থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ওই খামার থেকেই খাবার সংগ্রহ করা হয়েছে। দই ঢাকা শহরের বিভিন্ন ব্র্যান্ড দোকান ও আশপাশের উপজেলার দোকান থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। বাজারে প্রচলিত প্রায় সকল ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত তরল দুধ এবং আমদানি করা প্যাকেটজাত দুধ বিভিন্ন সুপার স্টোর থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এগুলো নির্দিষ্ট নিয়মে ল্যাবরেটরিতে পৌঁছানোর পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে ।
গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলে জানানো হয়, ৬৯-১০০ শতাংশ গোখাদ্যে বিভিন্ন রকমের রাসায়নিক- কীটনাশক (৯টি নমুনায়), সীসা (২২টি নমুনায়), ক্রোমিয়াম (১৬টি নমুনায়), টেট্রাসাইক্লিন (২২টি নমুনায়), এনরোফ্লোক্সাসিন (২৬টি নমুনায়), সিপ্রোসিন (৩০টি নমুনায়) এবং আফলাটক্সিন (১৯টি নমুনায়) গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি মাত্রা পাওয়া যায়।
গরুর দুধের ৯৬টি নমুনার মধ্যে ৯ শতাংশ দুধে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কীটনাশক, ১৩ শতাংশে টেট্রাসাইক্লিন, ১৫ শতাংশে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি মাত্রায় সিসা পাওয়া যায়। ৯৬ শতাংশ দুধে মেলে বিভিন্ন অণুজীব।
প্যাকেটজাত দুধের ৩১টি নমুনায় ৩০ শতাংশে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি হারে আছে টেট্রাসাইক্লিন। একটি নমুনায় সিসা মিলেছে। একই সঙ্গে ৬৬ থেকে ৮০ শতাংশ দুধের নমুনায় বিভিন্ন অণুজীব পাওয়া গেছে। দইয়ের ৩৩টি নমুনা পরীক্ষা করে একটিতে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি সিসা পাওয়া গেছে। আর ৫১ শতাংশ নমুনায় মিলেছে বিভিন্ন অণুজীব।
বিষাক্ত খাদ্য বাজারজাতকারীদের শাস্তি দাবি : সুদৃশ্য মোড়কে যেসব প্রতিষ্ঠান বিষাক্ত খাদ্য বাজারজাত করে, তাদের মালিকদের আইন অনুযায়ী যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সভাপতি সৈয়দ আবুল মকসুদ। গতকাল বুধবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের সামনে ‘ইফতারসহ সকল খাদ্য বিষ ও ভেজালমুক্ত এবং নিরাপদ করা’র দাবিতে আয়োজিত নাগরিক সমাবেশে এ দাবি জানান তিনি। বিষাক্ত খাবার খাইয়ে যাঁরা দেশের কোটি মানুষের ক্ষতি করছেন ও মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা করতেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। প্রয়োজনে আইন পরিবর্তন করে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- দেওয়ারও আহ্বান জানান সৈয়দ মকসুদ। সৈয়দ মকসুদ বলেন, যাঁরা খাদ্যদ্রব্যে বিষ প্রয়োগ করছেন এবং সেটা বাজারজাত করছেন অত্যন্ত মনোরম প্যাকেটে, সেইসব প্রতিষ্ঠানকে এবং সেইসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদের ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত করে আইনের আওতায় এনে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি বিধানের দাবি জানাচ্ছি।

Please follow and like us:
0