বৃহঃ. ফেব্রু ২৭, ২০২০

ক্যাম্পাসের দিনগুলি

ক্যাম্পাসের দিনগুলি

Last Updated on

ডাঃ জামাল উদ্দীন আহমেদ : বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে, বিশেষ করে সরকারী ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি কিভাবে ডালপালা ছড়িয়ে, শেকড় গেড়ে নিয়ন্ত্রণের আসনে বসে, প্রভাব বিস্তার করে, সেই বাস্তব চালচিত্র নিয়ে ডাঃ জামাল উদ্দিন আহমেদ এর একটি ধারাবাহিক উপন্যাস-ক্যাস্পাসের দিনগুলি। যা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হচ্ছে এই পাতায়। এবার ছাপা হলো পর্ব-৭।
লতিফ ভাই যাবার আগে কানে কানে জহির ভাইকে বলল কিছু মনে করো না, তোমার ভাই যদি মারা যায় তাহলে দেশব্যাপী হরতাল ডাকব। একথা শোনার পর জহির ভাইয়ের চেহারায় কোন প্রতিক্রিয়া না হওয়ায় লতিফ ভাই ভাবল, জহির সত্যিকারভাবেই পার্টিকে ভালবাসে।
লতিফ ভাই চলে যেতেই জহির ভাই রিসেসশনে গিয়ে বলল: ম্যানেজার কই? রিসেপশনের মেয়েটি ভয়ে ভয়ে ম্যানেজারের কামরা দেখিে যদিল। ম্যানেজারের রুমে ঢুকেই জহির ভাই ম্যানেজারকে এক সাথে কতগুলি কথা বলল: প্রথমে কেবিনে একটা টেলিফোন লাগবে। তারপর দুইজনের খাওয়ার বন্দোবস্ত করবেন। আর অনেক ছাত্র আসছে তাদের খরচের জন্য কিছু টাকা দিতে হবে। তাদের হলে পাঠাতে হবে, আমি ইচ্ছে করেই ছাত্রদের সাথে আনলাম না। কয়েকটা আবার বেয়াদব ধরনের। এই বলে একটু ভয় দেখানোর চেষ্টা করল। তারপর আবার বলল, শুনেছি আপনারা নাকি ভাল ব্যবসা করছেন।
ম্যানেজার জানে ছাত্রনেতা আর রাজনীতিবিদ দুইই বড় ধরনের আপদ। এরা টাকা তো ঠিকমত দেয়ই না, তারপর থাকে আবার বিভিন্ন পদের অযৌক্তিক আবদার। কিছুক্ষণ চুপ করে জহির ভাইয়ের কথাগুলি হজম করার চেষ্টা করল। তারপর উত্তর দিল টেলিফোনের একটা লাইন কেবিনে দিয়ে দিচ্ছি। ব্যবসা যে কি করছি সেটা আপনাদের বলে কি আর লাভ হবে। আমাদের এখানে রোগীদের খাবার তাদের বাড়ি থেকেই আসে।
জহির ভাই মনে মনে ভাবল, ম্যানেজার তাকে নিয়ম কানুন শেখাতে চায়। ম্যানেজার হয়তো তাকে আন্ডার এস্টিমেট করছে। রোগী সংসদের বিরোধী দলের উপনেতার। তাছাড়া তার মত ছাত্র নেতাকে ম্যানেজার অবজ্ঞা করতে পারে না। তাই ক্ষেপে গিয়ে বলল, রোগী খাবে কি?
ম্যানেজার অসহায়ের মত বলল, ঠিক আছে আমি মালিককে ফোন করছি।
জহির ভাই ভাবল: ম্যানেজারকে প্রেসার না দিলে কিছু হবে না। তাই একটা ধমকের স্বরে বলল; ঠিক আছে, সাথে আমাদের জন্য দশ হাজার টাকা চেয়ে নেবেন। আমি কিছুক্ষণ পর আসছি।
ম্যানেজারের রুম থেকে বের হয়ে রিসেপশনের সামনে এসে জাহির ভাই চিৎকার করে বলে উঠল, ডাক্তার এখনো আসেনি কেন?
একথা শুনেই পাশে দাঁড়ানো একজন সাদা এপ্রোন পরা লোক বলে উঠল আমিই ডাক্তার। ডাক্তার জহির ভাইয়ের নাম আগেই বড় ছাত্রনেতা হিসাবে বহুবার পত্রিকায় দেখেছে। কিন্তু ওনার কার্যকলাপে মনে মনে বড় মাস্তান বলে মনে হলো। এখন কিছুটা আলামতও দেখতে পাচ্ছে। তাই ভয়ে ভয়ে বলল: কেবিনে এত লোক বলে যেতে পারিনি। তাছাড়া বিশেষজ্ঞ কল দেওয়া হয়েছে, মেডিকেল কলেজের সার্জারির অধ্যাপক। এখন সাড়ে বারোটা বাজে, উনি একটার মধ্যে এসে পড়বেন। আমার সাথে টেলিফোনে কথা হয়েছে। তাছাড়া ওনার এখন এই ক্লিনিকে আরো দুইজন রোগী আছে। উনি এখানে রোজ দুপুর একটায় একবার আসেন আবার রাত দশটায় আরেকবার আসেন।
জহির ভাই ডাক্তারকে কাছে ডেকে বললেন, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডাক্তাররা গুলি বের করে ফেলেছে। এই যে ট্রিটমেন্টের কাগজ।
ডাক্তার মনে মনে ভাবল, তিন ঘণ্টা আগে গুলি লেগেছে। তাও আবার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অজ্ঞান ছাড়া গুলি বের করা হয়েছে। ব্যাপারটা রহস্যময়।
জহির ভাই উপদেশের স্বরে বলল: এখন বাকি চিকিৎসা আপনাদের। এক কাজ করুন, আপাতত ওকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে দিন। জহির ভাইয়ের মুখে বিশেষজ্ঞের মত নির্দেশ শুনে ডাক্তার বলল, এখনি দিয়ে দিচ্ছি। জহির ভাই আবার ডাক্তারকে বলল রুমের ভীড় কখনো কমবে না। বুঝতেই পারছেন আমার ভাই। ভাই একের পর এক দেখতে আসবে, ঠেকানো যাবে না। আপনি আপনার কাজ করুন।
জহির ভাই কেবিনে ফিরে পিন্টুকে বলা, তোমার নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যে খাবার দিয়ে যাবে।
শহীদ নামের এক ছাত্রকে একশ’ টাকার একটা নোট দিয়ে বলল, যাও মৌচাক থেকে কিছু ফল নিয়ে আস। হঠাৎ মনে পড়ল মৌচাক মার্কেটের তিনটা জুয়েলারী দোকানের কথা। গত ঈদে তাদের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকার চাঁদা নেওয়া হয়েছে। এখন তার ভাইয়ের গুলি খাওয়ার কথা শুনিয়ে কিছু টাকা চাওয়া যেতে পারে।
শহীদ রওয়ানা হতেই আবার তাকে ডাক দিয়ে বলল: তুই টিপু আর মুন্নাকে সাথে নিয়ে যা। গত ঈদে যে তিনটা জুয়েলারীর দোকান থেকে টাকা নিয়েছিলাম সেই দোকানগুলি থেকে আমার ভাইয়ের গুলি লেগেছে বলে দশ হাজার টাকা চেয়ে বলবি এই ক্লিনিকে বর্তি হয়েছে। আর টাকা পাঁচ হাজারের কম হলে বলবি আপনারা নিজেরাই জহির ভাইকে দেবেন।
পিন্টু মনে মনে ভাবল জহির ভাই তাকে নিয়ে ভালই ব্যবসা করছে। পিন্টুকে জহির ভাই জিজ্ঞেস করল: তোমার কাপড় চোপড় কই? পিন্টু বলল আমার ব্যাগ খসরুর রুমে, ব্যাগ শুধু একটা লুঙ্গি আছে।
জহির ভাই মনে মনে ভাবল, কাপড় চোপড় ছাড়া এই ছেলে ঢাকায় কিভাবে আসল? টোকই নাকি? আবার কথা বাড়ালে সবাই যদি ভাবে পিন্টু তার আপন ভাই নয়। তাহলে ব্যাপারটা একবারে ভুঁয়া মনে হবে। এমনিতেই ভুঁয়া গুলি আর ভুঁয়া প্লাস্টার করা হয়েছে। তাই তাড়াতাড়ি আরেক ছাত্র রকিবকে ডেকে বলল, বঙ্গ বাজার যা। পিন্টুর মাপের পাঁচটি শার্ট, পাঁচটি প্যান্ট, একজোড়া সেন্ডেল আর দুইটি লুঙ্গি নিয়ে আয়। তোর জন্যও একটা শার্ট কিনে নিস। এইনে চার হাজার টাকা, বলে টাকাটা রকিবকে দিল। তাড়াতাড়ি আসবি।
মনে মনে ভাবলো সংযুক্ত পার্টির সভাপতি এই কাপড় চোপড় পিন্টুকে দেখলে জহিরের ভাই কী-না সন্দেহ করতে পারে। পিন্টুকে জহির ভাই পাঁচশ টাকা দিয়ে বললো, পকেটে রাখ, দরকার হতে পারে।
পিন্টু এতক্ষণ বিরক্তি বোধ করলেও এখন মনে মনে ভাবলো এসব ঘটনায় তারও কিছু লাভ হচ্ছে। মনে মনে ভাবে, জহির ভাই নিজে নিতেও জানে, দিতেও জানে। তার কলজেটা অনেক বড়। তাছাড়া বহু ছাত্র, ডাক্তার, নার্স, ক্লিনিকের কর্মচারীার খেদমতে ব্যস্ত।
এসময়ে কয়েকজন তরুণী কেবিনে ঢুকলো। তাদের মধ্যে একজনকে আবার নেত্রী গোছের মনে হলো।
কয়েকজন ছাত্র বলে উঠলো, ঝর্ণা আপা আসছে, উঠে পড়ে। ঝর্ণা আপা ছাত্রদের বস বলে নিজেই একটি চেয়ারে বসে পড়লো। বাকি তরুণীরা দাঁড়িয়ে থাকলো।
ঝর্ণা আপা রোকেয়া হলের ছাত্রী সংসদের ভিপি, আবার সংযুক্ত পার্টির চাত্র সংগঠনের রোকেয়া হল শাখার সভাপতি। ভার্সিটিতে গত আট বছর যাবত ছাত্রী হিসেবে আছেন। ছেলেদের মত সার্ট প্যান্ট পরেন। চুলও ছেলেদের মত বয়কাট রাখতে চেষ্টা করেন। যাতে সকলের চোখে পড়া যায়। সব সময় কিছু সুন্দরী ছাত্রী নিয়ে চলাফেরা করেন। মনে করেন এতে বড় নেতাদের মন জয় করা যায়। তাছাড়া নিজেও কম সুন্দরী নন। পকেটে নাকি আবার পিস্তলও রাখেন। সাথে কয়েকজন সুন্দরী ছাত্রী থাকলে কারও কাছে চাঁদার জন্য কখনো বেগ পেতে হয় না।
ঝর্ণা আপা জহির ভাইকে বললো, আপনার ভাইকে গুলি করেছে শুনে বুক ধড়ফড় করছে। ভাগ্যিস আপনাকে গুলি করেনি। আপনার জন্য আমার সব সময় চিন্তা হয়।

একই সঙ্গে পড়াশুনা ও চাকরি
আমরা অনেক সময় ভাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেষ হোক, তারপর চাকরির খোঁজে নামব। পশ্চিমা দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের ধ্যান-ধারণা কিন্তু একটু আলাদা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকেই তারা নানা রকম খ-কালীন কাজ খুঁজতে শুরু করেন। গ্রীষ্মের ছুটিতে কেউ কেউ দুই মাসের জন্য একটা কাজে ঢুকে পড়েন। কেউবা ক্যাম্পাসেই টিচিং অ্যাসিসট্যান্ট, গবেষণা সহকারী বা এ ধরনের কোনো কাজে যোগ দেন। আমাদের দেশেও অনেক শিক্ষার্থী পড়ালেখার পাশাপাশি চাকরি করছেন। পড়ালেখা সামলে এর পাশাপাশি যদি চাকরির অভিজ্ঞতা নিতে পারেন, তাহলে কিন্তু পেশাজীবনের পথে আপনি আগেই এক ধাপ এগিয়ে থাকলেন। ভাবতে পারেন সুযোগ কোথায়, কে দেবে চাকরি? সে ক্ষেত্রে পাল্টা প্রশ্ন হলো, সুযোগ আপনি খুঁজছেন কি?
এগিয়ে থাকা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র আলিমুল হাসান। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় প্রথমে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় শিক্ষানবিশ হিসেবে যোগ দেন, পরে খ-কালীন চাকরি শুরু করেন একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায়। একদিকে পড়াশোনা, আর অন্যদিকে কাজ করেছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট গবেষণা নিয়ে। আলিমুল বলছিলেন, ‘যেহেতু আমি আগেই আমার দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছি, তাই যেখানে খ-কালীন চাকরি করতাম, পড়ালেখা শেষ হওয়ার পর সেখানেই আমার নিয়োগ হয়ে গেল।’ আলিমুলের বন্ধুরা যখন সিভি তৈরি করে এদিক-ওদিক ছুটছেন, আলিমুল তত দিনে পুরোদস্তুর অফিস করতে শুরু করেছেন। বর্তমানে তিনি একটি জাপানি দাতা সংস্থায় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছেন।
একইভাবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী নিশাত আনজুমও পড়ার পাশাপাশি খ-কালীন চাকরি করেছেন। স্নাতকে পড়ার সময় তিনি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে গবেষক হিসেবে খ-কালীন চাকরিতে যোগ দেন। সেই চাকরির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষ হতে না হতেই যোগ দিয়েছেন একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায়। নিশাত বলছিলেন, ‘খ-কালীন চাকরিতে আর কিছু হোক বা না হোক, অভিজ্ঞতা হয়। তাই সুযোগ পাওয়ামাত্রই আমি সেটা কাজে লাগাতে দ্বিধা করিনি।’ এখন নিশাত আইন পেশার পাশাপাশি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধিবিষয়ক প্রকল্পে কাজ করছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী স্যাফায়ার হোসেন এখন পড়াশোনার পাশাপাশি অনুবাদক হিসেবে কাজ করছেন একটি বহুজাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানে। তিনি বলেন, ‘খ-কালীন চাকরি করে আমি অনেক কিছু শেখার সুযোগ পাচ্ছি। যোগাযোগের দক্ষতা যেমন তৈরি হচ্ছে, তেমনি অনেকের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি। নেটওয়ার্কিং হচ্ছে। বর্তমান সময়ের পেশার চাহিদাগুলো সম্পর্কে জানতে পারছি।’
আছে নানা রকম সুযোগ
কানাডাভিত্তিক স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রতিষ্ঠান সাসটেইনেবল মাইগ্রেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইলিয়াস মাহমুদ বলেন, ‘দেশের বাইরে এমন কাজের সুযোগ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা দারুণভাবে কাজে লাগান। আমাদের দেশে খুব বেশি দেখা না গেলেও অনেক তুখোড় শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবন থেকেই খ-কালীন চাকরিতে প্রবেশের মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে তৈরি করেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নানা রকম কাজে খ-কালীন চাকরির সুযোগ পাওয়া যায়। আরও একটা সুবিধা হলো, এ ধরনের খ-কালীন চাকরিতে খুব বেশি অভিজ্ঞতা বা দক্ষতার প্রয়োজন হয় না। শুধু প্রয়োজন একটা গোছানো সিভি আর কাজ করার আগ্রহ। কাজটি পেতে আপনি কতটা আগ্রহী, সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’ সাধারণত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগ আর বিপণন ও বিক্রয় বিভাগেই খ-কালীন চাকরির সুযোগ বেশি থাকে। এ ছাড়া গবেষণা, যোগাযোগ, ইভেন্টস ও অ্যাকটিভেশন বিভাগেও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের নিয়মিত কাজের সুযোগ ধীরে ধীরে বাড়ছে।
সেই সব প্রতিষ্ঠানেই মূলত বেশি সুযোগ পাওয়া যায়, যেখানে স্থায়ী কর্মীর সংখ্যা কম কিন্তু কাজের পরিমাণ বেশি বা বিভিন্ন প্রকল্পে যাদের খ-কালীন কর্মীর প্রয়োজন হয়। খ-কালীন চাকরির বিজ্ঞাপন সংবাদপত্রে খুব একটা চোখে পড়বে না। লিংকডইন, গ্লাসডোরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে এ ধরনের চাকরির খবর পেতে পারেন। অনলাইনে এসব ওয়েবসাইট তাই সক্রিয় থাকতে হবে। এ ছাড়া গুগলে সার্চ করেও আপনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজের খবর পেতে পারেন।
তরুণ পেশাজীবী নিশাত নায়লা পরামর্শ দিলেন, ‘খ-কালীন চাকরির দারুণ একটি সুযোগ হচ্ছে বিভিন্ন ওয়েবসাইটের জব বা ক্যারিয়ার অপশনে নিয়মিত চোখ রাখা। খ-কালীন কর্মী, শিক্ষানবিশ, অ্যাসোসিয়েট হিসেবে বিভিন্ন কাজের সুযোগ নিয়মিতই বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েবে দেখা যায়। এ ছাড়া বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে সিভি জমা দেওয়ার সুযোগ আছে। সেখানে নিজের প্রোফাইল তৈরি করে রাখতে পারেন।’
যোগ্যতা যত
সাধারণত দ্বিতীয় বা তৃতীয় বর্ষ থেকেই প্রতিষ্ঠানগুলোতে খ-কালীন চাকরির জন্য আবেদন করা যায়। এ ক্ষেত্রে প্রথম যোগ্যতা হিসেবে ধরা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত পড়াশোনা। ইগলু লিমিটেডের গ্রুপ সিইও জিএম কামরুল হাসান জানান, ‘সাধারণ প্রযুক্তিগত দক্ষতা, যেমন মাইক্রোসফট ওয়ার্ড ও এক্সেল জানা, টুকটাক ডিজাইন সম্পর্কে ধারণা রাখা, ইংরেজিতে লেখা ও বলার দক্ষতাকে যোগ্যতা হিসেবে ধরা হয়। বিভিন্ন সংগঠনে বা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে আপনার সিভিকে সমৃদ্ধ করবে।’
যেভাবে আবেদন করা যাবে
অনলাইনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের মাধ্যমেই এখন খ-কালীন চাকরির জন্য আবেদন করা যায়। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগ বরাবর ইমেইল করতে পারেন, সিভি জমা দিতে পারেন। চাইলে সরাসরি পছন্দের প্রতিষ্ঠানে হাজির হয়ে কথা বলে দেখতে পারেন, আপনার আগ্রহের কথা জানাতে পারেন। এ ক্ষেত্রে পরিচিত কারও মাধ্যমে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
সুযোগ যেখানে
বাংলাদেশে কাজ করছে, এমন কয়েকটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত বিভিন্ন বিভাগে খ-কালীন চাকরির সুযোগ দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক এনজিও, টেলিভিশন, আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাসমূহের বিভিন্ন প্রকল্পে খ-কালীন কাজের সুযোগ দেখা যায়। ওয়ালটন, আগোরা, ম্যারিকো বাংলাদেশ, আড়ং, ডেলিগ্রাম টেকনোলজি, র‌্যাংগস মটরস, ইন্সপিরা অ্যাডভাইজরি ও কনসাল্টিং লিমিটেডসহ বিভিন্ন দেশি–বিদেশি প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ আছে।
কাজের মাত্রা
সাধারণত, প্রচলিত নিয়মে আট ঘণ্টা কাজ খ-কালীন চাকরিতে করার প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো কাজের প্রয়োজনে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। এলিট পেইন্টের মানবসম্পদ বিভাগের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মোরাদ হোসেন বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগ অনুসারে কাজের মাত্রা থাকে। যেহেতু নবীন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা খ-কালীন চাকরি করেন, তাই প্রতিষ্ঠানগুলোতে তেমন একটি কাজের চাপ থাকে না। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের কাজের চাপ কম ভেবে কাজ না করে নানা মাত্রার কাজ শেখার দিকে সুযোগ দেওয়া উচিত। বর্তমানে যারা চাকরি করছেন, তাদের বেশি বেশি প্রশ্ন করে তাদের কাছ থেকে সুযোগ ও কৌশলগুলো সম্পর্কে জেনে নিতে হবে।
খ-কালীন চাকরি কেন গুরুত্বপূর্ণ
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষা উন্নয়ন গবেষক মো. সাদ্দাম হোসেন মনে করেন, যেকোনো সুযোগ শিক্ষাজীবনে কাজে লাগাতে হবে। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের প্রথম ও প্রধানতম কাজ হচ্ছে পড়াশোনা। এরপরে ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে তৈরি করতে খ-কালীন চাকরির সুযোগ নিতে হবে। এতে ভবিষ্যতের জন্য যেমন নিজেকে তৈরি করা যায়, তেমনি বিভিন্ন ব্যবহারিক দক্ষতা সম্পর্কেও গভীরভাবে জানা যায়।
যেসব বিষয়ে লক্ষ রাখবেন
● পড়ালেখাকে সবার আগে গুরুত্ব দিতে হবে। পড়ালেখা সামলে যদি সম্ভব হয়, তাহলেই খ-কালীন কাজে যোগ দিন।
● স্পষ্ট, নির্ভুল ভাষায়, গুছিয়ে একটি সিভি তৈরি করুন।
● কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে ভাইবার মাধ্যমে খ-কালীন চাকরির সুযোগ পাওয়া যায়। তাই মৌখিক পরীক্ষার কৌশলগুলো জানতে হবে।
● সুযোগের খোঁজ রাখতে বিভিন্ন নামীদামি প্রতিষ্ঠানের লিংকডইন প্রোফাইল আর ওয়েবসাইটে নিয়মিত ঢুঁ মারতে হবে।
● রাস্তায় পাওয়া লিফলেট কিংবা পোস্টারে যদি কোনো খ-কালীন চাকরির খবর দেখেন, এসবের ওপর আস্থা না রাখাই ভালো।
● পরিচিতদের মধ্যে যাঁরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন, তাদের জানান, আপনি একটি খ-কালীন কাজ খুঁজছেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ঘুরে মানুষের সঙ্গে কথা বলুন, আগ্রহ প্রকাশ করুন।

Please follow and like us:
3