শনি. এপ্রি ২০, ২০১৯

ক্যান্সার থেকে বেঁচে ফেরার গল্প

ক্যান্সার থেকে বেঁচে ফেরার গল্প

Last Updated on

আজমল তানজিম সাকির (১৫), ঢাকা : পৃথিবীতে যে রোগগুলোতে মানুষের প্রচ- ভীতি তার মধ্যে একটি ক্যান্সার। এ ক্যান্সারের কারণে প্রতি বছর ঘটছে অজস্র মানুষের মৃত্যু। থামিয়ে দিচ্ছে অনেকের জীবন কাব্য, অনেকের জীবনকে করেছে ছন্দহীন। কেউ আবার লড়াই করে ফিরে এসেছেন।
প্রতি বছর ৪ ফেব্রুয়ারি পৃথিবী জুড়ে পালিত হয় বিশ্ব ক্যান্সার দিবস। ক্যান্সার প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরির জন্য এ দিবস পালিত হয়।
ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন ভারতের অভিনেত্রী মনীষা কৈরালা। এ বছর ঢাকার লিট ফেস্টে এসে তিনি জানিয়েছিলেন তার ক্যান্সারের সাথে লড়াই করার গল্প। সারা শরীরে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ার পর জেনেছিলেন তিনি। তিনি বলেন, ‘অনেক পরে আমাকে জানানো হলো, আমার জরায়ুর ক্যান্সার এবং সেটা কেটে ফেলে দিতে হবে। এটা শোনার পর মনে হল, আমার জীবনের নিঃসঙ্গ রাত শুরু।’
তিনি শোনান তার সংগ্রামের গল্প। ক্যান্সার তার জীবনকে বদলে দিয়েছেন বলে জানান তিনি। আর এ সংগ্রামের পুঁজি ছিল দৃঢ় মনোবল। তিনি বলেন, ‘আমি কখনও মনে করিনি আমাকে অল্প কিছু দিন বাঁচতে হবে। আমার বিশ্বাস ছিল, আমি একদিন পুরোপুরি সুস্থ হব।’
ভারতের ক্রিকেটার যুবরাজ সিংও আক্রান্ত হয়েছিলেন ক্যান্সারে। ভারতকে ২০১১ বিশ্বকাপ জেতানোর নায়ক তিনি। বিশ্বকাপ খেলার সময় ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল। ফুসফুসে ক্যান্সার ধরা পড়েছিল তার। ব্যাট-বলের লড়াকু এবার লড়াই করেন জীবনযুদ্ধে। অবশেষে ক্যান্সারকে হার মানিয়ে ২০১২ সালে ক্রিকেটে ফেরেন তিনি। তবে ক্যান্সার যেন তার ক্রিকেট ক্যারিয়ারে ছিল এক ছন্দপতন। বিশ্বকাপের নায়ক যুবরাজ এরপর দারুণ সব পারফর্ম করলেও ধারাবাহিকতার অভাবে থিতু হতে পারেননি। তবে বিশ্ব ক্রিকেটের এক বড় অনুপ্রেরণাদায়ী চরিত্র তিনি।
ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন অস্কার জয়ী অভিনেতা রবার্ট ডি নিরো। ‘দ্যা গডফাদার’ চলচ্চিত্রের অভিনেতা ডি নিরো আক্রান্ত ছিলেন প্রোস্টেট ক্যান্সারে। ২০০৩ সালে প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন এ আমেরিকান অভিনেতা। তখন তার বয়স ছিল ৬০। তবে শুরুর পর্যায়ে শনাক্ত করতে পারায় তাকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব হয়।
বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ড অর্থহীনের প্রতিষ্ঠাতা সুমনও দীর্ঘদিন লড়াই করেছেন ক্যান্সারের সঙ্গে। সেই ক্যান্সার থেকে সেরে ওঠার পথে একের পর এক অস্ত্রোপচার হয় তার। তবু হাল ছাড়েননি তিনি। অফুরন্ত প্রাণশক্তি নিয়ে আবার গানে ফিরেছেন সবার প্রিয় বেজবাবা সুমন।
ক্যান্সারকে জয় করেছেন এমন সাধারণ মানুষদের সঙ্গেও কথা হয় হ্যালোর। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়নরত তানিন মেহেদি শোনান তার লড়াইয়ের কথা।
২০১৫ সালে উচ্চ মাধ্যমিকের প্রথম বর্ষে পড়তেন তানিন মেহেদি। তখন পায়ের হাঁটুতে টিউমার হয় যা রূপ নেয় ক্যান্সারে। ২০১৭ সালে ক্যান্সার শনাক্ত হয় তার। বাংলাদেশের একেক হাসপাতালে একেক ধরণের কথা শুনে ভারতে গিয়ে চিকিৎসা করান তিনি। আটকে যায় পড়াশোনা। পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে যেখানে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াই ছিল কঠিন সেখানে ক্যান্সারকে জয় করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্যদের সহায়তায় ক্যান্সারকে মোকাবেলা করেছেন তানিন। তিনি বলেন, ‘পারিবারিক অসচ্ছলতা ছিল। আমি লজিং থেকে, টিউশনি করিয়ে টাকা কামিয়ে পড়ালেখা চালিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির দেড় মাসেই ক্যান্সার ধরা পড়লে অনেক ভেঙে পড়েছিলাম। ভারতে প্রায় আড়াই মাস ছিলাম। সব সময় দোয়া করতাম যেন খুব খারাপ যেন না হয়। আমরা যেটাকে হাঁটুর বাটি বলি, সেটা ফেলে দিতে হয়েছে।’
‘সাংবাদিকতার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু এখন হাঁটতে কষ্ট হয়। তখনও চলাচলে অনেক কষ্ট হয়েছে। হাসপাতালে যাতায়াত করতে সমস্যা হতো।’
থেরাপি চালিয়ে গেলে স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবেন তিনি, এমন আশ্বাস দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
আসিফ রেজা টিটুর বাবা আক্রান্ত হয়েছিলেন রেক্টাম ক্যান্সারে। আর বাবা পেশায় চিকিৎসক হলেও অন্যের কথায় প্রভাবিত হয়ে গিয়েছিলেন কবিরাজের কাছে। তিনি বললেন, ‘২০০৭-৮ সালের দিকে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। গ্রামের মানুষদের কথায় কবিরাজ আর হোমিওপ্যাথির কাছে প্রথমে গেলে তারা বলে গ্যাসের সমস্যা, অশ্ব-পাইলসসহ নানান কথা।’
২০০৯ সালে তার অস্ত্রোপচার হয় জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। এখন তিনি সুস্থ থাকলেও ভারী কোনো কাজ করতে পারেন না। তার পায়ুপথ ফেলে দিতে হয়। বর্তমানে শার্ট-প্যান্ট পরতে পারেন না তিনি। পরতে হয় পাঞ্জাবী-পায়জামা। এমনকি চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন তার ক্যান্সারের জীবাণুটি এ যাবৎ হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পর সন্ধান পাওয়া ‘সবচেয়ে বড়’ জীবাণু। ক্যান্সারের সাথে লড়াইয়ের সময় পরিবারের সংগ্রাম নিয়ে তিনি বলেন, ‘যেই পরিবারের মানুষের ক্যান্সার হয় সে বোঝে সংগ্রাম কী জিনিস। প্রথম সমস্যাটা হলো আর্থিক, টাকা-পয়সা খরচের কোনো কুলকিনারা থাকে না। ওষুধের এত দাম ছিল, হয়তো এখন কমানো হয়েছে। তাকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসা হলো তখন আমরা ছিলাম ছোটো। পড়াশোনাও বন্ধ ছিল। যখন বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করান হয়, তখন তো পড়াশোনার অবস্থা থাকে না।’
‘এলাকার মানুষের মুখে মুখে ছিল মানুষ বাঁচবে না। গ্রামের মানুষের একটা ধারনা ক্যান্সার হলেই শেষ। এটা মনোবল নষ্ট করে দেয়। মানুষের রোগ অর্ধেক ভালো হয় আত্মবিশ্বাসের কারণে সেখানে আত্মবিশ্বাসটা শুরুতেই ভেঙে পড়ে। এমনকি আমাদের পরিবারকে অনেকে বলে যে বাবার চিকিৎসার টাকা দিয়ে ভালো-মন্দ কিছুদিন খাওয়া দাওয়া কর, বাবা তো মরেই যাবে!’
বাংলাদেশেই তার বাবার ক্যান্সারের চিকিৎসা হয় বলে জানান তিনি। তবে দেশে সরঞ্জাম না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে বিদেশে যান বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘মহাখালীর ক্যান্সার হাসপাতালে গেলে দেখবেন ৬০ ভাগ মেশিন নষ্ট। অন্যান্য জায়গায় একই অবস্থা। পর্যাপ্ত সরঞ্জাম নাই। আগে ৪-৫ টা মেশিনে রেডিওথেরাপি দিত, এখন একটা।’ সৌজন্যে : বিডিনিউজের শিশু সাংবাদিকতা বিষয়ক বিভাগ ‘হ্যালো’ থেকে সংগৃহীত।

Please follow and like us:
0