কেমন হবে একুশ শতকের ব্যবসায় শিক্ষা?

কেমন হবে একুশ শতকের

মোঃ আশরাফ আলী : একবিংশ শতকের ব্যবসায় শিক্ষা সম্পূর্ণটাই প্রযুুক্তি নির্ভর। ইন্টারনেট বিপ্লবের ফলে বই খাতার পাঠ চুকে যেতে বসেছে। দিন বদলের সুবাতাস বইছে শিক্ষাখাতে। প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার। শ্রেণীকক্ষ রূপান্তরিত হচ্ছে ডিজিটাল ল্যাবে। চক ডাস্টারের জায়গা দখল করছে প্রজেক্টর। ভিডিও প্রোগ্রামের মাধ্যমে স্কিনে ভেসে ওঠছে বহুমাত্রিক তথ্য উপাত্ত-ছবি। ঘরে বসে বিশ্বের জ্ঞানভান্ডারের সাথে রাখা যাচ্ছে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে দৃশ্য পরম্পরায় পাঠ হচ্ছে আকর্ষণীয় ও মনোমুগ্ধকর।
পারিপার্শ্বিক দিক বিবেচনায় রেখে ব্যবসায় শিক্ষা এগিয়ে চলেছে। ব্যবসায় যারা সাফল্য অর্জন করছে; তারাই এখন অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে (ঊপড়হড়সরপ ংঁঢ়বৎঢ়ড়বিৎ) রূপান্তরিত হয়েছে। সৃষ্টি হচ্ছে অর্থনৈতিক জোট। এই জোটের মাধ্যমে বহুজাতিক সংস্থাগুলি বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এমন এক সময় ছিল যখন বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের একমাত্র উপায় ছিল যুদ্ধের হুমকি এবং অস্ত্রের মহড়া কিন্তু বর্তমানে বাজার নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের মহোৎসব চলছে।
বিশ্বের সবচেয়ে সম্পদশালী ১০জনের সবাই সফল ব্যবসায়ী। মেক্সিকোর কার্লোস স্লিম হেলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিলগেট্স, ওয়ারেন বাকেট, ভারতে মুকেশ আম্বানি এরা সবাই ব্যবসায়ী; লক্ষ্মীর বরপুত্র। তাঁদের সকলেই লাভ করছেন ঈওচ (ঈড়সসবৎপরধষষু ওসঢ়ড়ৎঃধহঃ চবৎংড়হ) এর মর্যাদা। রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে গড়ে ওঠছে অর্থনৈতিক জোট, বাণিজ্যিক জোট, গুরুত্ব পাচ্ছে ‘ঊপড়হড়সরপ উরঢ়ষড়সধপু। আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোটও গড়ে ওঠছে যেমন ইওগঝঞঊঈ, ডঞঙ, ঊট প্রভৃতি। দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক বাণিজ্যিক সহজীকরণ ও সম্প্রসারণের ধারণা থেকেই বিভিন্ন আঞ্চলিক ও অর্থনৈতিক ব্লকের প্রতিষ্ঠা।
ব্যবসায়-বাণিজ্যকে উদ্দেশ্য করেই গড়ে উঠেছে অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংক, ওগঋ, অউই, ওউই প্রভৃতি। বিশ্বব্যাংক হচ্ছে ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদদের একটি কনসোর্টিয়াম। এই বিশ্বব্যাংক গত ৫০বছরে যা আয় করেছে- পৃথিবীর সব ব্যাংক মিলেও তার এক শতাংশের এক দশমাংশও আয় করতে পারেনি। এই বিশ্বব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করছে ব্যবসায় শিক্ষায় কীর্তিমানেরা। এসব তথ্য থেকেই সহজেই অুনমেয় ব্যবসায় শিক্ষার গুরুত্ব।
ব্যবসায় শিক্ষার ডিগ্রি অর্জনে প্রাণান্ত প্রয়াস পরিলক্ষিত হচ্ছে বিশ্বের সর্বত্র। সারা বিশ্ব এখন ব্যবসায়ীদের করতলগত। রাজনীতি-সমাজনীতি ও অর্থনীতি সবই পরিচালিত হয় ব্যবসায়ীদের দ্বারা। ব্যবসায় শিক্ষার ডিগ্রি এখন সবার প্রথম পছন্দ। সাধারণ ডিগ্রির মান এখন অনেকটাই নি¤œগামী। একসময় ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য লন্ডনে যাওয়া ছিল স্বপ্নের বাস্তবায়ন, কিন্তু এখন ইইঅ. গইঅ, ঈঅ, ঈগঅ, অঈঈঅ, ঈচঅ সে জায়গা দখল করে নিয়েছে, কারণ সবারই বোধগম্য। স্টুডেন্ট ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পায় ব্যবসায় শিক্ষা ডিগ্রি অর্জনের জন্য আবেদনকারীরা। এ অনুষদের ডিগ্রিধারীদের জন্য বিশ্ববাজারের দ্বার অবারিত। টাকায় নয়, ডলার, ইউরো’তে বেতন, মর্যাদা বিশ্ব নাগরিকের। এ সুযোগ কে হাত ছাড়া করে? তাই যুগের পছন্দ ব্যবসায় শিক্ষা।
আমাদের করণীয়
‘সবাই যখন এগিয়ে চলেছে আমরা দেখব চেয়ে?’ মোটেই না। আমরাও শুরু করেছি আন্তরিক প্রচেষ্টা ও উদ্যম নিয়ে। দিনবদলের হাওয়ায় বদলে যাওয়ার বদলে দেয়ার বীজ বপন করে চলেছি নিরন্তর। সুন্দর আগামীর স্বপ্ন আমাদের চোখে-মুখে। এ আলো ছড়িয়ে পড়–ক সবখানে। রাষ্ট্রীয় মূলনীতি অনুসরণে শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে আমরা কাজ করে চলেছি। তরুণ প্রজন্মকে দেখিয়ে চলেছি সুন্দর ভবিষ্যত বিনির্মাণের উৎকৃষ্ট পথ ও পন্থা। পাচ্ছি আপামর জনসাধারণের ভালবাসা, শিক্ষক-সূধী সমাজের উৎসাহ-অনুপ্রেরণা ও দিকনির্দেশনা। নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত করে আদর্শ মানুষ রূপে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। এ প্রজন্মকে সৎ, দক্ষ, যোগ্য, চরিত্রবান ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে রাষ্ট্রকে গ্রহণ করতে হবে সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ। ব্যক্তি-সমাজ-প্রতিষ্ঠান সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই একুশ শতকের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। কর্মের উত্তাপে বেকারত্বের জমানো বরফ গলানোর এ যুদ্ধে আমরা পালন করে চলেছি যোগ্য সৈনিক হিসেবে গড়ে তোলার সফল প্রয়াস।
মানব পুঁজি (ঐঁসধহ ঈধঢ়রঃধষ) কে কেন্দ্র করেই নতুন শতাব্দীকে মোকাবেলা করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিতে হবে। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ চীন ক্ষুদ্রমাঝারি-বৃহৎ উদ্যোক্তায় পরিপূর্ণ। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করার জন্যই বোঝা না হয়ে, হয়েছে পুঁজি। আমাদেরকে শুধু তাকিয়ে দেখলেই চলবে না; শ্রমকে পুঁজিতে রূপান্তর করে এগিয়ে যেতে হবে। আমরা এ বিষয়ে সর্তক এবং সচেতন করছি শিক্ষার্থীদের।
ন্যূনতম মজুরিতে অমানুষিক শ্রম এটা কি আমাদের বিধি-লিপি? আমরা মানতে নারাজ। মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতা দিয়ে আমরা ন্যায্য হিস্যাও আদায় করার পক্ষে। শুধু কায়িক শ্রম নয় সর্বোচ্চ পদে আসীন হওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি। নতুন শতাব্দীতে টিকে থাকতে হলে ব্যবসায়িক দক্ষতাকেই অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করে যেতে হবে। অসংখ্য উদ্যোক্তা তৈরির পক্ষে আমাদের অবস্থান।
জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন (ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ) নিশ্চিত করার জন্য বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কর্মসংস্থান ব্যাংক পুঁজি সবরাহ করে আসছে। দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য যা সহায়ক ভূমিকা রাখছে। আমরা শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষাদ্যোক্তা হিসেবে নতুন প্রজন্মের যারা ব্যবসায় শিক্ষায় আগ্রহী, তাদেরকে একুশ শতকের সর্বোন্নত ব্যবসায় শিক্ষার সুযোগ তৈরির চেষ্টায় নিয়োজিত। একই সাথে আমরা পুঁজির সুষ্ঠু ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়ে চলেছি।
পুঁজি বাজার ব্যবসায় অভিজ্ঞ লোকদের বিনিয়োগের উত্তম ক্ষেত্র। বর্তমান সময়ে অস্থিতিশীলতার পেছনে বিনিয়োগকারীদের সচেতনতার বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য। শেয়ার বাজার সম্পর্কে ছাত্র-ছাত্রীদের সচেতন করার জন্যও আমরা কাজ করে চলছি। ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রধান নির্বাহী হিসেবে কাজ করার জন্য মানসিক প্রস্তুতি তৈরিতেও সহায়তা করছি। সর্বোপরি আমরা তথ্য প্রযুক্তির সম্পৃক্ততায় পরিচালানা করছি সর্বোন্নত ব্যবসায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ব্যবসায় শিক্ষা বলতে শুধুই বানিজ্যিক মনোভাব নয়। উদার মনোভাব, গতিশীল, নেতৃত্ব, সৃজনশীলতার বিকাশ, চিন্তা-চেতনায় আধুনিকতার ছাপ সর্বশেষ ব্যবসায়-বাণিজ্য ভিত্তিক তথ্য সরবরাহ করে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে চেষ্টা করছি আমরা।
লেখক : প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, ঢাকা কমার্স কলেজ।

Please follow and like us:
0