Published On: বুধবার ০৪ জুলাই, ২০১৮

কেমন চলছে এসি রবিউলের স্বপ্নের প্রতিবন্ধী স্কুল?

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি : রবিউল করিম কামরুল। সবার কাছে পরিচিত এসি রবিউল নামে। প্রত্যেক বছরের ১ জুলাই আসলে নামটি আরও দীপ্তি ছড়ায়। সামর্থের সীমানাকেও যিনি জীবন দিয়ে করে গেছেন মহিমান্বিত। বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে তার নামটি আজীবন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কিন্তু, রবিউলই হয়তো চাননি তার নাম কোনো ইট-পাথরে বসে ঝকঝক করুক, মুখে মুখে উচ্চারিত হোক। চেয়েছেন, কারও না কারও অন্তর থেকে আসুক। ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বময়, আলোকচ্ছটা হয়ে। তাইতো স্বপ্নচারী মানুষটি কর্মজীবনের বাইরেও সন্ধান করেছেন, গভীরভাবে ভেবেছেন কি করা যায়? ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও পথের দিশা পেয়েছেন। সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত, সুবিধাবঞ্চিত কোমলমতী প্রতিবন্ধীদের জন্য গড়ে তুলেছিলেন স্কুল।
কিন্তু, ২০১৬ সালের ১ জুলাই এই মানুষটির স্বপ্নকে থামিয়ে দিয়েছে জঙ্গিরা। গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার খবরে জিম্মিদের উদ্ধারে ছুটে গেলে গ্রেনেডের স্প্লিন্টারে থেমে যায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এসি রবিউল করিমের জীবন প্রদীপ। রবিউল মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার আটিগ্রামের মৃত আবদুল মালেক ও করিমন নেসা দম্পতির বড় ছেলে। গত রোববার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে মানিকগঞ্জে নানা আয়োজনে তাকে স্মরণ করা হয়। দুই ভাইয়ের মধ্যে বড় ছিলেন বরিউল। পাশের কাটিগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কাটিগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। ঢাকার ধামরাই উপজেলার কালামপুর আতাউর রহমান খান ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি শেষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করেন অনার্স-মাস্টার্স।
স্বপ্ন দেখতেন প্রতিবন্ধীদের নিয়ে। এজন্য পুলিশে চাকরি শুরুর আগেই রবিউল ২০১১ সালে নিজ গ্রামে মায়ের দান করা ২৯ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠা করেন প্রতিবন্ধী বিশেষায়িত স্কুল, যার নামকরণ করা হয় ‘বিকনিং লাইট অর্গানাইজেশন অব ম্যানকাইন্ড অ্যান্ড সোসাইটি’ সংক্ষেপে ব্লুমস। শারীরিক সক্ষমতাহীন ১২ শিশু নিয়ে যাত্রা শুরু হয় স্কুলটির। পরে ইতালি চলে যান রবিউল। প্রবাস থেকে ফিরে ২০১২ সালের জুনে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেন। স্বপ্নটা ভালোভাবেই এগিয়ে নিচ্ছিলেন রবিউল। স্কুলটিতে দিন দিন শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও বাড়ছিল। এরই মধ্যে জঙ্গি দমনে অভিযানে গিয়ে নিহত হন। তার মৃত্যুতে স্কুলটির কার্যক্রম থমকে যাবে এমনই ভেবেছিলেন অনেকে। ভেঙে যাবে রবিউলের স্বপ্ন। কিন্তু, না। রবিউলের পরিবারের সদস্যদের চেষ্টা এবং এলাকার বিত্তশালীদের সহযোগিতায় ভালোভাবেই পরিচালিত হচ্ছে স্কুলটি।
ব্লুমস পরিচালক (প্রশাসন) জাহাঙ্গীর আলম জানান, শারীরিক, বাক, শ্রবণ, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিজম আক্রান্ত ৪০ শিশু ছেলে-মেয়ে তাদের স্কুলে লেখাপড়া করছে। সপ্তাহে চার দিন সকাল নয়টা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত পাঠদান চলে। বর্ণমালা, ছড়া শেখানো এবং সরকারি স্কুলগামী প্রতিবন্ধী শিশুদেরও পাঠে সহযোগিতা করা হচ্ছে। স্কুল প্রাঙ্গণে রয়েছে খেলাধুলার ব্যবস্থা।
সরেজমিনে ব্লুমসে গিয়ে কথা হয়, শিক্ষার্থী শীলা রাণী ও সাকিব হোসেনের সঙ্গে। পিতৃস্নেহ দিয়ে আসা রবিউলকে তারা দেখে না দুই বছর। তার নাম বলতেই দুই কোমলমতীর চোখে-মুখে বিষণ্নতা। এক পর্যায়ে এখানে পড়তে কেমন লাগে, বলতেই শীলা ও সাকিব সমস্বরে জবাব দেয়, ‘খুব ভালো। আমরা এখানে খেলি, বন্ধুদের সঙ্গে মজাও করি।’
অভিভাবকেরা জানান, গ্রামের ভেতর প্রতিবন্ধী স্কুলটি হওয়ায় তাদের ছেলেমেয়েকে নিয়ে দূরে যেতে হচ্ছে না। সহজে লেখাপড়া করতে পারছে। কর্তৃপক্ষও খুবই আন্তরিক। ব্লুমসের শিক্ষক শামীমা নাসরিন শাওন জানান, রবিউল ভাইয়ের স্বপ্নের বাস্তব রূপ দিতে এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে তিনি শিক্ষকতা করছেন।
নামেমাত্র সম্মানী নিয়েও খুশি নাসরিন, ‘সমাজের অবহেলিত শিশুদের জন্য কিছু একটা করতে পারছি, এতেই আমি তৃপ্ত। বেতন-কড়ি নিয়ে ভাবি না।’ ব্লুমস পরিচালনা পরিষদের সভাপতি শওকত আলী জানান, স্কুলটি পরিচালনায় স্থানীয় বিভিন্ন পেশার শুভানুধ্যায়ীদের নিয়ে ১৫ সদস্যের একটি কমিটি আছে। ২০১৬ সালের ১৬ জুলাই সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমাজসেবা অধিদফতরে এটি ‘ব্লুমস কাটিগ্রাম’ নামে অলাভজনক ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে। তিনি আরও জানান, ২০১৭ সাল থেকে স্কুলটিতে ‘ডে-মিল’ চালু করা হয়েছে। বর্তমানে স্কুলটি পরিচালনা করতে প্রতিমাসে ৪০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। স্থানীয় বিত্তশালীদের আর্থিক সহযোগিতায় তা বহন করা হয়। স্মৃতিচারণ করে রবিউলের স্ত্রী উম্মে সালমা বলেন, ‘রবিউল নিজগুণে সবার আপনজনে পরিণত হয়েছিল। নিঃস্বার্থ সমাজসেবকের পাশাপাশি একজন স্বাপ্নিক মানুষ ছিল। সেই স্বপ্ন থেকেই প্রতিষ্ঠা করেছিল ব্লুমস।’
তিনি বলেন, ‘রবিউল শহীদ হওয়ার পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দিয়েছে। সেখানে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এই প্রতিবন্ধী শিশুদের মধ্যে আমার স্বামীর স্বপ্নকে খুঁজে বেড়াই। আমাদের সন্তান সাজিদুল করিম সামি (৮) ও কামরুন নাহার রায়নাকে (২) যেমন ভালোবাসি, তেমনি এই প্রতিবন্ধী ৪০ শিশুকেও ভালোবাসি। আল্লাহ চাইলে সব প্রতিকূলতা মাড়িয়ে আজীবন স্বামীর এই স্বপ্নকে আমি লালন করে যাব।’

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Videos