কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে না থেকেই আয় করছে মোটা অংকের টাকা

কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে

নিজস্ব প্রতিবেদক : কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেই বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) থেকে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো মোটা অংকের টাকা আয় করছে। মূলত ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওই অর্থ পাচ্ছে। আর সেজন্য বিপিডিবিকে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। সাধারণত জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যবহার করা হয়। ভাড়া করার পর ওসব বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রাখার নজির বিশ্বে খুবই কম। কিন্তু বাংলাদেশে ঘটছে তার বিপরীত। এখানে অভাবনীয় ক্যাপাসিটি চার্জ ও অধিক মূল্যহারে ভাড়া নিয়েও রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে রাখা হচ্ছে। বিপিডিবি সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ না কিনলেও বিপিডিবিকে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ একটি নির্দিষ্ট অর্থ ব্যয় করতে হয়। তরল জ¦ালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর আয়ের অন্যতম উৎস ওই ক্যাপাসিটি চার্জ। এ কারণে যখন বিপিডিবির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়, তখন বাস্তবিক ক্যাপাসিটির চেয়ে অধিক পরিমাণ ক্যাপাসিটি দেখিয়ে থাকে বেসরকারি ওসব কোম্পানি। ওই কারণে পুরো বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ অর্জিত অর্থ দিয়েই ওসব কোম্পানির চলে যায়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৫টি রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রেরর পেছনে বিপিডিবি ১ হাজার ১৪২ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। অথচ ওই বছর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ব্যবহার হয়েছে মাত্র ৮ থেকে ২১ শতাংশ। বিপিডিবি ওই অর্থবছরে ৩১টি রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনেছে। তার মধ্যে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলভিত্তিক অনেক কেন্দ্র ব্যবহারের হার ৮ থেকে ২০ শতাংশ মাত্র। বছরের প্রায় ৮০ শতাংশ সময় ওসব বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসে থাকছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মোট ৩১টি রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনে বিপিডিবি। বর্তমানে যার সংখ্যা কমে ২৩টিতে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র জানায়, বছরের বড় অংশজুড়ে উৎপাদনে না থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একটি হচ্ছে রহিমআফরোজ গ্রুপের ঠাকুরগাঁও ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র। ৩৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ ক্যাপাসিটিতে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ওই কেন্দ্রটির প্লান্ট ফ্যাক্টর ছিল প্রায় ৯ শতাংশ। অথচ ওই অর্থবছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির বিপরীতে বিপিডিবির মোট ব্যয় হয়েছে ৮২ কোটি টাকা। অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয়টি হচ্ছে খুলনায় এগ্রিকোর ৫৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র। ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ব্যবহারের হার ছিল ১৬ দশমিক ২১ শতাংশ। আর তার বিপরীতে বিপিডিবির ব্যয় হয়েছে ২০২ কোটি টাকা। তাছাড়া সিদ্ধিরগঞ্জে দেশ এনার্জির ১০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ব্যবহার হয়েছে মাত্র ১৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। অথচ সেজন্য ওই অর্থবছরে বিপিডিবির ব্যয় ৪৫৩ কোটি টাকা। একইভাবে নারায়ণগঞ্জের পাগলায় ডিপিএ এনার্জির ৫০ মেগাওয়াট কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ১৯ দশমিক ১১ শতাংশ সময় ব্যবহার হয়েছে। যদিও ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ক্যাপাসিটি ৩৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ। কোম্পানিটি ওই অর্থবছরে বিপিডিবি থেকে আয় করেছে ২৪২ কোটি টাকা। তাছাড়া প্রায় ৩৬ শতাংশ সক্ষমতা সম্পন্ন এগ্রিকোর আশুগঞ্জ ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ব্যবহার সময় ছিল ২১ শতাংশ। ওই অর্থবছরের ওসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপরীতে বিপিডিবির মোট ব্যয় ছিল ১ হাজার ১৪২ কোটি টাকা।
সূত্র আরো জানায়, বিপিডিবি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়ার নীতি মেনে চলে। তারপর প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য জ¦ালানিভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ নেয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোকে প্রাধান্য দেয়া হলেও ওসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের দক্ষতা খুবই কম। কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রেরর দক্ষতা মাত্র ২৭ শতাংশ। কম দক্ষতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার কারণে অধিক পরিমাণ জ¦ালানি ব্যবহার করতে হয়। তারপরও বছরের ৯০ শতাংশ সময়জুড়ে ওসব বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যবহার করা হয়। তাতে প্রচুর পরিমাণ জ¦ালানির অপচয় হয়। তাছাড়া রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি যা উল্লেখ করা হয়, বাস্তবিক অর্থে তা অনেক কম। যে কারণে বিভিন্ন সময় চুক্তিবদ্ধ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ দিতে ব্যর্থ হয় কেন্দ্রগুলো। তাদের এমন ব্যর্থতার কারণেও বিপিডিবি ওসব কেন্দ্র কম ব্যবহার করে থাকে। যে কারণে তাদের ক্যাপাসিটির হার বেশি দেখালেও প্লান্ট ফ্যাক্টর অনেক কম।
এদিকে এ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রথমবার যেসব রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট নেয়া হয়েছিল, সেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র তখনই ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ পাওয়া অর্থ দিয়ে সব ব্যয় তুলে নিয়েছে। দ্বিতীয়বার মেয়াদ বৃদ্ধির সময় তাদের আবার ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ধারণ অযৌক্তিক। দ্বিতীয় মেয়াদে ওসব বিদ্যুৎকেন্দ্র ভাড়া নেয়ারও দরকার ছিল না। কিছু ব্যবসায়ীকে সুবিধা দেয়ার জন্যই সেটি করা হয়েছে। তাছাড়া নিয়ম অনুযায়ী কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সবসময় বিপিডিবির প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। ওসব বিদ্যুৎকেন্দ্র ১০ শতাংশের বেশি আন-অ্যাভেইলেবল হলে দ- দিয়ে থাকে বিপিডিবি।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী খালেদ মাহমুদ জানান, চাহিদা বিবেচনা করেই রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নেয়া হয়েছে। যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র কম ব্যবহার হয়েছে, তাদের প্রায় সবগুলোই ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলভিত্তিক। আর সুপার ক্যাপাসিটির কেন্দ্র না হলে বিপিডিবি তা কম ব্যবহার করে। আর পৃথিবীর সব দেশেই ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ বেসরকারি কেন্দ্রগুলো অর্থ পেয়ে থাকে। সেটা না হলে তারা ব্যাংকের অর্থ পরিশোধে বিপাকে পড়বে। তবে বিপিডিবি সবসময় বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ধারণের ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করে। কম চার্জ নির্ধারণের বিষয়ে বিপিডিবির চেষ্টা সবসময় থাকে।

Please follow and like us:
0