শনি. জুলা ২০, ২০১৯

এরশাদ অধ্যায়ের অবসান

Last Updated on

নিজস্ব প্রতিবেদক : জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আর নেই (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)। গতকাল রোববার সকাল পৌনে ৮টায় ঢাকার সিএমএইচ হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। গত ১০ দিন ধরে এই হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন তিনি। সদ্য প্রয়াত জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রথম জানাজা গতকাল রোববার বাদ জোহর ঢাকা সেনানিবাসের সেনা কেন্দ্রীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা ও রংপুরে আরও তিন দফায় জানাজার পর আগামীকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বনানীতে সেনা কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।
জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দুই নেতা তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। এছাড়া মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও।
এরশাদের ডেপুটি প্রেস সেক্রটারি খন্দকার দেলোয়ার জালালী জানান, সোমবার সকাল ১০টা জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দ্বিতীয় জানাজা হবে। সেখান থেকে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে নেওয়া হবে মরদেহ। ওইদিন বাদ আসর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে তৃতীয় জানাজা হবে। এরপর রাতে সিএমএইচের হিমঘরে রাখা হবে এরশাদের মরদেহ।
জালালী আরও জানান, মঙ্গলবার সকাল ১০টায় সিএমএইচ থেকে হেলিকপ্টারে এরশাদের মরদেহ নেওয়া হবে রংপুরে। রংপুর জেলা স্কুল মাঠে অথবা ঈদগাহ মাঠে বাদ জোহর চতুর্থ জানাজার পর এরশাদের মরদেহ পুনরায় ঢাকায় আনা হবে। ওইদিনই বনানীর সামরিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।
সিএমএইচ হাসপাতালে গত ৪ জুলাই থেকে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন এরশাদ। তিনি রক্তের রোগ মাইলোডিসপ্লাস্টিক সিনড্রোমে ভুগছিলেন। তার আগে গত ২২ জুন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে সিএমএইচে নেওয়া হয়। এরশাদ গত কয়েক বছর ধরেই স্বাস্থ্য নিয়ে সমস্যায় ছিলেন। গত বছরের শেষের দিকে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে যান তিনি। এরপর থেকেই রাজনৈতিক কর্মসূচিতে খুব একটা দেখা যায়নি তাকে। এ সময় নিজের সম্পত্তি ট্রাস্টে দিয়ে দেন এরশাদ। এ ছাড়া অসুস্থতার কারণেই ভাই জি এম কাদেরকে নিজের উত্তরসূরি ঘোষণা করে তাকে জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বে বসান এরশাদ।
১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত ভারতের কোচবিহার জেলায় জন্ম এরশাদের। পরে রংপুরে চলে আসে তার পরিবার। সেখানেই তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেন। এরপর ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে ১৯৫২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে পদোন্নতি পেয়ে ১৯৭১-৭২ সালে সপ্তম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবর্তন করেন। পরে ১৯৭৩ সালে এরশাদকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল নিয়োগ করা হয়। ১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ব্রিগেডিয়ার পদে পদোন্নতি লাভ করেন। ওই বছরই আগস্ট মাসে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে তাকে সেনাবাহিনীর উপপ্রধান হিসেবে নিয়োগ করা হয়। ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসে এরশাদকে সেনাবাহিনীপ্রধান পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৭৯ সালে তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকা-ের অব্যবহিত পর ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন এরশাদ। ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (সিএমএলএ) হিসেবে দেশ শাসন করেন। এরপর রাষ্ট্রপতি আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে অপসারণ করে ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এরশাদ। স্বৈরাচারবিরোধী প্রবল গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
এরশাদের ঘটনাবহুল জীবন : সদ্য প্রয়াত জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলসহ বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচিত-সমালোচিত এক নাম। ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ১০ দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর গতকাল রোববার সকাল পৌনে ৮টার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। তার বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। ঘটনাবহুল জীবনের অধিকারী হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ছিলেন বাংলাদেশের দশম রাষ্ট্রপতি। ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর থেকে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে এরশাদ সফল ছিলেন বলে তার সমর্থকেরা দাবি করলেও তাকে সামরিক স্বৈরাচারী শাসক হিসেবেই দেখেন সমালোচকেরা। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। কুচবিহার ও রংপুরেই শেষ করেন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনা। ১৯৫০ সালে এরশাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ১৯৫২ সালে কমিশন লাভ করেন। ১৯৭১-১৯৭২ সালে তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদায় সপ্তম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৩ সালে পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরেন এরশাদ। সে সময় তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৭৫ সালের আগস্টে এরশাদকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে সেনাবাহিনীর উপপ্রধান করা হয়। ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে তিনি সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ পান এবং পরের বছর লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর রাজনৈতিক দৃশ্যপটে হাজির হন এরশাদ। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন তিনি। রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরপরই তিনি দেশের সংবিধান রহিত করার পাশাপাশি জাতীয় সংসদ বাতিল ও সামরিক আইন জারি করেন এবং সাত্তারের মন্ত্রিসভাকে বরখাস্ত করেন। একইসঙ্গে নিজেকে দেশের সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করেন তিনি। এরপর ১৯৮২ সালের ২৭ মার্চ বিচারপতি আবুল ফজল মোহাম্মদ আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে অধিষ্ঠিত করলেও মূল কর্তৃত্ব থাকে এরশাদের হাতেই। পরের বছরের ১১ ডিসেম্বর আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে সরিয়ে নিজেই বসেন রাষ্ট্রপতির আসনে। রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় ১৯৮৪ সালে এরশাদ দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় উপজেলা পদ্ধতির প্রচলন করেন। পরের বছরের মে মাসে উপজেলা পরিষদের প্রথম নির্বাচন হয়। এরপর ১৯৮৬ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এরশাদ তার জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে পাঁচ বছর মেয়াদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, যদিও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এই নির্বাচন বর্জন করে। এর আগে মে মাসে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টি সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিলেও বিএনপি বর্জন করে। পরে বিরোধী দলের প্রবল আন্দোলনের মুখে ১৯৮৭ সালের ৭ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি এরশাদ তৃতীয় জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। পরের বছরের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনও বর্জন করে প্রধান বিরোধী দলগুলো। এরশাদের বিরুদ্ধে চলতে থাকে আন্দোলন। এরই একপর্যায়ে প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগে বাধ্য হন এরশাদ। পদত্যাগের পর এরশাদ গ্রেফতার হন। কারাগারে থাকা অবস্থায় ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে রংপুরের পাঁচটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন এরশাদ। তবে বিএনপি সরকারের আমলে দায়ের করা কয়েকটি দুর্নীতির মামলায় তার কারাদ- হয়। এরইমধ্যে ১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনেও রংপুরের পাঁচটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হন এরশাদ। ছয় বছর কারাগারে থাকার পর ১৯৯৭ সালের ৯ জানুয়ারি জামিনে মুক্তি পান তিনি। ২০০১ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টি জয় পায় ১৪টি আসনে। এরপর এরশাদ ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটে যোগ দিয়ে মহাজোট গঠন করেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার দল পায় ২৭টি আসন। ক্ষমতায় থাকাকালে থানা পর্যায়ে দেশব্যাপী উপজেলা স্থানীয় সরকার পদ্ধতি প্রবর্তনকে এরশাদের অন্যতম সাফল্য হিসেবে দেখেন তার সমর্থক ও অনুসারীরা। বিশেষত উপজেলা পরিষদ প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকার কারণে এরশাদের অনুসারীরা তাকে ‘পল্লীবন্ধু’ খেতাবে ভূষিত করে। তবে উপজেলা প্রবর্তন পদ্ধতি এরশাদের রাজনৈতিক অভিলাষ বাস্তবায়নের অংশ ছিল বলেই মনে করেন সমালোচকরা। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্পের বিরাষ্ট্রীয়করণ এবং দেশে ব্যক্তিখাতের বিকাশে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। কেন্দ্রীয় ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের উদ্দেশ্যে এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৮ এপ্রিল একটি প্রশাসনিক পুনর্গঠন ও সংস্কার কমিশন গঠন করেন, যার সুপারিশ অনুযায়ী জনপ্রশাসনকে নতুন করে সাজানো হয়। নিজের শাসনামলে এরশাদ দেশে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ভূমি সংস্কারেরও প্রয়াস চালান। তবে মূলত আমলাতন্ত্রের অদক্ষতা ও দুর্নীতির কারণে এটি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এরশাদ তার প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ছিলেন। বর্তমান জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্বে থাকা এরশাদ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আগের মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূত ছিলেন।

Please follow and like us:
2