রবি. এপ্রি ২১, ২০১৯

উৎসব উদযাপনের পরিধি বেড়েছে, পরিবর্তনও হয়েছে

উৎসব উদযাপনের পরিধি বেড়েছে, পরিবর্তনও হয়েছে

Last Updated on

হাসান আজিজুল হক : বর্ধমান জেলার যবগ্রামে আমার জন্ম, ওখানেই বেড়ে ওঠা। আমার ছেলেবেলার বৈশাখের স্মৃতি তো অনেক। আর সেসব স্মৃতি বলতে আমার কাছে শুধুই গ্রামের স্মৃতি। এখনও সেসব মনে পড়ে। আমাদের গ্রামে মুসলিম পরিবার ছিল সব মিলিয়ে দশ থেকে বারোটি। বাকি সবই হিন্দু পরিবার। পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে আমাদের গ্রামে খুব একটা উৎসব হতো এমন নয়। বৈশাখের জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকার মতো অবস্থা আমাদের ছেলেবেলায় ছিল নাÑ সেটা আমি এখন দেখতে পাচ্ছি। আমাদের বেলায় যা হতো, একত্রিশে চৈত্র এবং পয়লা বৈশাখে আমাদের পাশের গ্রামে এক দেবীর পীঠস্থান ছিল। আমরা বলতাম যুগান্ত দেবীর (দুর্গারই আরেক রূপ) পীঠস্থান। সেই পীঠস্থানে মাসব্যাপী মেলা হতো। আমরা সাধারণত বৈশাখের প্রথম দিন ওই মেলায় যেতাম। সেদিন ভিড় বেশি; জাঁকজমক বেশি হতো। কাজেই আমরা নিজেদের গ্রাম পাড়ি দিয়ে ওই গ্রামের মেলায় চলে যেতাম। মেলায় যাওয়া মানে সেখানে গিয়ে টকি দেখা হবে। টকি মানে সিনেমা দেখা। তারপর সার্কাস দেখা হবে। জাদু দেখা হবে। সেজন্য আমরা দুপুর থেকে উন্মুখ হয়ে থাকতাম।

অল্প বয়সী কিশোর বা ছেলেরা একসঙ্গে বের হতাম। আর আমাদের গ্রামে এক একটা শূন্য ও বিরাট মাঠ ছিল সেখানে দৌড়ে বেড়াতাম। কখনো বাড়ির বড়দের সঙ্গে মুদি দোকানে চলে যেতাম হালখাতা খেতে। বড়দের কাছে পয়লা বৈশাখ মানে ছিল হালখাতা। গ্রামের মুদি দোকানসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ধারে সব কিছু কেনা হতো। ব্যবসায়ীরা সারা বছরের যে পাওনা সেই টাকা তোলার জন্য হালখাতা করতো। ওই দিনকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীদের একটা প্রস্তুতি থাকতো, আবার যারা ধারে ক্রয় করতো তাদেরও একটা প্রস্তুতি থাকতো। আর একটা কথা, পয়লা বৈশাখে বর্ধমানের মহারাজার মন্ত্রী হাতি নিয়ে আসতেন। ওই হাতিটা বর্ধমান থেকে হেঁটে ওই হীরক গ্রামে এসে হাজির হতো। ওই দিন আমরা দলবেঁধে হাতি দেখতে যেতাম। একটা, দুটো পয়সা মাটিতে রাখতাম, হাতিটা শুঁড় দিয়ে আশ্চর্য কৌশলে সেই পয়সা মাটি থেকে তুলে নিত।

একটা কথা আজও খুব মনে পড়ে। আমাদের গ্রাম থেকে এক মাইল দূরে ছিল হীরক গ্রাম। সেই গ্রামে মহারাজার কাটা দিঘি ছিল। বিশাল দিঘি; দেড় মাইলের মতো লম্বা আর এক মাইলের মতো চওড়া। তাতে প্রচুর পরিমাণে শ্যাওলা ভাসত। দিঘির এক কোণে ছিল কালচে চকচকে, টলটলে জল। সেখানে পদ্মফুল ফুটতো। সেই দৃশ্য বিশেষভাবে মনে পড়ে এবং পয়লা বৈশাখে আমরা যখন মেলায় যেতাম, ফেরার সময় ওই দিঘিতে নামতাম। যেমন করেই হোক একটা, দুটো পদ্ম নিয়ে বাড়ি ফিরতাম। কোনোবারই পদ্ম নিয়ে আসতে ভুল হতো না। পদ্ম গন্ধ নাকে লেগে থাকতো। ঘুরেফিরে বিস্ময় দৃষ্টিতে সেই ফুল দেখাই ছিল একটা কাজ। সব মিলিয়ে পয়লা বৈশাখে মেলায় যাওয়াটা একটা বড় ব্যাপার। বৈশাখী মেলার সব স্মৃতি এখন আর মণিকোঠায় সযতেœ নেই।

আমি এই যে কথাগুলো বলছি, এগুলো এখনও হয়তো হয়। সত্যি বলতে হতে হবে বলে এখন অনেক কিছুই হচ্ছে কিন্তু তার মধ্যে হৃদয় নেই, সবুজ নেই। গ্রামগুলোই কি আর গ্রাম আছে? গ্রামগুলো মরে গেছে। চেহারায়, আদলে, মানুষের আচরণে, মানবিক সম্পর্কে গ্রাম এখন মৃত। কোথাও কোথাও মুমূর্ষু। গ্রাম দরিদ্র হয়েছে নাকি ধনী হয়েছে সেটা বড় কথা নয়, আমার তো মনে হয় মানুষ আরো দরিদ্র হয়েছে। কারণ আমাদের ওই এলাকায় মানুষের আরও অন্যান্য অভাব ছিল। কিন্তু চাল, ডালের অভাব ছিল না। প্রত্যেকটা পরিবারকে মনে হতো স্থায়ী, মনে হতো সুন্দর। এখন গ্রামের ঘর মরেছে, সংস্কৃতি মরেছে যা শহর থেকে যায় তাই গ্রামে হয়।

শুধু কি তাই! বৈশাখে স্কুলের সামনে পাপড় ভাজা, চিনির নানা রকম মন্ডা, কদমা তৈরি করা এগুলো তো ফুরিয়ে গেছে। মানুষ এখন মিষ্টিও আগের মতো খায় না। এখন আর হারমোনিয়াম নিয়ে গান গাইতে গাইতে কাউকে গাঁ পাড়ি দিতে দেখা যায় না। গায়েনের পেছনে পেছনে ছেলেমেয়ের দল ছুটে বেড়ায় না। তাই আমাদের দেখা পয়লা বৈশাখ, আর সেই সব চরিত্রের সঙ্গে এখনকার কিছু মিলবে না।
বৈশাখ উৎসব উদযাপনের পরিধি বেড়েছে, পরিবর্তনও হয়েছে। একবারেই পাল্টে গেছে। হালখাতার সেই সৌন্দর্যের বালাই নেই। গ্রামের চেয়ে এই উৎসব বেশি ছড়িয়ে গেছে শহরে। এখন যখন পয়লা বৈশাখে রাজশাহী শহরে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই, দেখি বেশ জমজমাটভাবে পালিত হচ্ছে দিনটি। ওই দিনটিতে গ্রামেও বের হয়ে দেখেছি, কই কোথাও তো আত্মার স্পন্দন মেলে না। এখন সব কিছুতেই তাড়া। এই উৎসবে যখন প্রাণ থাকবে তখন এটি সর্বজনীন হতে পারে। প্রাণের সঞ্চার থাকতে হবে। প্রাণ নেই, সবই শুকনো। সবুজ নেই, পাতাগুলো মৃতপ্রায় চোখের সামনে ঝরে পড়ছে। পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে আতঙ্ক। কাকে দায়ী করবোÑ সরকারকে, দেশের আইনশৃঙ্খলাকে, মানুষের আচরণকে? সমাজ-সংগঠন, রাষ্ট্র সংগঠন, বিশ্ব সংগঠনগুলোর এ থেকে পরিত্রাণ চাইতে হবে। না হলে এই আতঙ্ক, এই রক্ত ঝরা থামবে না।
লেখক : কথাসাহিত্যিক

Please follow and like us:
0