বৃহঃ. সেপ্টে ১৯, ২০১৯

উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে শিশু ও নারী নির্যাতন

উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে শিশু ও নারী নির্যাতন

Last Updated on

বিশেষ প্রতিনিধি : সম্প্রতি দেশে উদ্বেগজনক হারে বেড়ে গেছে শিশু ও নারী নির্যাতন। চলতি বছর নারী নির্যাতনের যে বিষয়টি সবচেয়ে আলোচিত হয়েছিল, সেটি হল ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা। মার্চের ২৭ তারিখে ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে এক মামলা করেছিল নিহত নুসরাতের পরিবার। সেদিনই অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এই ঘটনারই জের ধরে ৬ই এপ্রিল মাদ্রাসার ভেতরের পরীক্ষার হল থেকে ডেকে ছাদে নিয়ে গিয়ে নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয় কয়েকজন। শরীরের শতকরা ৮০ ভাগ পোড়া অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসার পর গত ১০ই এপ্রিল মৃত্যু হয় মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহানের। এরআগে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ জানাতে নুসরাত সোনাগাজী থানায় গেলে থানার তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন সে সময় নুসরাতকে আপত্তিকর প্রশ্ন করে বিব্রত করেন এবং তা ভিডিও করে ছড়িয়ে দেন। ওই ঘটনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হলে পরে অনেক নাটকীয়তার পর ওসি মোয়জ্জেমকে গ্রেফতার করা হয়। নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যায় ১৬ জনের বিরুদ্ধে এবং ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে মামলাগুলো বিচারাধীন রয়েছে।
এর আগে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের দিন রাতে নোয়াখালীর সুবর্ণচরের মধ্যবাগ্যা গ্রামের চল্লিশোর্ধ্ব এক নারী নিজের বাড়িতে ধর্ষণের শিকার হন বলে অভিযোগ ওঠে। জানা গেছে, ভোটের সময় নৌকার সমর্থকদের সঙ্গে তার কথাকাটাকাটি হয়। এরপর রাতে সুবর্ণচর উপজেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা সমর্থকসহ বাড়িতে গিয়ে স্বামী-সন্তানকে বেঁধে তাকে ধর্ষণ করে। এরপর চলতি বছরের ১ মার্চ নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার মোহাম্মদপুর উপজেলার চর মাকসুমুল গ্রামে একইরকম একটি ঘটনা ঘটে। সেখানেও ভোটের জেরে এক গৃহবধূকে পালাক্রমে ধর্ষণ করা হয়। পরদিন সেই গৃহবধূ বিষপানে আত্মহত্যা করেন। এ ঘটনাতেও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে।
এদিকে, ধর্ষণের অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধেও। গত ২ আগস্ট যশোর থেকে ট্রেনে খুলনায় আসার পথে তিন সন্তানের মা এক নারীকে (৩০) আটক করে খুলনা জিআরপি থানা পুলিশ। তার পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, মোবাইল চুরির অভিযোগ দিয়ে ওই নারীকে আটক করা হয়। পরে রাতে থানার হাজতে ওসিসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য তাকে মারধর ও ধর্ষণ করে। পর দিন তাকে ৫ বোতল ফেনসিডিলসহ গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর গত ২৬ আগস্ট যশোরের শার্শা উপজেলার গোড়পাড়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই খায়রুলসহ সোর্সের বিরুদ্ধে আসামির স্ত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে।
এদিকে, গত ০৬ জুলাই রাজধানীর ওয়ারীর একটি বাসা থেকে সামিয়া আক্তার সায়মাকে নামে ৭ বছর বয়সী এক শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয় যাকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। সেদিন মাগরিবের নামাজের সময় শিশুটি নিখোঁজ হয়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর নির্মাণাধীন ভবনের অষ্টম তলার একটি কক্ষ থেকে মেয়েটির লাশ উদ্ধার করা হয়। শুধু নারী ও মেয়ে শিশুরাই নয়, ধর্ষণের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না ছেলে শিশুরাও। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ছয়ানি বাজারে সাত বছরের শিশু এমরান হোসেনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। গত ২২ আগস্ট রাতে এমরানকে ধরে নিয়ে পরিত্যক্ত একচালা টিনের ঘরে নিয়ে চারজন মিলে ধর্ষণ করে। একপর্যায়ে শিশুটির মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে থাকলে তার গলায় রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এরপর তার মরদেহ মাছের ঝুড়িতে পলিথিন মোড়ানো অবস্থায় ভরে ওই ঘরে লুকিয়ে রাখে। ২৫ আগস্ট রাতে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
এদিকে, ১৪টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে তথ্য সংরক্ষণ করে তৈরি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, চলতি বছরের আগস্ট মাসে সারা দেশে ১৬৯টি ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২৩ জনকে গণধর্ষণ, পাঁচজনকে ধর্ষণের পর হত্যা এবং ২৭ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে। এ ছাড়া শ্লীলতাহানি করা হয়েছে সাতজনকে এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১৮ জন। সূত্রমতে, আগস্টে চারজন অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে একজন দগ্ধ হয়ে মারা গেছে। এ মাসে ৯ নারী ও শিশুকে অপহরণ এবং ৪১ নারী ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের শিকার হয়েছে আট নারী, যার মধ্যে পাঁচজনকেই হত্যা করা হয়। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১৬ নারী ও শিশু। উত্ত্যক্ত করার ঘটনা আলোচিত ছিল ১১টি। আত্মহত্যা করেছে ৩০ জন। এর মধ্যে পাঁচজনকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার তথ্য পাওয়া গেছে এবং ১৭টি মৃত্যুর ঘটনাই রহস্যজনক।
এদিকে, ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’র সূত্রমতে, পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ২০১৮ সালে ধর্ষণের শিকার হওয়ার মোট ৩৪৫টি সংবাদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা ৩৫৬, যার মধ্যে মারা গেছে ২২ জন এবং আহত হয়েছে ৩৩৪ জন। প্রকাশিত খবরগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে শিশুরা প্রতিবেশী, উত্যক্তকারী, বন্ধু, আত্মীয়স্বজন বা অপরিচিত ব্যক্তির দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে উত্যক্তকারী দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১১০ জন আর প্রতিবেশী দ্বারা ১০২ জন। গণধর্ষণের শিকার ৩৭ জন, শিক্ষক দ্বারা সতের জন। এছাড়া গত বছর ৫৩টি শিশু ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে যাদের প্রত্যেকেই আহত হয়েছে। অন্যদিকে, চলতি বছর বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, নারী নির্যাতনের এই ধারা আশংকাজনকভাবে অব্যহত রয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, সামাজিক অবক্ষয়ের কারণেই বাড়ছে নারী ও শিশু হত্যা। তাদের মতে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় নারী এবং শিশু নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে। প্রতিদিন সারাদেশে অহরহই ঘটছে নারী ও শিশু নির্যাতনের এমন ঘটনা।
বিশ্লেষক ও নারী-শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের নারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়েছেন, তা যেমন সত্য; তেমনি নির্যাতন পিছু ছাড়ছে না- তাও সত্য। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব, ডিজিটাল সংস্কৃতি, আইনের কঠোর প্রয়োগ না হওয়া, ধনতান্ত্রিক সমাজের অস্থিরতাসহ বিভিন্ন কারণে নির্যাতন বাড়ছে। পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধে ‘আমরাই পারি’ জোটের চেয়ারপারসন সুলতানা কামালও মনে করেন, নারী নির্যাতনের মূল কারণ সমাজ ও পরিবারে নারীর অধস্তন অবস্থা। অনেক মৌলিক মানবাধিকারের প্রশ্নেও নারীরা পুরুষতান্ত্রিকতার সঙ্গে আপস করছেন। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ) আইনসহ সরকার বিভিন্ন উদ্যোগও নিয়েছে। তবে আইন ও অন্যান্য উদ্যোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে যা যা করা দরকার, তা সেভাবে হচ্ছে না।

 

Please follow and like us:
2