মঙ্গল. অক্টো ১৫, ২০১৯

আবরার হত্যার প্রতিবাদ চলছে

আবরার হত্যার প্রতিবাদ চলছে

Last Updated on

প্রত্যাশা ডেস্ক : আবরার ফাহাদ হত্যাকা-ের প্রতিবাদে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। গতকাল বুধবার সকাল থেকে বুয়েটের শহীদ মিনার চত্বরে শিক্ষার্থীরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। সেখানে এক সংবাদ সম্মেলন থেকে তুলে ধরা হয় নতুন ১০ দফা দাবি। ১১ অক্টোবরের মধ্যে শেরে বাংলা হলের প্রভোস্টকে প্রত্যাহার, আবরারের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, জড়িতদের বুয়েট থেকে আজীবন বহিষ্কারের পুরনো দাবির সঙ্গে অবিলম্বে আবরার হত্যা মামলার চার্জশিট প্রকাশ এবং ১৫ অক্টোবরের মধ্যে বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করার দাবি জানাচ্ছে তারা। সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে তিন জন এসব দাবি সাংবাদিকদের সামনে পড়ে শোনান। তাদের একজন প্রতিনিধি বলেন, বেঁধে দেওয়া সময়ে দাবি পূরণ না করা হলে ১৪ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষাসহ সব অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম স্থগিত রাখতে হবে। ১০ দফার মধ্যে রয়েছে, আবরার ফাহাদের খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সিসিটিভি ফুটেজ ও জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুসারে শনাক্ত খুনিদের প্রত্যেকের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সিসিটিভি ফুটেজ থেকে জড়িতদের শনাক্ত করে শুক্রবার বিকাল ৫টার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজীবন বহিষ্কার করতে হবে। মামলার সব খরচ এবং আবরারের পরিবারের ক্ষতিপূরণ বুয়েট প্রশাসনকে বহন করতে হবে। শুক্রবার বিকাল ৫টার মধ্যে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নোটিস জারি করতে হবে।
দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে স্বল্পতম সময়ে আবরার হত্যা মামলার নিষ্পত্তি করার জন্য বুয়েট প্রশাসনকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। বুয়েট প্রশাসনকে সক্রিয় থেকে সমস্ত প্রক্রিয়া নিয়ামত পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং নিয়মিত ছাত্রদের তথ্য দিতে হবে।
আবরার হত্যা মামলার অভিযোগপত্রের কপি অবিলম্বে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করতে হবে। বুয়েটে ‘সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি’ নিষিদ্ধ করতে হবে। রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে দীর্ঘদিন ধরে বুয়েটে হলে হলে ‘ত্রাসের রাজনীতি’ কায়েম করে রাখা হয়েছে। জুনিয়র ব্যাচকে সবসময় ভয়ভীতি দেখিয়ে জোর করে রাজনৈতিক মিছিল মিটিংয়ে যুক্ত করা হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে যে কোনো সময় যে কোনো হল থেকে সাধারণ ছাত্রদের হল থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে হলে হলে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। রাজনৈতিক সংগঠনের এহেন কর্মকা-ে সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা ক্ষুব্ধ। তাই ১৫ অক্টোবরের মধ্যে বুয়েটে সকল রাজনৈতিক সংগঠন এবং এর কার্যক্রম স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কেন ৩০ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পরও ঘটনাস্থলে যাননি এবং ৩৮ ঘণ্টা পরে উপস্থিত হয়ে কেন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিরূপ আচরণ করেছেন, কোন তিনি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে স্থান ত্যাগ করেছেন, তাকে ক্যাম্পাসে এসে গতকাল বুধবার দুপুর ২টার মধ্যে জবাবদিহি করতে হবে।
আবাসিক হলগুলোতে র‌্যাগের নামে এবং ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর সকল প্রকার শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন বন্ধ করতে হবে এবং এ ধরনের সন্ত্রাসে জড়িত সকলের ছাত্রত্ব প্রশাসনকে বাতিল করতে হবে। একই সাথে আহসানউল্লাহ হল এবং সোহরাওয়ার্দী হলের পূর্বের ঘটনাগুলোতে জড়িত সকলের ছাত্রত্ব বাতিল করতে হবে ১১ অক্টোবর বিকাল ৫টার মধ্যে। আগে ঘটা এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ এবং পরবর্তীতে তথ্য প্রকাশের জন্য একটি কমন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কোনো ওয়েবসাইট বা ফর্ম থাকতে হবে এবং নিয়মিত প্রকাশিত ঘটনা রিভিউ করে দ্রুততম সময়ে বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বুয়েটের বিআইআইএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে হবে। ১১ অক্টোবর বিকাল ৫টার মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রদর্শন করতে হবে এবং পরবর্তী ১ মাসের মধ্যে কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু করতে হবে। নিরাপত্তার স্বার্থে সবগুলো হলের প্রত্যেক ফ্লোরের সবগুলা উইংয়ের দুই পাশে সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে আবাসিক হল থেকে ছাৎ। উৎখাতের ব্যাপারে নীরব থাকা এবং ছাত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হওয়ায় শেরে বাংলা হলের প্রভাস্টকে ১১ অক্টোবর বিকাল ৫টার মধ্যে প্রত্যাহার করতে হবে।
আরও তিন আসামি ৫ দিনের রিমান্ডে : বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় গ্রেফতার হওয়া আরও তিন আসামির ৫ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. তোফাজ্জল হোসেন এ আদেশ দেন। আবরার ফাহাদ হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে এ তিনজনকে গত মঙ্গলবার গ্রেফতার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। তারা হলেন- মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র শামসুল আরেফিন রাফাত (২১), ওয়াটার রিসোর্সেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মো. মনিরুজ্জামান মনির (২১) ও একই ব্যাচের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র মো. আকাশ হোসেন (২১)। গত মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে তিনটায় রাজধানীর ঝিগাতলা এলাকা থেকে রাফাতকে, ডেমরা থেকে মনিরকে ও গাজীপুরের বাইপাল থেকে আকাশকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। এ মামলায় গত মঙ্গলবার ১০ ছাত্রলীগ নেতার ৫ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। তারা হলেন- বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদি হাসান রাসেল, সহ-সভাপতি মুহতামিম ফুয়াদ, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার, উপ-সমাজকল্যাণ সম্পাদক ইফতি মোশারফ সকাল, ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিওন, গ্রন্থনা ও গবেষণা সম্পাদক ইশতিয়াক মুন্না, মুনতাসির আল জেমি, খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভীর, মুজাহিদুর রহমান ও মেহেদী হাসান রবিন। একইসঙ্গে আদালত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ১৩ নভেম্বর দিন ধার্য করেছেন। গতকাল বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সাদবীর ইয়াছির আহসান চৌধুরী এ নির্দেশ দেন। আদালতের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা (জিআরও) নিজাম উদ্দিন এ বিষয়ে নিশ্চিত করেছেন। নথি থেকে জানা যায়, গত ৭ অক্টোবর আবরার নিহতের ঘটনায় তার বাবা বরকতুল্লাহ বাদী হয়ে রাজধানীর চকবাজার থানায় মামলা করেন। মামলায় ১৯ জনের নাম উল্লেখ করা হলেও আরো অজ্ঞাত কয়েকজনকেও আসামি করা হয়।
‘আমার ছেলেকে যেভাবে মারেচে, প্রধানমন্ত্রী যদি সেটা দেখতেন’ : বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদের বাবা বরকত উল¬াহ প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করেছেন, তার সন্তানকে কীভাবে মেরে ফেলা হয়েছে, তিনি যেন তা দেখেন। গতকাল বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টায় কুষ্টিয়া জিলা স্কুলে গণমাধ্যমের কাছে তিনি এই অনুরোধের কথা তুলে ধরেন।
আবরারের বাবা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর পিতা-মাতাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। উনি তো এই জ্বালা জানেন। আমার সন্তানকেও নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। সন্তানকে যেভাবে মারেচে দেখলিপারে, উনি (প্রধানমন্ত্রী) যদি নিজে দেখেন তাহলে উনি নিজেই বিচার করবেন।’
সকালে জিলা স্কুলে আবরারের রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া মাহফিল শেষে তিনি এ মন্তব্য করেন। জিলা স্কুলের ২০১৫ সালের এসএসসি ব্যাচের ছাত্র ছিলেন আবরার। তার সহপাঠী ও জিলা স্কুল কর্তৃপক্ষের আয়োজনে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। মামলার অগ্রগতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যতটুকু দেখছি, তাতে আমি খুশি। আরও চাই, যাতে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত হয়।’
তবে বুয়েট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখনো পর্যন্ত তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি বলে গণমাধ্যমের কাছে অভিযোগ করেন বরকত উল্লাহ্। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘অমিত সাহা নামে একজনের কক্ষে আমার ছেলেকে নির্যাতন করা হয়েছে। তার নামটা এজাহারে আসে নাই। গতকাল (মঙ্গলবার) মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ হয়েছে, তাকে বলেছি অমিত সাহাকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। উনি (তদন্ত কর্মকর্তা) বলেছেন, তদন্ত করে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’
কুষ্টিয়া স্কুল জামে মসজিদে দোয়া অনুষ্ঠানে কুষ্টিয়া সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান, জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক এফতে খাইরুল ইসলাম, শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
শেরে বাংলার প্রভোস্টের পদত্যাগ : বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকা-ের প্রতিবাদে উত্তাল আন্দোলনের মধ্যে শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে শেরেবাংলা হলের প্রভোস্টের পদ ছাড়লেন অধ্যাপক জাফর ইকবাল খান। গতকাল বুধবার বুয়েট শহীদ মিনার এলাকায় অবস্থান নিয়ে থাকা আন্দোলনকারীদের সামনে এসে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি একেএম মাসুদ শিক্ষার্থীদের এ কথা জানান। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতার জন্য শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের পদত্যাগ দাবি করেন শিক্ষক সমিতির সভাপতি।
আবরারের গ্রামবাসীর তোপের মুখে পালালেন বুয়েট ভিসি : বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালীর রায়ডাঙ্গা গ্রামে গিয়ে তোপের মুখে পড়েছেন বুয়েট উপাচার্য সাইফুল ইসলাম। স্থানীয় লোকজনের প্রতিরোধের মুখে ভিসি পালিয়ে এসেছেন। গতকাল বুধবার বিকেল ৫টার দিকে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসকের গাড়িতে ওই এলাকা ত্যাগ করেন তিনি।
এর আগে বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে কুমারখালী উপজেলায় রায়ডাঙ্গা গ্রামে যান উপাচার্য। পরে তিনি আবরারের কবর জিয়ারত করেন। তবে তার বাড়িতে ঢুকতে পারেননি উপাচার্য। এর আগে উপাচার্য আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ ও ভাই আবরার ফায়াজসহ সবাই মিলে কবর জিয়ারত করেন। পরে আবরারের ভাই ও বাবার প্রশ্নবানে জর্জরিত হন উপাচার্য। তাদের জিজ্ঞাসা ছিল, উপাচার্য কেন ওই হত্যাকা-ের পরপর সেখানে উপস্থিত হননি। এখন কেন এসেছেন?
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিকেল ৫টার দিকে আবরারের মা রোকেয়া খাতুনের সঙ্গে দেখা করার জন্য রওনা দেন উপাচার্য। একই সড়কের পাশে আবরারের কবর ও পৈতৃক ভিটা। কুমারখালী থেকে যেতে প্রথমে কবরস্থান পড়ে। পরে আধা কিলোমিটারের মাথায় ওই বাড়ি। কিন্তু উপাচার্যের যাওয়ার কথা শুনে স্থানীয় শত শত নারী-পুরুষ আবরারদের গ্রামের বাড়ির সামনের সড়কে বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপাচার্যকে ঘিরে ধরেন। এ পরিস্থিতিতে আবরারের মায়ের সঙ্গে দেখা না করে উপাচার্য পুলিশ প্রহরায় জেলা প্রশাসকের গাড়িতে রায়ডাঙ্গা গ্রাম ছাড়েন। স্থানীয়রা জানান, আবরারের বাড়িতে ঢোকার আগে উপাচার্যকে বাধা দেয় স্থানীয় গ্রামবাসী। আবরারের বাড়ি ঢোকার মুখে ভিসির গাড়ির সামনে শুয়ে পড়েন নারীরা। পরে পুলিশ লাঠিচার্জ করলে এক নারী ও আবরারের ছোট ভাই আবরার ফায়াজসহ পাঁচজন আহত হন। তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশের সঙ্গে গ্রামবাসীর সংঘর্ষ শুরু হয়। এরপর বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম গাড়ি ঘুরিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। এর আগে বুধবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে কুষ্টিয়া সার্কিট হাউসে পৌঁছান বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম। সেখান থেকে কুমারখালী উপজেলায় রায়ডাঙ্গা গ্রামে যান তিনি। রায়ডাঙ্গা গ্রামে গিয়ে আবরারের কবর জিয়ারত ও তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল ভিসির। এ খবরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল পরিমাণ সদস্য মোতায়েন করা হয়। আবরারের বাড়ির পাশে ও কবরের আশপাশের এলাকায় অসংখ্য র‌্যাব ও পুলিশ অবস্থান নেয়। গত রোববার রাতে বুয়েটের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদকে ডেকে নিয়ে যায় ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী। এরপর তাকে শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
পুলিশের লাঠিচার্জে আবরারের ছোট ভাই আহত : বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের ছোট ভাই আবরার ফায়াজকে মারধর করেছে পুলিশ। গতকাল বুধবার কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় রায়ডাঙ্গা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এর আগে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় রায়ডাঙ্গা গ্রামে যান বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম। সেখানে ভিসিকে বাধা দেয় গ্রামবাসী। পরে এলাকাবাসীর সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। এ সময় আবরারের ছোট ভাই ফায়াজ, তার ফুপাতো ভাইয়ের স্ত্রী ও আরও একজন নারী আহত হন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বুয়েট ভিসি আবরারের কবর জিয়ারত করতে পেরেছেন। তবে আবরারের বাড়িতে ঢুকতে পারেননি। আবরারের ভাই ও বাবার প্রশ্নবানে জর্জরিত হন উপাচার্য। তাদের জিজ্ঞাসা ছিল, উপাচার্য কেন ওই হত্যাকা-ের পরপর সেখানে উপস্থিত হননি। এখন কেন এসেছেন? এ অবস্থায় আবরারের বাড়িতে ঢোকার সময় উপাচার্যকে বাধা দেয় গ্রামবাসী। আবরারের বাড়ি ঢোকার মুখে ভিসির গাড়ির সামনে শুয়ে পড়েন নারীরা। পরে পুলিশ লাঠিচার্জ করলে আবরারের ছোট ভাই আবরার ফায়াজসহ পাঁচজন আহত হন। রায়ডাঙ্গা গ্রামে গিয়ে আবরারের কবর জিয়ারত ও তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল ভিসির। এ খবরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুল পরিমাণ সদস্য মোতায়েন করা হয়। আবরারের বাড়ির পাশে ও কবরের আশপাশ এলাকায় অসংখ্য র‌্যাব ও পুলিশ অবস্থান নেয়।
ভিডিও ফুটেজে উপস্থিতির ব্যাখ্যা দিলেন ছাত্রকল্যাণ পরিচালক : মুমূর্ষু আবরারের কাছেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমান। আবরারের পাশে তিনি কী করছিলেন, জানতে চাইলে সে সময়ের পুরো পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দেন তিনি।
গতকাল বুধবার দুপুরে বুয়েটের শহীদ মিনারের পাশের রাস্তায় বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের মাঝে উপস্থিত হন বুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি এ কে এম মাসুদ। এ সময় মিজানুর রহমানও শিক্ষক সমিতির সঙ্গে এক হন। তিনি এসেই শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন। তাকে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করা হলে তিনি তার ব্যাখ্যা দেন।
সেদিন রাতে কী ঘটেছিল মিজানুর রহমানের কাছে জানতে চান শিক্ষার্থীরা। ওই ভিডিও ফুটেজে তার উপস্থিতির কারণও জানতে চান আন্দোলনকারীরা। মিজানুর রহমান বলেন, রোববার রাত পৌনে ৩টার দিকে শেরেবাংলা হলের প্রাধ্যক্ষ এবং সহকারী প্রাধ্যক্ষ তার বাসায় যান। তারা এসে দরজা ধাক্কা দেন। দরজা খোলার পর তিনি দেখেন, দুজন সিঁড়ির ওপর বসে আছে।
ছাত্রকল্যাণ পরিচালক তাদের জিজ্ঞেস করেন, কী অবস্থা? উত্তরে সহকারী প্রাধ্যক্ষ জানান, হলে একটি মার্ডার (হত্যা) হয়েছে। মিজানুর রহমান বলেন, তখন তার পোশাক বাইরে বের হওয়ার উপযোগী না থাকায়, কাপড় বদলে আসার জন্য ভেতরে যান। এরপর প্রাধ্যক্ষ এবং সহকারী প্রাধ্যক্ষকে নিয়ে তিনি শেরেবাংলা হলে যান।
ছাত্রদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘যাদের ছবি তোমরা দেখাচ্ছ, তারা সবাই ওখানে ছিল। তাদের সঙ্গে আমিও ছিলাম। সাদা পাঞ্জাবি পরা লোকটি ডাক্তার। তোমরা যদি এ ছবির ব্যাখ্যা চাও, তাহলে বলছি। ডাক্তার আবরারের নাকে, বুকে হাত দিয়ে বলেন, ছেলেটা অনেকক্ষণ আগে মারা গেছে। এ সময় যারা উপস্থিত ছিল, তারা ডাক্তারকে চাপ দেয়, লাশ যেন এখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ডাক্তার জানিয়ে দেন, তার একার পক্ষে ডেডবডি (লাশ) নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।’
এ সময় উপস্থিত ছাত্ররা চিৎকার করে জানতে চান, কারা ডাক্তারকে লাশ সরিয়ে নেয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিল। মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমার কোনো দুর্বলতা থাকলে তো এখানে আসতাম না, আমি ব্যাখ্যা দিচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘ডাক্তার যখন বললেন আবরার মারা গেছে, তখন ছেলেরা আমাদের লাশ সরিয়ে নেয়ার জন্য প্রেশার দিচ্ছিল। আমি বললাম, এটা পুলিশ কেস, আমি লাশ সরাতে পারব না। এদের মধ্যে আমি শুধু রাসেলকে চিনি। ও চাপ দিচ্ছিল। বাকিরা কোনো কথা বলছিল না। আমি ভিসিকে ফোন করি। অনেক রাত হলেও তিনি ফোন ধরেন। তাকে বললাম, এই অবস্থা। উনি বললেন, পুলিশকে ফোন কর। পুলিশ যেভাবে বলবে, সেভাবে কাজ করতে হবে।’
ভিসির সঙ্গে কথা বলে মিজানুর রহমান উপস্থিত ছাত্রদের জানিয়ে দেন, এটা যেহেতু মার্ডার কেস, লাশ তিনি সরাতে পারবেন না। এরপর প্রধান সিকিউরিটি গার্ড আসেন। চকবাজার থানায় খবর দেয়া হয়। সেখান থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে আসেন। পুলিশের সঙ্গে একজন ডাক্তার ছিলেন। তারা লাশের সুরতহালের কাজ শুরু করেন।
মিজানুর রহমান বলেন, ‘আবরারের ট্রাউজারের একটা অংশ যখন ওঠানো হয়, তখনই বুঝতে পারি আবরারের গায়ে মারের দাগ আছে। সেই ছবি তোমরা দেখেছ। ছবিতে মারের দাগ স্পষ্ট ছিল। ডাক্তার তখন বলেন, শরীরের ওপরের অংশেও দাগ থাকতে পারে। কিন্তু ওই জায়গায় তা পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। কাজেই লাশটা তখন হলের ক্যান্টিনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পরীক্ষা করে দেখা হয়। সুরতহাল যারা তৈরি করছিলেন, তারা তখন লাশের ছবি নেন।’
তিনি বলেন, ‘সুরতহাল কমপ্লিট করার জন্য লাশের বিস্তারিত তথ্যের দরকার ছিল। বাবার নাম, বাড়ি কোথায় এসব লাগত। ওদের মধ্যেই কেউ একজন আবরারের ফোন এনে দেয়। আমি জানি না, ওরা কারা। সিকিউরিটি গার্ড আবরারের কললিস্ট থেকে বাবা-বা মার নাম দেখে ফোন করে। তখন তাদের নাম, বাড়ির ঠিকানা পাওয়া যায়। সুরতহাল তৈরি করার সময় হলের প্রাধ্যক্ষ, সহকারী প্রাধ্যক্ষ, ডাক্তারের সঙ্গে আমিও ছিলাম। আমাদের সামনে রেখে লাশের ছবি তোলা হয়। আমাদের সবার স্বাক্ষর নেয়া হয়। তখনো হয়তো পুলিশের কাজ শেষ হয়নি। কখন লাশ নিতে পারবে সে ব্যাপারে ওপর থেকে নির্দেশনা চাচ্ছিল তারা। কিছুক্ষণ পর পুলিশের গাড়িতে আরেকজন সিনিয়র কর্মকর্তা আসেন। পুলিশের গাড়িতে লাশ তুলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়।
বুয়েটে শিক্ষক রাজনীতি নিষিদ্ধ : বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) শিক্ষকদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির জরুরি বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বুয়েট ক্যাম্পাসে আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সামনে এ তথ্য জানিয়েছেন শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. এ কে এম মাসুদ। শিক্ষার্থীদের তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা। শিক্ষার্থীদের রাজনীতিও শিগগিরই নিষিদ্ধ করা হবে।
মুখে কালো কাপড় বেঁধে ঢাবিতে ছাত্রদলের মৌন মিছিল : জাহাঙ্গীরনগর ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাধার মুখে পড়লেও বুয়েট ছাত্র আবরার হত্যার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তিপূর্ণভাবে মৌন মিছিল করেছে ছাত্রদল। মৌন মিছিলে অংশগ্রহণকারী ছাত্রদল নেতাকর্মীদের মুখে কালো কাপড় বাঁধা ছিল। আবরারের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ভারতের সঙ্গে ‘দেশবিরোধী’ চুক্তি বাতিল দাবিতে গতকাল বুধবার দুপুরে ডাকসুর সামনে থেকে একটি মিছিল বের করে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। পরে মিছিলটি ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে।
মিছিলে ছাত্রদলের সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন ও সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল,বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসির, ছাত্রনেতা আপেল মাহমুদসহ সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেয়।
আবরারের খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি চায় ছাত্রলীগও : বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করেছে ছাত্রলীগও। গতকাল বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলেন এই কথা জানান ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়। এ সময় শের-ই-বাংলা হল প্রশাসনের গাফিলতির তদন্তের দাবি জানান।
আবরার হত্যাকা-ের পরিপ্রেক্ষিতে সংগঠনের নেওয়া নানা পদক্ষেপের পাশাপাশি সংগঠনের দাবিও তুলে ধরেন সভাপতি জয়। ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বলেন, ‘আমরা দাবি জানাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই হত্যাকা-ের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য। আবরার হত্যা মামলাটি দ্রুত বিচার আইনের আওতায় এনে এবং হত্যাকা-ের সাথে জড়িত প্রত্যেকের যেন সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয় সে উপযোগী করে পুরো মামলাটি পরিচালনা করা হয়।’

Please follow and like us:
2