শুক্র. সেপ্টে ২০, ২০১৯

আবদুল মান্নান সৈয়দ : সাহিত্যের অভিজাত অভিযাত্রী

আবদুল মান্নান সৈয়দ : সাহিত্যের অভিজাত অভিযাত্রী

Last Updated on

ড. ফজলুল হক সৈকত : বাংলাদেশের একজন অগ্রগণ্য আধুনিক কবি, কথানির্মাতা, গবেষক ও সাহিত্য-সম্পাদক আবদুল মান্নান সৈয়দ (জন্ম : ৩ আগস্ট ১৯৪৩; মৃত্যু ৫ সেপ্টেম্বর ২০১০)। অর্ধশতাব্দীর অধিককাল ধরে শিল্প-সাহিত্যের চর্চায় নিমগ্ন ছিলেন তিনি; সাহিত্যের সৃজনশীল এবং মননশীলÑ এই দুই প্রবাহেই অবাধ-নিরলস অগণন প্রহর যাপন করেছেন। আবেগ আর প্রচেষ্টা ছিল কঠিনতম এই অভিযানে তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী। শিল্পের সুতোয় যেমন তিনি গেঁথেছেন জীবনের গল্প ও জাগতিক চিন্তা, তেমনি সাহিত্যের উদার দরোজায় দাঁড়িয়ে অনবরত অবলোকন করেছেন সমূহ সৌন্দর্য আর বহুবর্ণতার বৈচিত্র্য। ছোটকাজ-বড়োকাজ, কম গুরুত্বপূর্ণ-বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে তাঁর কাছে কিছু ছিল না; বরং এই সৈয়দের হাতে পড়ে অনেক সামান্য বিষয়ও অসামান্য হয়ে উঠেছে; লাভ করেছে অপরিহার্যতার মর্যাদা। সৃজনশীলতায় তিনি অন্বেষণ করেছেন মনোজগতের নিবিড় আলো-বাতাস; আর গবেষণাকর্মে ছিলেন স্থিতধী। বহুধা প্রসারিত পরিসর ও পথে তাঁর সমকালে আর কাউকে বিচরণ করতে দেখা যায়নি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি এক অবিশ্রান্ত ও অভিজাত অভিযাত্রী। আপাদমস্তক সাহিত্যব্রতী ও শিল্পনিমগ্ন এই মানুষটি পেশাগতভাবে শিক্ষকতায় নিয়োজিত থাকলেও ব্যক্তিগতভাবে ছিলেন নির্বিরোধী, মানবতাবাদী, সমাজচিন্তক।
চেতনানিমগ্ন এই শিল্পীর বাস্তবিক অর্থে কোনো প্রতিযোগী ছিল না; কাউকে অতিক্রম করতে হয়নিÑ তিনি যুদ্ধ করেছেন, প্রতিযোগিতায় নেমেছেন শুধু নিজের সঙ্গে। গত শতাব্দীর ষাটের দশকের এই লেখক মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে খুব দ্রুত নিজের জায়গাটি স্পষ্ট করে তুলতে সমর্থ হয়েছেন। কল্পনার প্রখরতা আর নান্দনিক বোধ তাঁকে সাধনার শিখর-স্তরে আরোহণে সর্বোতভাবে সহায়তা করেছে। গবেষণা ও সমালোচনা সাহিত্যে তিনি অনিবার্য ও অপরিহার্য হয়ে উঠেছেন সতর্ক ধাপে ধাপে; যেখানে তিনি সত্যিকারভাবেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী; বিশেষ করে নজরুল ও জীবনানন্দÑ এই দুই মহারথীর সাহিত্য-বিশ্লেষণে তাঁর মনোযোগ ও নিষ্ঠা আমাদের গবেষণাধারায় নবতর সংযোজন। সমকালীন বাংলা সাহিত্যের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষক হিসেবেও তিনি অবশ্য অনুকরণীয়। অগ্রজ-সহযাত্রী বা অনুজÑ এই তিনস্তরের সাহিত্য-পথিকদের কর্মপ্রবণতার নিরাবেগ পর্যবেক্ষণ ও সাহসী বিবেচনায় মান্নান সৈয়দ অভিজাত কলমসৈনিক। ব্যক্তিগত অনুভূতির চঞ্চল-স্বভাব তাঁকে স্থির থাকতে দেয়নিÍক্রমাগত তাড়িয়ে বেরিয়েছে দিক থেকে দিগন্তে, স্থান থেকে বিভূঁইয়ে। বিবরণে সতত আত্মপ্রতিফলন তাঁর বিবেচনাধর্মের সবচেয়ে দৃশ্যমান ধারা। আমিত্বের অহঙ্কারে অবগাহন করেও যে শিল্প-সাহিত্যের সত্য ও তত্ত্ব অনুসন্ধান করা চলে, তা মান্নান সৈয়দ আমাদের শিখিয়ে গেছেন। শিল্প ও শিল্পীর সাধনা বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞান থেকে কয়েকছত্র পাঠ নেওয়া যাক :

‘শিল্প! শিল্প!’ করতে করতে জীবন করেছি আমি পার।
আজ দেখি : অতলান্ত জীবনের সিংহ-আঁকা দ্বার
ছুঁতে না-ছুঁতেই কবে খসে গেছে বছর পঞ্চাশ।Ñ
হে সম্রাট! কতো লক্ষ তারকায় তোমার প্রকাশ,
অংশের যোগফল থেকে সমগ্র সে আরো বড়ো কতো,
Ñবুঝে আজÑ আমার সমস্ত দর্প ক্রন্দনে বিনত।
(পঞ্চাশ বছরে)

নিয়মিত দিনলিপি-রাতলিপি লিখতেন তিনি; অভিজ্ঞতা ও অর্জনের ভারে ক্লান্ত না হয়ে কাজের শান্তি ও সহজতাকে খুঁজে পেতে চেয়েছেন সবসময়। প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে শিল্পের বিষয় ও শৈলীকে মিলিয়ে দেখতে দেখতে কখন যে মহাসমুদ্রের গভীরে প্রবেশ করেছেন, হয়তো নিজেই টের পাননি! তথ্য আর তত্ত্বÑ এই উভয় নৌকার পাটাতনে পা রেখে খোলা দৃষ্টি প্রসারিত রেখেছেন দূর এবং অদূরের সব অনুভব ও অন-অনুভবের বিষয়াদিতে। জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ (প্রকাশকাল ১৯৬৭) হাতে নিয়ে এবং পাঠকের হাতে সমর্পণ করে শিল্পভুবনে যে অভিযাত্রা আরম্ভ করেছেন তিনি, সংবেদনশীলতার জলতরঙ্গ পার হয়ে, মৃত্যুপথযাত্রী হওয়ার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত জন্মের দায় আর দায়িত্বের ভার বহন করে গেছেন কারিগর ও শ্রমিকের কাতারে দাঁড়িয়ে। নীরবতার গভীরতা কিংবা প্রাজ্ঞতার প্রবলতা তিনি অতিক্রম করেছেন পরম অবহেলায়Ñ নির্মোহতার সমর্পিত সত্তায় আরোহণের মাধ্যমে। কবিতার পাগলামি কিংবা গদ্যের মাদকতাÍকোনোটিই তাঁর সৃজনধারাকে সাধারণের পাটাতনে আটকে রাখতে পারেনি; বাঁক বদলে বদলে তিনি অসাধারণের সারিতে শামিল হয়েছেন শেষপর্যন্ত। হাতের তালুতে মহাদেশের বিশালতাকে ধারণ করে যে সাহিত্যসেবক পথ চলেছেন, পরিভ্রমণ করেছেন পরিচিত-অপরিচিত ভাবনারাজির অতলে, তাঁকে তো আর যাই হোক, খুব সহজে ভুলে যাওয়া চলে না!
কবিতা এবং কাহিনী নির্মাণে আবদুল মান্নান সৈয়দ, নগরজীবনে পেছনে পড়ে-থাকা সতত প্রবহমান, গ্রামজীবনের সরলতাকে আশ্রয় করেছেন চিরায়ত বস্তুবিশ্বের সত্যাসত্যকে স্বীকার করার জন্য। তাঁর নিরীক্ষায় বার বার ধরা পড়েছে মানুষের মনোবিকলনের সূত্রাবলী। তাই তাঁকে মননশীল মানুষের মনোভুবনের ভাষ্যকার বললে বোধকরি বাড়িয়ে বলা হবে না। অস্তিত্ববাদী এই কথাকারিগর আশার ভেলায় সারাজীবন ভেসে ভেসে অবশেষে জীবনের শেষবেলায় হতাশা আর ক্লান্তির কঠিন পথে বিষণ্ন মুখে চোখ স্থির রেখেছেন জীবনকেই নতুন করে অনুভব করার প্রয়োজনে। ‘সত্যের মতো বদমাশ’ সময়ের প্রহর পাড়ি দিয়ে মৃত্যুর অধিক যন্ত্রণাকে বুকে ধারণ করে, হায়েনাদের নখের তীব্রতাকে অতিক্রম করে রূপকথা আর ভাত-মাছ-মাংস সুবাসিত প্রাত্যহিক যাপিত প্রহর উদযাপন এবং উপভোগ করেছেন আবদুল মান্নান সৈয়দ। গল্প-কাহিনীতে সংসারের চারপাশের দৃশ্যাবলী, প্রেম-অশান্তি আর শ্রান্তি ও প্রশান্তির ভাববলয় নির্মাণ করেছেন তাঁর পাঠকের জন্য। ছোটকাগজে শিল্প আর শিল্পকলার বিবরণ-ভাষ্য কিংবা সাহিত্য বিষয়ে তাঁর বিশ্লেষণ ও অভিমত আমাদের কাছে অশেষ প্রেরণার দারুণ আহ্বান হয়ে টিকে থাকবে আরও বহুকাল।
জীবনানন্দের কালের অব্যবহিত পরে বাংলা কবিতায় বক্তব্যধর্মিতা এবং জীবনঘনিষ্ঠতার যে রূপ প্রকাশ পেতে থাকে, তার সরল সহযাত্রী আবদুল মান্নান সৈয়দ। জীবনানন্দের গভীর কাব্যবলয়-প্রভাবকে চেতনায় বেঁধে নিয়ে অতঃপর পাশ কাটিয়ে প্রাতিস্বিক ভুবন তৈরির জন্য শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ কিংবা শহীদ কাদরী সতর্ক ছিলেন; এই চিন্তাপ্রবাহের অভিযাত্রী হয়ে আপন জায়গাটি চিহ্নিত করার জন্য মান্নান সৈয়দও নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন শিল্পের উদার জমিনে। তবে তাঁর বোধে জীবনানন্দের কলাকৌশলের ছায়া ছিল। সমসাময়িক সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা আর স্বাধীনতা কিংবা মুক্তিলাভের প্রবণতাকে সৈয়দ আত্মস্থ করেছিলেন আপন বিবেকের তাড়নায়। রাষ্ট্র-কাঠামোর সুবিধা-অসুবিধাদির বিষয়ে তিনি সতর্ক মনোযোগ নিয়োজিত রেখেছেন সাহিত্যযাপনের পুরোটা সময়। বিশেষত ষাটের দশকে যখন ছোটকাগজনির্ভর সাহিত্য-কাঠামো পরিবর্তনের হাওয়া বাংলা সাহিত্যে জনপ্রিয়তা লাভ করছিল, মান্নান সৈয়দ তখনকার সেই প্রতিনিধিত্ব-প্রবাহে শরিক ছিলেন সক্রিয়ভাবে। প্রসঙ্গত, ১৯২৫ সালে প্যারিসে একটি ইশতেহারের মধ্য দিয়ে পরাবাস্তবতার কথা উচ্চারিত হলেও এই রচনারীতির আরম্ভ-এরিয়াটা নাকি আরও আগেই অন্য কিছু ভাষায় ঘটে গিয়েছিল। তবে বাংলা সাহিত্যে এই শিল্পরীতির প্রতি সাহিত্যিক-শিল্পীদের অভিনিবেশ, পরবর্তীকালে, বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এবং সত্যি কথা বলতে কীÍমান্নান সৈয়দ তাঁর শিল্প-সাহিত্য সাধনার পুরোটাকাল এই বিশেষ ভঙ্গিটির প্রতি নিবিড়ভাবে মনোযোগী ও আস্থাশীল ছিলেন; ছিলেন শ্রদ্ধাশীল।
সমকালে (এবং উত্তরকালেও বটে!) আবদুল মান্নান সৈয়দ সাহিত্যের সহযাত্রীদের কাছে গবেষক হিসেবে এক অনুকরণীয় নাম। সমাজচিন্তক সৈয়দের দশ দিগন্তের দ্রষ্টা, করতলে মহাদেশ কিংবা শুদ্ধতম কবি আমাদের দেশেÍবাংলাদেশে, সমালোচনা ও প্রবন্ধ সাহিত্যের জন্য বিশেষ বিশেষ সংযোজন। সৃজনশীল সাহিত্যের পাঠ, বিচার এবং মূল্যায়নে দৃষ্টিভঙ্গিগত স্বাতন্ত্র্য আর সোজাসাপটা মতামত প্রকাশের সাহস পাঠকের সামনে হাজির করেছেন মান্নান সৈয়দ। কখনও কখনও অভিভাবকীয় ঢঙে নবাগত শিল্পী-সাহিত্যিকের ভবিষ্যত্ও বাতলে দিয়েছেন তিনি। তাঁর মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যদ্বাণী অনেকের জন্য, পরবর্তীকালে, উপযুক্ত ও যথাযথ বলেও প্রমাণিত হতে দেখেছি আমরা। সত্তরের দশকে, স্রেফ বাংলাদেশী কবিদের, নতুন নতুন কবিতা ও কাব্যের মান-বিচারে তিনি ছিলেন প্রায় অদ্বিতীয় প্রতিভা; তাঁর এই প্রচেষ্টা ও মানসিকতা আশির দশক হয়ে শেষতম এই শতাব্দীর প্রথম দশকের সাহিত্য-গতি পর্যন্ত প্রসারিত। মান্নানের বিশ্লেষণের পদ্ধতি ও ধারা পরবর্তীকালের, অনেকাংশে, সমালোচক ও প্রাবন্ধিকদের জন্য অবশ্যঅনুকরণীয় হয়ে উঠেছে।
আমরা জানি, সৃজনশীল ও মননশীল ধারায় সমানভাবে কলম চলেছে তাঁর। আর সঙ্কলন ও সম্পাদনার জন্য তিনি হয়ে উঠেছেন আদর্শ কিংবা মডেল। আঞ্চলিক-জাতীয় এমনকি আন্তর্জাতিক পরিম-লের পরিচিত ও প্রতিশ্রুতিশীল সাহিত্য-সাহিত্যিক এবং শিল্পকলা সম্বন্ধে তিনি ছিলেন অপরিমেয় আগ্রহী ও অনুসন্ধানী। জানার জন্য আর অপরকে জানানোর জন্য তাঁর যে ব্যাকুলতা চিহ্নিত হয়ে আছে, তা আমাদের জন্য অনন্য সম্পদ হিসেবে টিকে থাকবে আরও বহুকাল। ‘একজন কবিকে শুধু কবিতার প্রয়োজনে প্রচুর গদ্য লিখতে হয়’ টি এস এলিয়টের এ ধরনের মন্তব্যের যে বাস্তবতা রয়েছে, তার নিখাদ প্রমাণ মেলে কবি আবদুল মান্নান সৈয়দের নিবিড় গদ্য রচনার উদাহরণের ভেতর দিয়ে। সৃজনশীলতার পাশাপাশি মননশীলতার চর্চার প্রয়োজনেই বোধহয় এমনতরো ঘটনা ঘটে থাকেÍকে জানে সে কথা! অন্তত মান্নান সৈয়দের চর্চিত পথ নিরীক্ষণ করলে এমন সিদ্ধান্তে উপনীত না হয়ে পারা যায় না।
জগতের এবং বিশেষভাবে সমাজের অভিগমনের চিত্রাবলির ছায়াছবি নির্মিতিতে শিল্পী মান্নান সৈয়দ নিবিষ্টচিত্ত মানুষ। মানুষকে তার সমূহ অনুভবসমেত অনুধাবন করার প্রবল আগ্রহ লুকিয়ে ছিল তাঁর প্রচেষ্টার সবগুলো প্রকোষ্ঠে। বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করতে তাঁর কোনো দ্বিধা বা সংকোচ ছিল না। অবিরল ধারার মতো তাঁর চেতনায় ও চিন্তায় যেন কেবলই বয়ে চলেছে চলমান নদীর অপ্রতিরোধ্য স্রোতোধারা! আর তিনি শুধু ভেসে বেড়িয়েছেন নতুন থেকে নতুনতর অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞানের অভিমুখে। অবশ্য স্রোতের প্রতিকূলতাকেও দেখতে হয়েছে তাঁকে; মোকাবিলা করতে হয়েছে সাহসের সঙ্গে। প্রসঙ্গত তাঁর একটি কবিতার কিছুটা পাঠ গ্রহণ করতে পারি :

Please follow and like us:
2