আতঙ্কের জনপদ ‘মরাগাঙ’

আতঙ্কের জনপদ ‘মরাগাঙ’

মহানগর প্রতিবেদন : জরিনা বেগম নামে এক বাসযাত্রীর সর্বস্ব কেড়ে নেওয়ার পর তাকে হত্যা করে ফেলে যায় দুর্বৃত্তরা। নিহতের বাবা বৃদ্ধ আকবর আলীকেও বেধড়ক পিটিয়ে আহত করে চলন্ত বাস থেকে ফেলে দেওয়া হয়। আহত বাবা টহল পুলিশকে জানালে মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয় টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড সড়কের সাভার উপজেলার আশুলিয়ার মরাগাঙ এলাকায়।
ঘটনাটি সম্প্রতি এক রাতের। পরিবহনচালক, যাত্রী ও স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিনিয়ত মরাগাঙ এলাকায় ঢিল ছুঁড়ে গাড়ি ছিনতাই, হত্যা, অপহরণ ও ডাকাতিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকা- সংঘটিত হচ্ছে। স্থানটি তাই তাদের কাছে আতঙ্কের। এলাকার লোকজন বলছেন, নির্জন ও অন্ধকারাচ্ছন্নতার কারণে অধিকাংশ অপরাধীচক্র মরাগাঙ এলাকাকে বেছে নিচ্ছে। পুলিশের টহল টিম এখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত কাজ করলেও খুব একটা কাজে আসছে না। গত ছয় মাসে মরাগাঙ এলাকায় ঢিল ছুঁড়ে গাড়ি ছিনতাই, অজ্ঞাত যুবকের লাশ উদ্ধারসহ চাঞ্চল্যকর বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে।
গত ২৩ অক্টোবর রাতে টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড সড়কের আশুলিয়ার মরাগাঙ এলাকায় জেলে সেজে চলন্ত মোটরসাইকেল ও পথচারীদের থামিয়ে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এ সময় ডাকাত দলের আট সদস্যকে আটক করা গেলেও বাকিরা এখনো পলাতক। গত ১৮ সেপ্টেম্বর দিনে দুপুরে একই স্থানে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের অতর্কিত হামলায় দুই হিজড়াসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হলেও জড়িতদের কাউকে এখন পর্যন্ত আটক করতে পারেনি পুলিশ।
গত ১৫ জুলাই একই এলাকা থেকে এ অজ্ঞাত এক যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করলেও পুলিশ রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি। গত ২৮ মে রাতে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোশারফ হোসেনের প্রাইভেট কারে ঢিল ছুড়ে তাকে ছুরিকাঘাত করে প্রাইভেট কারটি নিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনার পরদিন ঢিলছোড়া দলের প্রধান আশরাফ উদ্দিন হৃদয় বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন বলে দাবি করে পুলিশ।
সড়কটিতে চলাচলরত দোয়েল-সিয়াম, আলিফ ও মোহনা পরিবহন এবং লেগুনার চালকরা জানান, আশুলিয়া ব্রিজ থেকে ধওর পর্যন্ত মরাগাঙ এলাকায় রাতের বেলায় তাদের আতঙ্ক নিয়ে গাড়ি চালাতে হয়। অন্ধকারাচ্ছন্ন ও নির্জন হওয়ায় এখানে মাঝে মধ্যেই কিশোর বয়সী অপরাধীরা ওঁৎ পেতে থাকে। তারা গাড়িতে ইটের টুকরো ছুড়ে গতিরোধের পর অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে যাত্রীদের সর্বস্ব কেড়ে নেয়। বাধা দিতে গেলে পরিবহনচালক ও হেলপারদেরও মারধর করে সন্ত্রাসীরা। তারা আরও জানান, ডাকাত ও ছিনতাইকারী দলের সদস্যরা অনেক সময় যাত্রীবেশে গাড়িতে ওঠে। পরে অস্ত্রের মুখে যাত্রী ও তাদের মারধর করে সর্বস্ব ছিনিয়ে নিয়ে যায়। টহল পুলিশ থাকলেও এগুলো প্রতিরোধে কাজে আসে না বলেও অভিযোগ করেন তারা।
টঙ্গীবাড়ি এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক আব্দুস ছাত্তার বলেন, ‘সম্প্রতি আমার চাচা নিয়াজ উদ্দিন বেপারী অ্যাপোলো থেকে রাত পৌনে ৮টায় ট্যাক্সিযোগে বাসায় ফিরছিলেন। মরাগাঙ এলাকায় ঢিল ছুড়ে তার ট্যাক্সির গতিরোধ করে দুর্বৃত্তরা। পরে তার কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায়।’
আশুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহাবুদ্দিন মাতবর বলেন, এই সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার গাড়ি চলাচল করে। ইদানীং সড়কটির মরাগাঙ এলাকায় বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। ওই অপরাধীদের দমনে পুলিশকে আরও বেশি তৎপর হতে হবে। আশুলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) জাবেদ মাসুদ জানান, আশুলিয়া ব্রিজ থেকে বেড়িবাঁধ হয়ে ধওর পর্যন্ত এই বৃহৎ এলাকায় কাজ করছে পুলিশের দুটি টহল টিম। প্রতিদিন পর্যায়ক্রমে কাজ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। এলাকাটি ডিএমপি, তুরাগ, টঙ্গী ও আশুলিয়াসহ চারটি থানার সীমান্ত হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র আশুলিয়া থানা পুলিশ নিরাপত্তার কাজ করছে। তাই মরাগাঙ এলাকায় সংশ্লিষ্ট সবাই একযোগে কাজ করলে এখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলেও মনে করেন তিনি।

Please follow and like us:
0