আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে জাতির জনকের প্রতি শ্রদ্ধা

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে জাতির জনকের প্রতি শ্রদ্ধা

নিজস্ব প্রতিবেদক : দলের ৭১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ধানম-ির ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে স্থাপিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৯টায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে দলের শীর্ষ নেতারা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
দলের সভাপতিম-লীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, আব্দুল মতিন খসরু, আব্দুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাছান মাহমুদ, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ হোসেন, মির্জা আজম, শাখাওয়াত হোসেন শফিক, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক আব্দুস সবুর, মহিলা ও শিশু বিষয়ক সম্পাদক মেহের আফরোজ চুমকী, ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ সম্পাদক সুজীত রায় নন্দী, শিক্ষা ও মানব সম্পদ বিষয়ক সম্পাদক সম্পাদক সামসুন্নাহার চাপা, স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক রোকেয়া সুলতানা, বন ও পরিবেশ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, উপ দপ্তর সম্পাদক সায়েম খান এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
আওয়ামী লীগের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ, তাঁতী লীগ, আওয়ামী মৎস্যজীবী লীগ, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস।
সকাল ১০টায় টুঙ্গিপাড়ায় আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের নেতৃত্বে যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন ও সদস্য শাহাবউদ্দিন ফরাজীসহ নেতাকর্মীরা জাতির পিতার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
ধানম-িতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য আব্দুর রহমান বলেন, “অনেক আন্দোলন সংগ্রাম, সম্ভাবনা অর্জন সব কিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা এক অভিন্ন সত্তা। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিল।
“আজকে আমরা যে আকাঙ্ক্ষা ও ইচ্ছা নিয়ে ২৩শে জুন পালন করার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম, করোনা মহামারীর কারণে সেটি সম্ভব হয়নি। এটাই বাস্তবতা এবং সেই বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই সীমিত পরিসরে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছি।”
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, “আজ আওয়ামী লীগের একাত্তরতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। আওয়ামী লীগ গণমানুষের মধ্য থেকে গড়ে উঠা একটি দল। বাংলাদেশের সমস্ত অর্জনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নাম জড়িয়ে আছে। আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় অর্জন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতা সংগ্রাম। স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্র রচনা করা।”
তিনি বলেন, “বঙ্গবন্ধু দেশ পরিচালনা শুরুর মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় তাকে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে কয়েক দশক আগেই আমরা দক্ষিণ কেরিয়া, মালয়েশিয়ার মত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারতাম। আজকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণের লক্ষে তার তনয়া শেখ হাসিনা অক্লান্ত পরিশ্রম করে দেশকে অদম্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। আজকে আওয়ামী লীগ একটি স্ফুলিঙ্গের নাম।”
ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নব নির্মিত ১০ তলা এই ভবন আগামী শনিবার দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে উদ্বোধন করবেন দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: আব্দুল্লাহ আল মমীনঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নব নির্মিত ১০ তলা এই ভবন আগামী শনিবার দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে উদ্বোধন করবেন দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: আব্দুল্লাহ আল মমীন
আওয়ামী লীগের পথচলা
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরান ঢাকার কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে আত্মপ্রকাশ ঘটে আওয়ামী লীগের। প্রায় দুই যুগ পর যে দলটির নেতৃত্বে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ।
মুসলিম লীগের প্রগতিশীল একটি অংশের উদ্যোগে বাঙালি জাতির মুক্তির লক্ষ্যে গঠিত হয়েছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’।
প্রতিষ্ঠাকালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী দলটির সভাপতি, শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং কারাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন।
পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, “কোথাও হল বা জায়গা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত হুমায়ুন সাহেবের রোজ গার্ডেনের বাড়িতে সম্মেলনের কাজ শুরু হয়েছিল।” শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকসহ তৎকালীন রাজনৈতিক নেতারা সেদিন রোজ গার্ডেনে উপস্থিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “সকলেই একমত হয়ে নতুন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন করলেন; তার নাম দেওয়া হল- ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’।
“আমি মনে করেছিলাম, পাকিস্তান হয়ে গেছে। সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দরকার নাই। একটা অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হবে, যার একটা সুষ্ঠু ম্যানিফেস্টো থাকবে।”
১৯৫২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। পরের বছর ঢাকার ‘মুকুল’ প্রেক্ষাগৃহে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ১৩ বছর সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন শেখ মুজিব। আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে যাত্রা শুরু করলেও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ১৯৫৫ সালের কাউন্সিলে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। নতুন নাম হয়-‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’। স্বাধীনতার পর ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’ নাম নেয় দলটি।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে রাজনৈতিক সংগ্রাম, যুক্তফ্রন্ট গঠন ও ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিজয়সহ বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে ৫০ এর দশকেই আওয়ামী লীগ হয়ে ওঠে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। তবে প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি আব্দুল হামিদ খান ভাসানী রাজনৈতিক মতভিন্নতার জন্য ১৯৫৭ সালে দল ছেড়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রাদেশিক স্বায়ত্ত্বশাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্বসহ ৪২ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ। শুরুর দিকে দলটির প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে ছিল রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলার স্বীকৃতি, এক ব্যক্তির এক ভোট, গণতন্ত্র, সংবিধান প্রণয়ন, সংসদীয় পদ্ধতির সরকার, আঞ্চলিক স্বায়ত্ত্বশাসন এবং তৎকালীন পাকিস্তানের দু’অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণ। ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর কৃষক শ্রমিক পার্টি, পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল ও পাকিস্তান খেলাফত পার্টির সঙ্গে মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে আওয়ামী মুসলীম লীগ। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য অন্যান্য দলকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করতে আওয়ামী মুসলিম লীগ মুখ্য ভূমিকা পালন করে। ওই বছরের মার্চের আট থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান পরিষদের নির্বাচনে ২৩৭টি আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসন পায়। এরমধ্যে, ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ পেয়েছিল ১৪৩টি আসন।
২৪ বছরের পাকিস্তান শাসনামলে আওয়ামী মুসলিম লীগ আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে দু’বছর প্রদেশে ক্ষমতাসীন ছিল এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে কেন্দ্রে ১৩ মাস কোয়ালিশন সরকারের অংশীদার ছিল।
পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে মতপার্থক্যের কারণে ১৯৫৭ সালে দলে ভাঙন দেখা দেয়। ওই বছরের ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি কাগমারি সম্মেলনে দলে বিভক্তির ঘটনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় মাওলানা ভাসানী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। এরপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘসময় এই দলটি সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন করে জনগণের মধ্যে আস্থার স্থান তৈরি করে। ১৯৬৬ সালে ছয় দফা দেন বঙ্গবন্ধু, যাকে বাঙালির মুক্তির সনদ নামে অভিহিত করা হয়। ছয় দফার ভিত্তিতেই ৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। এরপর পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ শুরু করলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। কারাবন্দি বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর বিশ্ব মানচিত্রে অভ্যূদয় ঘটে বাংলাদেশের। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা এবং ৩ নভেম্বর কারাগারের অভ্যন্তরে চার জাতীয় নেতাকে হত্যার পর সামরিক শাসনের নির্যাতন আর নিপীড়নের মধ্যে পড়ে ঐতিহ্যবাহী এই সংগঠনটি। নেতাদের মধ্যেও দেখা দেয় বিভেদ। ১৯৮১ সালের ১৭ মে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দলীয় সভাপতি হিসাবে দেশে ফিরে কয়েক ভাগে বিভক্ত আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ করেন, আন্দোলন শুরু করেন সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদের বিরুদ্ধে।
২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। পাঁচ বছর শাসনের পর ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়। কিন্তু দলটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, কারচুপির মাধ্যমে তাদের হারানো হয়েছে। পরবর্তীতে দেশে রাজনৈতিক সঙ্কটের পর ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে পুনরায় সরকার গঠন করে। আর ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতাসীন হয়। সর্বশেষ ২০১৮ সালে দেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুনরায় নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতা ধরে রাখে আওয়ামী লীগ। এ নিয়ে টানা তিনবার ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ।

Please follow and like us: